সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

কেন হিজড়া এবং বেদে সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের সমাজব্যাবস্থা দায়ী?

যেমন ধরেন, যেকোনো স্কুল, কলেজ কিংবা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ফর্ম ফিলাপ করতে গেলেই জেন্ডার আইডেন্টিটি সিলেক্ট করাটা কম্পালসরি। অথচ থার্ড জেন্ডারের একজন মানুষের জন্য সেখানে স্পেস কতটুকু?

Neelmoy Hridoy
পড়তে 4 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 202 বার পড়েছে
কেন হিজড়া এবং বেদে সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের সমাজব্যাবস্থা দায়ী?

এই যে হিজড়া জনগোষ্ঠীর তথাকথিত 'চাঁদাবাজি' কিংবা বেদে সম্প্রদায়ের সাপের খেলা বা তাবিজ-কবজের ভেলকিবাজি, যেগুলোতে আমাদের নিয়মিত বিরক্তিকর রিএ্যাকশন দেখা যায়। আমরা তাদের হরেকরকম ব্লেম করি। কিন্তু একটু ডিপ ডাউন চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন এসবের জন্য আলটিমেটলি আমাদের সমাজব্যবস্থা আর আমাদের মাইন্ডসেটই দায়ী।

অন পেপার বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে কনস্টিটিউশন অনুযায়ী ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোত্র কিংবা লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার আর সুযোগ-সুবিধার কথা গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রিয়েলিটি চেক হলো, আমাদের দেশের সিস্টেমটাই এমনভাবে ডিজাইন করা যে এখানে অটোমেটিক একটা চরম বৈষম্যমূলক অবস্থার সৃষ্টি হয়।

​যেমন ধরেন, যেকোনো স্কুল, কলেজ কিংবা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ফর্ম ফিলাপ করতে গেলেই জেন্ডার আইডেন্টিটি সিলেক্ট করাটা কম্পালসরি। অথচ থার্ড জেন্ডারের একজন মানুষের জন্য সেখানে স্পেস কতটুকু? তার চেয়েও বড় প্র্যাক্টিক্যাল ক্রাইসিস হলো আমাদের ডেইলি লাইফের ইনফ্রাস্ট্রাকচার। দেশের যেকোনো বড় ইনস্টিটিউশনে জেন্টস আর উইমেন্সদের জন্য আলাদা ওয়াশরুম বা টয়লেটের ব্যবস্থা থাকলেও, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য কোনো ডেডিকেটেড ওয়াশরুমের অস্তিত্বই নেই।

​এই টয়লেট ফ্যাসিলিটিসের ক্রাইসিসটা যে কতটা বড় ব্লাইন্ড স্পট, সেটা উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যায়। যেখানে কানাডা, আমেরিকা বা সুইডেনের মতো উন্নত দেশগুলো তাদের পাবলিক প্লেস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইন করে "Gender-Neutral" বা "All-Gender" ওয়াশরুম স্ট্যান্ডার্ড পলিসি হিসেবে ম্যান্ডেটরি করেছে—এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত বা নেপালও তাদের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এয়ারপোর্ট, মেট্রো স্টেশন আর বড় বড় ইউনিভার্সিটিতে তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ডেডিকেটেড ওয়াশরুমের ব্যবস্থা করছে—সেখানে আমাদের দেশে এই বেসিক হিউম্যান নিডটুকু পর্যন্ত পুরোপুরি গায়েব। এই যে একটা পুরো জনগোষ্ঠীকে সিস্টেম্যাটিকভাবে ডেইলি লাইফের অবলিগেশন থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো, এর ফলে তারা মেইনস্ট্রিম সোসাইটির সাথে মিশতে চরম ইনসিকিউরিটি আর হিউমিলিয়েশন ফিল করে। যখন রাষ্ট্র আর সিস্টেমই তাদের আইডেন্টিটি আর বেসিক নিডকে একনলেজ করে না, তখন সাধারণ মানুষও তাদের থ্রেট বা হাসির পাত্র মনে করতে শুরু করে।

​সমাজবিজ্ঞানী হাওয়ার্ড বেকারের একটা ফেমাস থিওরি আছে—'লেবেলিং থিওরি' (Labeling Theory)। এই থিওরি বলে, সমাজ যখন কোনো গ্রুপকে শুরুতেই 'আলাদা' বা 'ক্রিমিনাল' হিসেবে স্ট্যাম্প মেরে দেয়, তারা তখন বাধ্য হয়ে মেইনস্ট্রিম থেকে ছিটকে যায় এবং বেঁচে থাকার জন্য নিজস্ব একটা সাব-কালচার বানিয়ে নেয়। আমাদের সোসাইটিও ঠিক এই কাজটাই করেছে। হিজড়া শিশুদের আমরা ছোটবেলাতেই ফ্যামিলি আর সমাজ থেকে আইসোলেট করে দিই। তাদের প্রপার এডুকেশন বা জবের সুযোগ দিই না। ফলে বেঁচে থাকার জন্য রাস্তাঘাটে জোর করে টাকা তোলা ছাড়া তাদের আর কোনো অপশনই থাকে না। একে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলে 'স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স' (Structural Violence), যেখানে সিস্টেম নিজেই পলিসি আর ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে মানুষকে বাধ্য করে এই পথ বেছে নিতে।

​ঠিক একই রকম ক্রাইসিস বেদে সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও খাটে। সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম ওগবার্নের 'কালচারাল ল্যাগ' (Cultural Lag) থিওরি দিয়ে এটা দারুণভাবে এক্সপ্লেয়িন করা যায়। টেকনোলজি বা মডার্ন লাইফস্টাইল যত দ্রুত আগায়, মানুষের মেন্টালিটি বা ব্যাকডেটেড পলিসি কিন্তু তত ফাস্ট চেঞ্জ হয় না। বেদেদের আমরা শত বছর ধরে রিভার আর নৌকার যাযাবর লাইফেই আটকে রেখেছি, মডার্ন ইকোনমিক বা এডুকেশনাল কাঠামোর সাথে তাদের বিন্দুমাত্র কানেক্ট করিনি। কার্ল মার্ক্সের ভাষায় তারা হয়ে গেছে এক ধরণের 'লুম্পেন প্রলেতারিয়েত' (Lumpen Proletariat) বা উদ্বৃত্ত জনগোষ্ঠী, যাদের মেইনস্ট্রিম প্রোডাকশন কোনো ভ্যালু নেই। তাই তারা মানুষের অন্ধবিশ্বাস, কিউরিওসিটি আর এন্টারটেইনমেন্টের চাহিদাকে ক্যাশ করে কোনোমতে টিকে থাকার ট্রাই করে।

​ফ্রেঞ্চ ফিলোসফারদের সেই 'আদারনেস' (Otherness) বা পরকীকরণের কনসেপ্টটা আমাদের মজ্জায় মিশে আছে; আমরা হিজড়া জনগোষ্ঠী কিংবা বেদে সম্প্রদায়কে উৎসবের উসিলায় ইউজ করি, কিন্তু পাশের ফ্ল্যাটটা ভাড়া দিতে, নিজের অফিসে ছোট্ট একটা কাজ দিতে বা নূন্যতম রেস্পেক্ট দিতে রাজি হই না। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের 'রাইটস' বা মৌলিক অধিকার ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার দেওয়ার চেয়ে ১০ টাকা 'দয়া' করতে বেশি কমফোর্টেবল ফিল করে। সো, যতক্ষণ না আমাদের এই হিপোক্রিট মাইন্ডসেট চেঞ্জ হবে, প্রাতিষ্ঠানিক ফর্মে ও বিল্ডিংয়ের ডিজাইনে তাদের জায়গা দেওয়া হবে এবং তাদের ইনক্লুসিভ সোসাইটির পার্ট করা হবে—ততক্ষণ এই চাঁদাবাজি বা ভেলকিবাজির চেইন ভাঙা ইমপসিবল।

Neelmoy Hridoy

About the Author

Neelmoy Hridoy

-BHK- Baper Hotel e Khai

just highly motivated by systemic growth,strategic ambition for the future with a strong grounding in our cultural heritage, classic literature, and community service.

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast