বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাংলা ভূখণ্ডের নারী জাগরণের অবিসংবাদিত অগ্রদূত। আমাদের জাতীয় জীবনে, পাঠ্যপুস্তকে এবং প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতায় তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর অত্যন্ত আড়ম্বরের সাথে রোকেয়া দিবস পালিত হয়। কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত স্বীকৃতির আড়ালে একটি রূঢ় মনস্তাত্ত্বিক সত্য প্রায়শই ঢাকা পড়ে যায়। সমাজকাঠামোর খুব গভীরে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, সমাজের একটি বৃহৎ অংশের কাছে, বিশেষ করে গভীরভাবে প্রোথিত রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক মননের কাছে বেগম রোকেয়া আজও এক চরম অস্বস্তি এবং ক্ষেত্রবিশেষে নীরব আক্রোশের নাম। এই নেতিবাচক মনোভাবের কারণ কেবল অজ্ঞতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতা, মনস্তত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব এবং সমাজকাঠামোর এক জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব। একজন সমাজ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এই আক্রোশের অন্তর্নিহিত কারণগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথমত, ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে আঘাত এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার রূপরেখা। পুরুষতন্ত্র কেবল পুরুষদের আধিপত্যের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে না, এটি টিকে থাকে নারীদের পরনির্ভরশীলতার ওপর। একটি গোষ্ঠী যখন আর্থিকভাবে অন্য গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল থাকে, তখন তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। বেগম রোকেয়া ঠিক এই দুর্বল জায়গাতেই সবচেয়ে বড় আঘাতটি করেছিলেন। তিনি নারীদের কেবল অক্ষরজ্ঞান বা পুঁথিগত শিক্ষার কথা বলেননি, তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, নারীদের উচিত নিজেদের পায়ে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনে উপার্জন করা। তিনি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে নারীরা জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট হবে। একটি সমাজ যেখানে যুগ যুগ ধরে ধরে নেওয়া হয়েছে যে নারীরা কেবল অন্দরমহলে সেবাদাসীর ভূমিকা পালন করবে এবং পুরুষরা বাইরের জগৎ ও অর্থনীতির নাটাই হাতে রাখবে, সেখানে রোকেয়ার এই দর্শন ছিল সরাসরি পুরুষের একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রতি হুমকি। যখন কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠী তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়, তখন সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। বেগম রোকেয়ার প্রতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একাংশের ক্ষোভ মূলত এই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভোগ করে আসা ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকেই উৎসারিত।
দ্বিতীয়ত, পুরুষতান্ত্রিক অহংবোধে বুদ্ধিবৃত্তিক চপেটাঘাত। বেগম রোকেয়া কেবল অধিকারের দাবি নিয়ে সমাজের কাছে করুণা ভিক্ষা করেননি। তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনী এবং ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনার মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অসারতা ও ভণ্ডামিকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে উপহাস করেছিলেন। 'সুলতানার স্বপ্ন' বা 'অবরোধবাসিনী' বইগুলোতে তিনি যা দেখিয়েছেন, তা তৎকালীন এবং বর্তমান অনেক পুরুষের অহংবোধে প্রচণ্ড আঘাত হানে। 'সুলতানার স্বপ্ন' গল্পে তিনি সমাজের লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছেন। তিনি সেখানে পুরুষদের খলনায়ক হিসেবে দেখাননি, বরং দেখিয়েছেন দুর্বল, অলস এবং অযোগ্য হিসেবে। তিনি দেখিয়েছেন যে পুরুষরা যদি অন্দরমহলে থাকে তবে পৃথিবীটা যুদ্ধবিগ্রহহীন এবং অনেক বেশি শান্তিপূর্ণ হতে পারে। একজন নারীর এমন অকল্পনীয় মেধা এবং পুরুষের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বকে হাস্যাস্পদ করে তোলার স্পর্ধা রক্ষণশীল পুরুষ সমাজ আজও পুরোপুরি হজম করতে পারেনি। পুরুষতন্ত্র নারীদের করুণা করতে পছন্দ করে, কিন্তু তাদের কাছে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরাজিত হওয়াকে তারা অপমান হিসেবে দেখে।
তৃতীয়ত, দেশীয় প্রেক্ষাপটে নারীবাদের শেকড় স্থাপন। বর্তমান সময়ের রক্ষণশীল সমাজের একটি বড় অস্ত্র হলো নারী অধিকারের আন্দোলনকে 'পশ্চিমা অপসংস্কৃতি' বা 'বিদেশি এজেন্ডা' হিসেবে আখ্যায়িত করা। তারা বোঝাতে চায় যে নারীবাদ আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি বা মূল্যবোধের পরিপন্থী। কিন্তু বেগম রোকেয়া তাদের এই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত বয়ানকে একাই ধূলিসাৎ করে দেন। তিনি কোনো পশ্চিমা নারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এই বাংলারই একজন সাধারণ শাড়ি পরিহিতা, ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারী। অথচ আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে তিনি নারী-পুরুষের সমতার যে কথাগুলো বলে গেছেন, তা আধুনিক পশ্চিমা নারীবাদের চেয়ে কোনো অংশে কম তো নয়ই, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি প্রগতিশীল। যেহেতু রোকেয়া আমাদের নিজস্ব মাটির মানুষ, তাই তাকে পশ্চিমা ট্যাগ দিয়ে খারিজ করে দেওয়া সম্ভব হয় না। এই অক্ষমতা রক্ষণশীল সমাজের হতাশা ও ক্ষোভকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
চতুর্থত, ধর্ম ও সংস্কৃতির অপব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করা। আমাদের এই অঞ্চলে যেকোনো প্রগতিশীল চিন্তাকে স্তব্ধ করার সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার হলো তাকে ধর্ম বা সংস্কৃতির পরিপন্থী হিসেবে দাঁড় করানো। বেগম রোকেয়া কখনোই ধর্মের বিরুদ্ধে ছিলেন না। তিনি গভীরভাবে ধর্ম পালন করতেন। কিন্তু তিনি ধর্মের নামে চাপিয়ে দেওয়া অন্ধ কুসংস্কার, ফতোয়া এবং পুরুষতন্ত্রের সুবিধাবাদী ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে নারীদের অন্ধকারে রাখা হচ্ছে। সমাজপতিরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে যুগ যুগ ধরে সাধারণ মানুষের কাছে রোকেয়াকে 'উচ্ছৃঙ্খল', 'বেপর্দা' বা 'ধর্মবিদ্বেষী' হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এই পরিকল্পিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক অপপ্রচার অনেক সাধারণ মানুষের মনে তাঁর সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত এবং নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিয়েছে। যারা ধর্মকে পুঁজি করে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, রোকেয়া তাদের সেই ব্যবসার সবচেয়ে বড় শত্রু।
পঞ্চম এবং অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক কারণটি হলো আধুনিক সমাজের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন। আজ যখন বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি থেকে শুরু করে খেলাধুলা পর্যন্ত সব জায়গায় নিজেদের অভাবনীয় সাফল্য প্রমাণ করছে, তখন সমাজের সেই প্রাচীনপন্থী অংশটি এক ধরনের অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। তারা দেখছে যে তাদের শতাব্দীপ্রাচীন নির্ভরশীলতার শিকল ভেঙে যাচ্ছে। নারীরা এখন আর কেবল নীরব শ্রোতা নয়, তারা প্রশ্ন করতে শিখেছে। নারীদের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার মূল বীজটি যেহেতু বেগম রোকেয়াই বপন করেছিলেন, তাই আধুনিক নারীদের সফলতায় ঈর্ষান্বিত বা ক্ষুব্ধ পুরুষতান্ত্রিক মন তাদের অবচেতন ক্ষোভ গিয়ে ঢালে বেগম রোকেয়ার ওপর। তারা বুঝতে পারে, আজ যে নারীটি নির্ভয়ে কথা বলছে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে বা নিজের আইনি অধিকার আদায় করে নিচ্ছে, তার এই আদর্শিক সাহসটি রোকেয়ার দর্শন থেকেই উৎসারিত।
পরিশেষে অত্যন্ত গভীরভাবে বিচার করলে বোঝা যায়, বেগম রোকেয়ার প্রতি সমাজের একটি বিশেষ অংশের এই আক্রোশ, অস্বস্তি বা ঘৃণা আসলে তাঁর দর্শনের কোনো ব্যর্থতা নয়। বরং এটি তাঁর চিন্তার অভাবনীয় এবং কালজয়ী সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। একটি প্রথাগত এবং অচল সমাজব্যবস্থাকে একেবারে শেকড় ধরে নাড়িয়ে দিতে পারলে তবেই এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। তিনি স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া কোনো সাধারণ সমাজকর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রলয়ংকরী সংস্কারক। যতদিন এই সমাজে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য বজায় রাখার এবং নারীকে অধস্তন করে রাখার মানসিকতা থাকবে, ততদিন বেগম রোকেয়া তাদের কাছে ভয়ের ও ঘৃণার কারণ হয়েই থাকবেন। কারণ বেগম রোকেয়া কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি কোনো ব্যক্তি নন, তিনি হলেন সেই অত্যন্ত স্বচ্ছ আয়না, যে আয়নার সামনে দাঁড়ালে পুরুষতন্ত্র তার নিজের সবচেয়ে কুৎসিত এবং ভণ্ড রূপটি দেখতে বাধ্য হয়।
About the Author
Prokash Singha
মজদুরের নিয়মিত লেখকMusician
Singer | Songwriter | Composer | Writer | Speaker
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন