কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে সী-বিচের রেস্টুরেন্টে সমুদ্রমুখী হয়ে বসে কলিগদের সাথে অষ্টভুজের মচমচে ফ্রাই খেলেও, অনুসন্ধিৎসু ডুবুরিদের মতো করে সমুদ্রের গভীর তলদেশে গিয়ে নীলাভ স্বচ্ছ পানিতে পাখির মতো ডানা মেলে ঘুরে ঘুরে সমুদ্রের তলদেশে বিচরণ করা অষ্টভুজদের জীবনধারা দেখার সৌভাগ্য হয়নি আজও। তবে কালার টিভির বড় স্ক্রিনে সমুদ্রের পানিতে ছুটে বেড়ানো জীবন্ত অষ্টভুজদের দেখেছি আর সেই সাথে অষ্টভুজ হয়ে আমাদের চারপাশে বিচরণ করা বহুরূপী দারিদ্র্য ব্যাবসায়ী ড্রামা কুইনদের কেরামতি এই জীবনে দেখা হয়ে গিয়েছে বহুবার!
শুনেছি প্রাণী জগতে ছদ্মবেশ ধারণে অষ্টভুজদের জুড়ি নেই। বিপদ দেখলে যেকোন সময় গিরগিটির মতো রঙ পরিবর্তনে পটু এরা। তখন এরা সমুদ্রের তলদেশে গিয়ে শৈবাল কিংবা পাথরের ন্যায় নিজেদের উপস্থাপন করতে উস্তাদ। এরপরও ক্রিকেট ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিমের বাংলাদেশকে প্রথম ইনিংসেই গোহারা হারিয়ে দেওয়ার মতো করে ছদ্মবেশ ধারণ এবং রঙ পরিবর্তনে ড্রামা কুইনরা অষ্টভুজদের প্রথম ইনিংসেই হারিয়ে দিবে আমি নিশ্চিত। অষ্টভুজ আত্মরক্ষার্থে ছদ্মবেশ ধারণ করে। এরা করে শিকারীকে আকৃষ্ট করতে। সাধারণ প্রাণী জগতে নিজেদের নিরামিষভোজী বলে প্রমাণ করতে। আবার এদের ছদ্মবেশ ধারণের কস্টিউমও ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে এর ওর কাছ থেকে চেয়েচিন্তে কিংবা লুকিয়ে জোগাড় করে নেয়া, নিজেদের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত নয়! অষ্টভুজ কিংবা অন্য শিকারী প্রাণীদের মতো এরা সাধারণত আকারে ছোট ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী শিকার করে না, করে একই প্রজাতির আকার আকৃতিতে বৃহৎ ও একই সময়ে অনেককে। প্রাণিজগতের মধ্যে সম্ভবত একমাত্র এরাই আচরণে ও স্বভাবে এমন ব্যতিক্রম!
সমুদ্রে বাস করা নীলাভ রক্তের নিশাচর প্রাণী অষ্টভুজ ৩টি হৃদপিণ্ড, ৮টি বাহু, ৯টি মস্তিষ্কের অধিকারী হলেও সমতলে বাস করা বিষাক্ত লালাভ রক্তের উভচর প্রাণী দারিদ্র্য ব্যাবসায়ী ড্রামা কুইন অষ্টভুজদের বাহু ও মস্তিষ্কের সংখ্যা অন্তত এর কয়েক গুণ বেশি হবে নিশ্চিত! যদিও এটা প্রমাণিত না, কিন্তু জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে এদের সর্বব্যাপী গ্রাস ও বিস্তার দেখে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই অনুমান করা যায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অষ্টভুজ কাঙ্খিত পরিবেশ না পেলে উদাস হয়ে পড়ে এবং নিজের হাতে নিজেই কামড়াতে থাকে। সমতলে বাস করা অষ্টভুজরা শিকার ফসকে গেলে জনসম্মুখে বিরাট প্রগতিশীল, সত্যনিষ্ঠ, পরিশ্রমী ও জমিদার পুত্রী হয়ে যায়! প্রগতিশীলতা ও পরিশ্রমের উপর কেউ গোনায় না ধরা সত্ত্বেও নিজেকে বিরাট হনু ভাবা ইনফ্লুয়েন্সারদের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে ক্লাস নিয়ে শিকার, পোষক ও উপস্থিত দর্শকদের ছবক দিয়ে বেড়ায়!
ভাগ্যিস, সরাসরি মিথ্যাচার আর বাটপারি ধরার কোন যন্ত্র এখনো আবিষ্কৃত হয়নি! হলে দেখা যেত এদের নাম বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী আর বাটপার হিসেবে জাতীয়ভাবে তালিকাভুক্ত করে পুরষ্কৃত করতে হতো! এমনকি বড় ধরনের কিলিকবাজ ও মিথ্যাবাদী হিসেবে বিশ্ব দরবারেও দেশের জন্য সুনাম কুড়িয়ে আনতে পারতো! অবশ্য এরকম কিছু হলে অন্য প্রাণীদের জন্য ভালোই হইতো, সাবধান হয়ে চৌদ্দ গোষ্ঠীসহ এদের বিষাক্ত থাবা থেকে দূরে থাকতে পারতো!
এরা অষ্টভুজদের মতোই বৈচিত্র্যময় প্রজাতির! সমুদ্রে বাস করা অষ্টভুজদের জিনসংখ্যা মানুষের থেকে ১০ হাজার বেশি। অনুমান করছি গবেষণা করলে দেখা যাবে, পরজীবী দারিদ্র্য ব্যাবসায়ী ড্রামা কুইনদের জিনসংখ্যাও সাধারণ মানুষদের থেকে অনেক বেশিই হবে। কারণ অষ্টভুজদের মতোই এরাও সমতলের এক রহস্যময় প্রাণী এবং শিকার ধরার জন্য প্রতিনিয়ত জায়গা বদল করতে থাকে! শিকারের ধরনও বদলাতে থাকে!
সমস্ত শরীর জুড়ে কোন দক্ষ চিত্রশিল্পীর এঁকে দেয়া নীল আংটিওয়ালা ব্লু-রিংগড নামের অষ্টভুজ ছাড়া পৃথিবীতে যত প্রজাতির অষ্টভুজ আছে, তাদের প্রতিটিই কম বেশি বিষাক্ত হলেও সেগুলো মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। তাদের বিষ সাধারণত ছোটমাছ বা কাঁকড়া শিকারের উপযোগী। মানুষের জন্য এগুলো বড়জোর চামড়ায় সামান্য প্রদাহ বা চুলকানি তৈরি করতে পারে। দারিদ্র্য ব্যাবসায়ী ড্রামা কুইনরা হলো সমুদ্রের তলদেশে ডুবুরিদের মুখমণ্ডল আঁকড়ে ধরা ব্লু-রিংগড, যা তাদের ড্রামা নামক নিউরোটক্সিন দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ককে কয়েক মিনিটের মধ্যে অবশ করে তাতে থাকা সুপ্ত আবেগকে উস্কে দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে করতে প্রায় শ্বাস রোধ করে দেয়।
আর মনুষ্য প্রজাতির একই পরিবারের এক হালি ব্লু-রিংগড এর কবলে পড়া মানে শুধু টুটি চেপে ধরা নয়, মুহূর্তে সহস্র বাহু দিয়ে মস্তিষ্কের পাশাপাশি ফুসফুসকেও বিকল করে দেয়া। শিকার একটাকে ছাড়াবে, আরেকটা দিয়ে টুটি চেপে ধরবে। একবার ধরতে পারলে নিস্তার নেই এদের কবল থেকে! এদের আবার ক্ষিধে এত বেশি যে একসাথে একটা শিকার ধরে পোষে না, একাধিককে ধরতে হয়। ফুল-ফ্লেজড পরজীবী বলে কথা! ফকির না হওয়া পর্যন্ত রক্তমাংস চিরে ছিবড়ে করে খাওয়ার আগ পর্যন্ত শিকারের পিছু ছাড়ে না! কোনমতে এদের সহস্র বাহুর সাড়াশি বিস্তার থেকে শিকারের মুক্তি মিললেও শিকারের রক্তমাংস খেয়ে তখন এরা এমনই মোটাতাজা হয়ে যায় যে মনে হবে এরা অষ্টভুজ না, যেন একেকটা আস্ত জলহস্তী! এরা ততদিনে সারাজীবনের খাদ্যরস সংগ্রহ করে নিয়েছে শিকার থেকে!
দেখতে শুনতে স্বাধীন প্রাণী বলে মনে হলেও এরা আসলে পরজীবী কীট। অন্ত্রে বাস করে কৃমির মতো পোষক ছাড়া টিকতে পারে না একদিনও! তাই এতদিন ধরে শুষে নেওয়া খাদ্যরসের জন্য পোষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার পরিবর্তে শিকার যদি কোনক্রমে নি:শ্বেস হওয়ার আগে এদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে যায় এবং ছাই দিয়েও ধরার উপায় খুঁজে না পায়, তখন এরা ৯০ ও ০ দশকে রাস্তায় রাস্তায় মাইক বাজিয়ে সিনেমার বিজ্ঞাপন প্রচার করার মতো করে সমস্ত প্রাণী জগতের কাছে গিয়ে নালিশ করে " শিকারে পরিণত হওয়া পোষক কত খারাপ" তা জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিবে একের পর এক। হুমকিতে কাজ না হলে পাবলিক পরিসরে গিয়ে এরপর শুরু করবে ভিন্ন মাত্রার ব্লাকমেইল। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর পোষকের রক্তমাংস খেয়ে মোটাতাজা হতে পাইরা পরজীবী হয়েও এদের এতই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় যে, ভাবে আগের মতো এবারও শিকারকে নিউরোটক্সিন প্রয়োগ করে পরাস্ত করে ফেলবে! কোন জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার পর প্রাণীর দেহ যেমন একসময় সেই জীবাণু প্রতিরোধী এন্টিবডি তৈরি করে ফেলে, এদের প্রয়োগ করা নিউরোটক্সিন দ্বারা বার বার আক্রান্ত হয়ে তেমনি পোষকের মনেও নিউরোটক্সিন প্রতিরোধী এন্টিবডি তৈরি হয়ে যায় একপর্যায়ে। তাই সব ডুবেই আর শালুক উঠে না! এতে সমতলে বাস করা অষ্টভুজদের আক্রোশ আরও বেড়ে যায়! দীর্ঘদিন ধরে এমন আরামসে শুষে খাওয়া শিকার হাতছাড়া হলে আক্রোশ হবারই কথা অবশ্য! তাছাড়া আবারও আরেকটি শিকারের সন্ধ্যানে পথে নামতে হবে! কম পরিশ্রমের কাজ তো না!
তাই বলি কী, ব্লু-রিংগডরূপী পরজীবী ড্রামা কুইন অষ্টভুজদের থেকে সাধু সাবধান!!! এরা আপনার আমার আশেপাশেই গিরগিটির মতো নানান ছদ্মবেশ ধারণ করে প্রতিনিয়ত বিচরণ করে চলেছে। একবার ধরতে পারলে আপনার কেল্লা ফতে করে দিবে চিরদিনের জন্য! তখন হায় হায় করেও কোন লাভ হবে না! ধৈর্য্য ধরে দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণ নিয়ে ডুবুরি হয়ে সমুদ্রের গভীর দেশে গিয়ে অক্ষতদেহে ব্লু-রিংগডদের ধরে আনতে পারলে যে পরিমাণ গভীর আনন্দ পাবেন, এদের পিছনে এক মুহূর্ত সময় খরচ করা মানে হবে গাছে ঝুলে থাকা বাদুড়ে খাওয়া পঁচা ফলের পিছনে সময় নষ্ট করার মতো ব্যাপার অনেকটা। কেননা পঁচা ফল এমনিতেই কয়েক দিন পরে ঝরে যায়, এরাও পাঁকে ঝরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকা এক একটা পঁচা ফল।
২৮ জুন, ২০২৬
About the Author
Nadira Yeasmin
মজদুরের নিয়মিত লেখকTeaching
Women's rights activist, Writer, Aditor, Teacher
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন