নারী স্বাধীনতার প্রকৃত সার্থকতা কেবল অধিকার অর্জনের নয়, বরং প্রত্যেক নারীর স্বপ্ন, সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশে নিহিত।
নারী স্বাধীনতা, এ দুটি অত্যন্ত প্রভাবশালী শব্দ দ্বারা কেবল আইনি অধিকার বা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতাকে বোঝায় না, এর প্রকৃত অর্থ হল নিজের জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ও ক্ষমতা অর্জন। শিক্ষা, পেশা, বিবাহ, মাতৃত্ব কিংবা জীবন যাপনের ধরন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর মতামতকে সমান মর্যাদা দেওয়াই প্রকৃত স্বাতন্ত্র্যতার ভিত্তি।
আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর স্বাধীনতা নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছি। কিন্তু এর পরিণতি কি আদৌ ফলপ্রসূ হচ্ছে? সমাজের দৃষ্টিতে নারীরা আজ অনেকটাই স্বাধীন। কিন্তু দীর্ঘদিনের সামাজিক কুশাসন থেকে জন্ম নেওয়া মানসিক শৃঙ্খল থেকে নারীরা কি এত সহজেই মুক্তি পেয়ে গেল? বেগম রোকেয়া যে নারী স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা কি আদৌ বাস্তবায়িত হয়েছে? হ্যাঁ, এখন সমাজের একটি বড় অংশের নারীরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন এবং নিজেদের স্বপ্নের পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে চলেছেন। ফলে আধুনিক বিশ্বে নারীরা বিজ্ঞান, সাহিত্য, ব্যবসা, শিল্প, রাষ্ট্র পরিচালনাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। তবুও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে একটু ব্যবধান রয়েই গেছে।
আজও অনেক নারী সমাজের দীর্ঘদিনের রীতি-নীতি এবং ঐতিহাসিক বঞ্চনা থেকে সৃষ্ট মানসিক শৃঙ্খল সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করতে পারেনি, ফলে মুক্ত মনে স্বপ্ন দেখা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সমাজ আজ নারী স্বাধীনতাকে স্বাগত জানায়, অন্যদিকে তার পছন্দমতো চলাফেরা, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এমন অনেক বিষয়ের উপর নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। তাদের পৃথক করে রেখেছে আজও। তাই অনেক নারী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দ্বারা আরোপিত অভ্যস্ত মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি, না পেরেছে মুক্তমনে স্বপ্ন দেখতে। পুরোনো দিনের মানসিক সীমাবদ্ধতার মাঝেই আজও বিশ্বের এক শ্রেণির নারী তার অস্তিত্ব খুঁজতে ব্যস্ত।
কেন নারীদের একমাত্র পরিণতি হবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া? একজন নারী স্বাধীনভাবে তার ব্যক্তিত্ব গঠন, তার অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে ওঠবে, এমন সমাজ গঠনেই আমরা দৃঢ় প্রত্যয়। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একজন স্বাধীন ও শিক্ষিত মেয়ের একমাত্র স্বপ্ন কেবল বিবাহকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতে পারে না।
আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা হল এমন একটি সমাজ যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান মর্যাদা ও সুযোগ ভোগ করবে, যা অনেকটাই ফলপ্রসূ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে এখনো সচেতনতা, নিরাপত্তা ও মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য, যার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে এখনো সম্পূর্ণভাবে ঘটেনি। তাই নারীদের নিজেদের সক্ষমতার উপর আস্থা রেখে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। সমাজে এবং এই বিশ্বে নারীদের নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন হতে হবে, তাদের মুক্ত চিন্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটতে হবে। আমি সমাজের ওই অংশের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যারা এখনো মনে করেন নারীদের আলাদা করে কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না, পুরুষদের সাহায্য করা বা এক কথায় তাদের অর্ধাঙ্গী হওয়ার জন্যই নারীদের যতটুকু মর্যাদা থাকা দরকার তাদের ততটুকু থাকলেই যথেষ্ট।
কিন্তু আমরা নারী হয়েই নিজেরা ভুলে যাই যে একটি সমাজ গঠনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন একজন পুরুষের ততটুকুই একজন নারীর। পুরুষকে ছাড়া যেমন একটি সুষ্ঠু সমাজ গঠন করা কখনই সম্ভব নয়, তেমন নারীকে ছাড়াও এ লড়াই অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। যেদিন সমাজে প্রত্যেকটি নারী নিজেদের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেবে, মুক্ত চিন্তার অধিকারী হবে এবং পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর গণ্ডি অতিক্রম করে নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব গড়ে তুলতে সক্ষম হবে, সেদিনই নারীর স্বাধীনতার আদর্শ সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত হবে।
লেখক: দেবলীনা মৈশান
About the Author
RAJIN AHAMMED SAMI
মজদুরের নিয়মিত লেখকপ্রগতিশীল লেখক ও এক্টিভিস্ট
কলম ধরেছি অবহেলিতের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নীরব মানুষের কথা বলাই আমার দায়িত্ব।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন