বাংলাদেশে একজন খু-নির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে মারা যাওয়ার সম্ভাব্যতা কত জানেন? ০.০১ শতাংশ থেকে ০.০৮ শতাংশ।
বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৩৭৫০ টির মত হ-ত্যাকাণ্ড ঘটে। ২০০৯ সাল থেকে এখন অব্দি হ-ত্যাকাণ্ডের মোট সংখ্যা প্রায় ৬৫,০০০। একেকটি হ-ত্যাকাণ্ডের পেছনে যদি গড়ে একজন করেও থেকে থাকেন, তাহলে মোট হ-ত্যাকারীর সংখ্যা অন্তত ৬৫,০০০ জন।
২০০৯ সাল থেকে এখন অব্দি কতগুলো হ-ত্যাকাণ্ডের রায় হয়েছে? প্রায় ৩০০০ টি মামলার। বাংলাদেশে একেকটি মৃত্যুদণ্ডের রায় পেতে নিম্ন আদালতে লাগে প্রায় ১০ বছর, এর পর যখন সেটা হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স এর জন্য যায়, সেখানে লাগে আরও সাড়ে পাঁচ বছর। সব মিলিয়ে ১৫ থেকে ১৬ বছর। পূর্বের মামলা মিলিয়ে, এখন বাংলাদেশে মোট হ-ত্যাকাণ্ডের মামলা রায়ের অপেক্ষায় আছে – এই সংখ্যা ৮০ হাজার থেকে প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজারের মধ্যে।
এত এত হ-ত্যাকাণ্ডের মধ্যে, কতগুলোর রায় বাস্তবায়ন হয়েছে? ২০০৯ থেকে এখন অব্দি মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ৫০ জনের।
অর্থাৎ, ২০০৯ থেকে এখন অব্দি যেই প্রায় ৬৫,০০০ হ-ত্যাকান্ড হয়েছে, তার বিপরীতে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মাত্র ৫০ জনের। অর্থাৎ, একজন খুনের অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড প্রকৃতপক্ষে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বা হার মাত্র ০.০৮ শতাংশ।
এই সংখ্যাটাকে আরেকটু ভয়াবহ করা যায়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে গড়ে যুক্ত থাকেন ৪ থেকে ৬ জন। সেই হিসেবে, এই ৬৫,০০০ মৃত্যুর পেছনে দায়ী আছেন প্রায় ২ লক্ষ ৬০ হাজার থেকে তিন লক্ষ ৯০ হাজার হ-ত্যাকারী। এই সংখ্যা দিয়ে যদি আবার সম্ভাব্যতা মাপি, তাহলে একজন হ-ত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে এই সম্ভাবনা হবে ০.০২ শতাংশ থেকে ০.০১ শতাংশ।
অর্থাৎ, যিনি হ-ত্যাকারী, তিনি জানেন যে, তিনি হ-ত্যা করার পরেও তার মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত হয়ে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ০.০১ থেকে ০.০৮ শতাংশ। বা, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৯৯.৯২ থেকে ৯৯.৯৯ শতাংশ। এই শাস্তি থাকা আর না থাকার মধ্যে পার্থক্য কই?
এই ধরনের ক্ষেত্রে যারা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একটা হ-ত্যার শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড, ১০ টা হ-ত্যার শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড। আবার যেহেতু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ০.০১ শতাংশ, এইসব বড় বড় সন্ত্রাসী জেলের ভেতর থেকেই বছরের পর বছর অপরাধী নেটওয়ার্ক চালিয়ে যায় নিশ্চিন্তে। জেলে থাকার সুবিধা অনেক। তাদের থাকা, খাওয়া ফ্রি, সারাক্ষণ থাকে পুলিশ পাহারায়। আবার তাদের অনেকেরই থাকে সুবন্দোবস্ত।
বাংলাদেশের সকল মামলার দীর্ঘসূত্রিতার প্রধানতম কারণ আমাদের দেশে বিচারকের অভাব। বাংলাদেশে প্রতি ১ লক্ষ জনের বিপরীতে বিচারক আছেন মাত্র ১ জন। ভারত ও পাকিস্তানে প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় জজ আছেন ২ জন। নরওয়ে, সুইডেন, বা ফিনল্যান্ডে প্রতি এক লক্ষ জনের জন্য জজ আছেন ১১ থেকে ২০ জন। প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যার বিপরীতে বিচারকের সংখ্যায় আমরা পৃথিবীতে সর্বনিম্ন।
দীর্ঘসূত্রিতার পেছনে দুর্নীতিরও দায় আছে। অনেক অপরাধীরা মামলা দীর্ঘায়িত করতে দুর্নীতির আশ্রয় নেন। অনেক দুর্ধর্ষ অপরাধী দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে লিপ্ত হন।
বিশাল বড় বড় মেগা প্রজেক্ট আপাতত আগামী কয়েক বছর না করে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নজর দিন। আরও বেশি সংখ্যক বিচারকের নিয়োগ দিন। জমে থাকা ৪৭ লক্ষ কেসের সমাধানে, বিচারকের সংখ্যা ১০ থেকে ২০ গুণ বাড়ান। বিচারকদের দায়বদ্ধ করুন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর বিকল্প নাই।
শুধু কাগজে কলমে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে কোন লাভ নেই। হয় আজীবন কারাদণ্ড দিন, অথবা এই শাস্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করুন। দুর্ধর্ষ অপরাধীদের অপরাধ প্রমানিত হলে - জামিন অযোগ্য করুন।
Justice delayed is justice denied.
তথ্যসূত্রঃ
Ahmadul Hassan, & Ahmadul Hassan. (2025, October 5). In 52pc of murder cases, all the accused are acquitted. Prothomalo. https://en.prothomalo.com/bangladesh/fhcwo0d3tv#:~:text=According%20to%20Police%20Headquarters%2C%20between,of%203%2C752%20murders%20per%20year.
Alam, M. S.; Hossain, K. M.(2025). View of Reviewing the Abolishment of the Death Penalty in Bangladesh through the Lens of Human Rights. Khulna University Studies. https://kus.ku.ac.bd/kustudies/article/view/1414/2116
Hoyle, C., & Lehrfreund, S. (2019b). Contradictions in judicial support for capital punishment in India and Bangladesh: Utilitarian rationales. Asian Journal of Criminology, 15(2), 141–161. https://doi.org/10.1007/s11417-019-09304-0
Bangladesh Police Headquarters. (Statistical Archives). Crime Statistics: Murder Cases & Charge Sheet Realities. https://www.police.gov.bd/en/january_2020
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন