ভাষা কেবল মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম নয়। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই আধিপত্য বিস্তার এবং দুর্বলকে দমনের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গত এক দশকে এমন বেশ কিছু শব্দের জন্ম বা রূপান্তর ঘটেছে, যা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে আক্রমণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত, বিতর্কিত এবং জেন্ডার-বায়াসড শব্দগুলোর একটি হলো ‘শাহবাগী’।
২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত অবস্থান নিয়ে সমাজে নানা তর্ক-বিতর্ক থাকতে পারে। সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রাজনৈতিক আলোচনা। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে তাকালে একটি ভয়ানক সত্য উন্মোচিত হয়। আমরা দেখতে পাই, কীভাবে এই ‘শাহবাগী’ শব্দটিকে সুকৌশলে রূপান্তরিত করা হয়েছে বাংলাদেশের প্রতিবাদী, স্বাধীনচেতা এবং মত প্রকাশে সাহসী নারীদের দমনের এক মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার হিসেবে।
রাজনৈতিক শব্দ থেকে চরিত্রহননের অস্ত্রে রূপান্তর
যেকোনো সুস্থ সমাজে মতের অমিল হলে যুক্তির মাধ্যমে তার খণ্ডন করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা এক অদ্ভুত সামাজিক অবক্ষয় দেখতে পাই। একজন নারী যখন প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ, নারী অধিকার, ধর্ষণ কিংবা ধর্ম নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তোলেন, তখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটে পড়ে।
লজিক দিয়ে লজিক খণ্ডন করার মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান বা মানসিকতা যখন থাকে না, ঠিক তখনই শুরু হয় ‘নেম কলিং’ বা ট্যাগিংয়ের রাজনীতি। একজন পুরুষ যখন কোনো মত প্রকাশ করেন, তাকে সাধারণত রাজনৈতিক বা তাত্ত্বিকভাবে মোকাবিলা করা হয়। কিন্তু একজন নারী যখন ঠিক একই কথা বলেন, তখন তার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয় ‘শাহবাগী’ তকমাটি। বর্তমান সময়ে এই শব্দটি আর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় বহন করে না। বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে নারীর চরিত্রহননের একটি ওপেন লাইসেন্স।
বাস্তবতা হলো, একজন নারী যদি নিজের উপার্জনে একা ভ্রমণ করেন, কপালে টিপ পরেন, নিজের পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেন কিংবা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রতিবাদ করেন, তাকে খুব সহজেই ‘শাহবাগী’ ট্যাগ দিয়ে দেওয়া হয়। এই তকমা দিয়ে সুকৌশলে তাকে ‘উচ্ছৃঙ্খল’, ‘সংস্কৃতিহীন’ বা ‘নৈতিকতাহীন’ হিসেবে ফ্রেমবন্দি করার চেষ্টা চলে। কারণ সমাজ খুব ভালো করেই জানে, একজন নারীর মেধা ও যুক্তিকে খণ্ডন করার চেয়ে তার চরিত্রে কালিমা লেপন করা অনেক সহজ এবং দ্রুত ফলপ্রসূ।
অ্যাড হোমিনেম লজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব
যুক্তিবিদ্যার ভাষায় একটি টার্ম আছে, যাকে বলা হয় ‘অ্যাড হোমিনেম’ (Ad hominem) ফ্যালাসি। এর মানে হলো, যখন কেউ প্রতিপক্ষের যুক্তির জবাব দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সে প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত চরিত্র, চেহারা বা পরিচয়ের ওপর আক্রমণ শুরু করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের ওপর হওয়া আক্রমণগুলো বিশ্লেষণ করলে এই ফ্যালাসির চূড়ান্ত রূপ দেখা যায়। একজন প্রতিবাদী নারী যখন কোনো সামাজিক অবিচার নিয়ে স্ট্যাটাস দেন, তখন কমেন্ট বক্সে তার যুক্তির কোনো গঠনমূলক সমালোচনা হয় না। এর বদলে তাকে ‘শাহবাগী’ ট্যাগ দিয়ে শুরু হয় নোংরা আক্রমণ। আক্রমণকারী মূলত নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব ঢাকতেই এই শব্দটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এটি প্রমাণ করে যে, ওই নারীর যুক্তির কাছে পুরুষতান্ত্রিক মস্তিষ্ক কতটা অসহায়।
সাইবার মব লিঞ্চিং এবং ডগ হুইসেল পলিটিক্স
ডিজিটাল যুগে এসে এই ট্যাগের ব্যবহার রীতিমতো সাইবার সন্ত্রাসের রূপ নিয়েছে। ‘শাহবাগী’ শব্দটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ধরনের ‘ডগ হুইসেল’ বা সংকেত হিসেবে কাজ করে। কোনো নারীকে একবার এই ট্যাগ দিয়ে দিলে মুহূর্তের মধ্যে একটি সংঘবদ্ধ সাইবার মব বা অন্ধ অনুসারীর দল তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এই আক্রমণের ধরনটি খেয়াল করলেই এর পেছনের নোংরা মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে থাকে রেপ থ্রেট, বডি শেমিং, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য এবং চূড়ান্ত গালিগালাজ। এর মূল উদ্দেশ্য একটিই। তারা চায় এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে, যাতে ওই নারী ভয় পেয়ে গুটিয়ে যান। পাশাপাশি সমাজের অন্য নারীরাও যেন এই পরিণতি দেখে প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলেন, সেটাও এই সাইবার মব লিঞ্চিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য। এটি মূলত স্বাধীন নারীদের বিরুদ্ধে এক ধরনের ভার্চুয়াল ইনকুইজিশন।
পুরুষতন্ত্রের মূল ভয় ঠিক কোথায়?
কেন এই স্বাধীনচেতা নারীদের এতটা ভয় পায় সমাজ? এর পেছনের মনস্তত্ত্ব বোঝা খুব জরুরি। হাজার বছর ধরে পুরুষতন্ত্র টিকে আছে নারীর পরাধীনতার ওপর ভর করে। একজন স্বাধীন নারী মানেই হলো সেই প্রথাগত শেকল ভাঙার নীরব হুংকার।
যে নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন, যিনি নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছেন এবং যাকে সস্তা আবেগ বা ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তিনি সমাজের তথাকথিত ‘আদর্শ ও অনুগত নারীর’ ছকের সম্পূর্ণ বাইরে। পুরুষতন্ত্র সবসময় চায় নারীরা তাদের বেঁধে দেওয়া গণ্ডির ভেতর থাকুক। কিন্তু যখনই কোনো নারী সেই গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে আসেন, তখন সমাজ তার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় থেকেই জন্ম নেয় ক্ষোভ। আর সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ‘শাহবাগী’, ‘নারীবাদী’ বা ‘উচ্ছৃঙ্খল’ ইত্যাদি ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে।
লজিক্যাল ডিকনস্ট্রাকশন: এই শব্দ-সন্ত্রাস কি আদৌ সফল?
যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাউকে একটি শব্দ দিয়ে ট্যাগ করে তার মতপ্রকাশকে দাবিয়ে রাখার এই চেষ্টা সাময়িকভাবে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা চরমভাবে ব্যর্থ। কারণ, আজকের নারীরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং শিক্ষিত।
বাংলাদেশের নারীরা আজ সব বাধা পেরিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন। তারা যেমন দক্ষতার সাথে গৃহকোণ সামলাচ্ছেন, তেমনি মহাকাশ গবেষণায়, অর্থনীতিতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবং রাজপথের প্রতিবাদেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের এই মেধা এবং সাহসের অগ্রযাত্রাকে সস্তা কিছু গালি বা অবমাননাকর শব্দ দিয়ে আটকে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
উপসংহার
‘শাহবাগী’ বা এ ধরনের যেকোনো ট্যাগিং স্বাধীনচেতা নারীদের দমিয়ে রাখার জন্য সাময়িক এক ধূলিঝড় তৈরি করতে পারে ঠিকই, কিন্তু তাদের আত্মবিশ্বাসকে কখনোই ধূলিসাৎ করতে পারবে না। প্রতিবাদী নারীদের কণ্ঠস্বরকে ভয় না পেয়ে সমাজকে আজ আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে। শিখতে হবে কীভাবে নারীদের মানুষ হিসেবে সম্মান করতে হয় এবং যুক্তির টেবিলে কেবল যুক্তি দিয়েই কথা বলতে হয়।
পুরুষতন্ত্রের এই শব্দ-সন্ত্রাস নারীদের হয়তো সাময়িকভাবে মানসিকভাবে আহত করে। কিন্তু দিন শেষে এটি তাদের আরও ইস্পাতকঠিন ও সাহসী করে তোলে। কারণ যে নারী একবার নিজের অধিকার আদায় করতে শিখে গেছেন, তাকে কোনো সস্তা ট্যাগ বা চরিত্রহননের ভয় দেখিয়ে আর ঘরে আটকে রাখা যাবে না। অন্ধকারের বুক চিরে আলোর মশাল হাতে নারীদের এই যৌক্তিক পথচলা অব্যাহত থাকবেই।
About the Author
Prokash Singha
মজদুরের নিয়মিত লেখকMusician
Singer | Songwriter | Composer | Writer | Speaker
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন