সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

নারীর অধিকার ও বাংলাদেশ

বাংলাদেশে এখন যেরকম বহুমুখী বহুধাবিভক্ত শিক্ষা আছে, সেটাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি। আবার, শিক্ষার পাশাপাশি পাঠদানেও পরিবর্তন দরকার। দরকার প্রতিটা উপজেলায়, শিল্প ঘনত্ব বিবেচনায় নির্দিষ্ট সংখ্যক ডে কেয়ার সেন্টার। তবে, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বৃন্দ, এবং গণমাধ্যম।

Mahtab Uddin
Mahtab Uddin মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 6 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 76 বার পড়েছে
নারীর অধিকার ও বাংলাদেশ

সমাজকে আমরা সমাজবিজ্ঞানীরা বলি একটি একই সুতোয় গাঁথা সিস্টেম। অনেকটা কাঁথার মতন। এখানে বিভিন্ন সুতোর বুনন থাকলেও, আদতে সবগুলো সিলির মধ্যে সম্পর্ক থাকেই। এখানেও তাই।

নারীর প্রতি বাংলাদেশে সহিংসতা অভাবনীয় রকমের। UNFPA ও বিবিএস এর ২০২৪ সালের একটা জরিপ আছে। সেখানে বলছে বাংলাদেশের চল্লিশ শতাংশ নারী পূর্ববর্তী এক বছরের মধ্যে তাদের স্বামী বা নিকট পরিজনের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জরিপকৃত নারীদের ৭২ শতাংশ কোনো না কোনো সময়ে তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শিশু ধর্ষনের হার বাংলাদেশে অত্যধিক রকমের বেশি। এক জরিপ বলছে বাংলাদেশে গড়ে প্রতি দিন দুইজন শিশু ধর্ষনের শিকার হয়। এপস্টাইন এর ফাইল নিয়ে আমাদের এত উৎসাহ: এরকম এপস্টেইন ঘুরে বেড়ায় আমাদের পাড়ায় পাড়ায়, স্কুলে, মাদ্রাসায়, এমনকি ধর্মীয় উপাসনালয়ে।

এই যে নারীর প্রতি সহিংসতা, এর বহুবিধ কারণ আছে। সমাজে নারীকে এখানে মূলত প্রতিষ্ঠা করা হয় "বাচ্চা উৎপাদনের হাতিয়ার"। নারীর মূল কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাচ্চার জন্মদান, বাড়িতে থাকা শিশু এবং বার্ধক্যের সেবা, ইত্যাদি। নারীর বাড়ির কাজের অবশ্যই অসম্ভব গুরুত্ববহন করে এবং এর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু, সমাজে এই দায়িত্বকে শুধু নারীর উপর আরোপ করা হয়, যেনো এই সকল দায়িত্ব শুধুই নারীর। ঘরের রান্না বান্না থেকে শুরু করে, ঘর পরিষ্কার, শিশু ও বার্ধক্যের সেবা সব কিছুতেই যে পুরুষেরও সমান দায়িত্ব আছে – এটা বিদ্যমান “পুরুষতান্ত্রিক” সমাজ মানতে প্রবলভাবে নারাজ।

বক্তব্যের এই পর্যায়ে এসে “পুরুষতন্ত্রের” ঝান্ডাধারীরা প্রবল বেগে বলা শুরু করেন, “তাহলে, আপনারাই বাচ্চা পয়দা করে দেখান”। একজন নারী নয় মাস সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, তারপর সন্তান জন্মদানের মতন একটা অমানুষিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যান; সন্তান ধারণের জন্য একজন নারী কৈশোর থেকে মধ্য বয়স পর্যন্ত প্রায় তিন দশক প্রতি মাসে মাসিকের ব্যথার মধ্য দিয়ে যান। এর পরেও কেনো নারীর কাছে আরও বেশি কিছু চাইতে হবে? এটাই তো ঢের বেশি। নারী যে সন্তানকে ধারণ করছেন, এর পর তো নারীকে আপনার মাথায় তুলে রাখা উচিত। সেখানে সন্তান জন্মদানের পর, সেই সন্তানের সব দেখভালের আশাও একলা নারীর উপর কেনো দেয়া হবে?

ওপরের এই যুক্তিতে একটা ছোট গলদ আছে অবশ্য। "নারীর মূল দায়িত্ব" শুধু বাচ্চা উৎপাদনে - এই দৃষ্টিভঙ্গই সমস্যাদায়ক। একজন নারীর স্বাধীনতা আছে তার গর্ভের উপর। তিনি সন্তান নেবেন, বা নেবেন না - সেই সিদ্ধান্তে অংশ নেয়ার স্বাধীনতা বাংলাদেশের কত শতাংশ নারীর থাকে? সন্তান জন্মদানের সাথে নারীর অধিকারের সম্পর্ক আসলে নাই।

পোশাক, কর্ম, ধর্মের ব্যাপারে নারীর স্বাধীনতা থাকতে হবে। নারী কি পড়লেন বা কি পরলেন – দুটোই হওয়া উচিত নারীর ইচ্ছায়। কেউ যদি অনার্স মাস্টার্স করে বাসায় বাচ্চাকে দেখা শোনা করতে চান – সেটাও যেমন সম্মানের চোখে দেখা উচিত, আবার যিনি ক্যারিয়ারকে বেছে নিচ্ছেন – তাকেও সম্মান দেয়া উচিত।

আর এখানেই আমাদের গলদ। যেসকল নারী শুধু ঘর সামলাচ্ছেন, তাদের প্রতিও কিন্তু পুরুষের সম্মান নাই। এদের মধ্যে নারী নির্যাতনের হার বরং বেশি। আবার, যেসকল নারী বাইরে চাকরি করছেন, তাদের প্রতি রয়েছে সমাজের তুচ্ছার্থক দৃষ্টিভঙ্গি। ঘরে বন্দী নারীরাও কিংবা বাইরে কাজ করা পুরুষেরাও তাদের হেয় করে দেখেন। নিজস্ব পরিসরে খোটা দিয়ে কথা বলা, কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে শুধু “নারী” বলে “পারবে না” বা “এক্সট্রা ঝামেলা” বলে মনে করা পুরুষের হার নিতান্ত কম হবে না।

এই মানসিকতার একটা শক্ত আর্থসামাজিক ভিত্তি আছে। নারীকে হেয় বা ছোট করে রাখার অন্যতম কারণ যাতে নারীকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায়। সমাজে নারীকে যত ছোট বা হেয় করে রাখা যাবে, সম্পত্তিতে নারীকে বঞ্চনা করা ততোই সহজ হবে। আর এই এক ব্যাপারে একদম উচ্চ শিক্ষিত পুরুষ থেকে শুরু করে একদম নিম্ন শিক্ষিত পুরুষের মধ্যে এক ধরনের সম মানসিকতা পাওয়া যাবে। অন্য সকল কিছুর ব্যাপারে তারা দ্বিমত হলেও, এই এক ব্যাপারে তারা একমত – “মেয়ে মানুষ আবার বাপের বাড়ির সম্পত্তি দিয়ে কি করবে?”। সেখান থেকেই এই বক্তব্যের প্রচলন যে, নারীকে বাপের বাড়ির সম্পত্তি যত কম দেয়া যায়। আমার নিজের চোখে দেখা – একদম হজ করে আসা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া মানুষজনও তাদের বোনদেরকে সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারার সময় ইসলামে যতটুকু বলা আছে, সেটাও দেন নাই। এই ধরনের মানুষের জন্য মায়া লাগে। তারা কি আসলেও ভাবে যে সম্পদের এরকম বণ্টন করে পরকালে বেহেশত পাবে? এরকম বাস্তবতায় – নারী পুরুষের সম্পদে সমান অধিকারকে অনেক দূরের গন্তব্য মনে হয়।

যত বাঁধাই থাকুক, সম্পত্তিতে নারী পুরুষের একদম সমান হার থাকা উচিত। এটা যদি আইন দিয়ে সিদ্ধ করা যায়, তাহলে হয়তো সমাজে নারীর অবস্থানের কিঞ্চিৎ পরিবর্তন হতেও পারে।

কিন্তু শুধু সম্পদের সম বণ্টনের আইনের মাধ্যমে পুরো পরিবর্তন আশা করা অসম্ভব। সবচেয়ে বড় দরকার বিজ্ঞানমুখী আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা। বাংলাদেশে এখন যেরকম বহুমুখী বহুধাবিভক্ত শিক্ষা আছে, সেটাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি। আবার, শিক্ষার পাশাপাশি পাঠদানেও পরিবর্তন দরকার। দরকার প্রতিটা উপজেলায়, শিল্প ঘনত্ব বিবেচনায় নির্দিষ্ট সংখ্যক ডে কেয়ার সেন্টার। তবে, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বৃন্দ, এবং গণমাধ্যম। জেন্ডার স্টিরিওটাইপিং বা misogyni আসলে কি, এবং এর প্রকারভেদ কেমন বা কীভাবে এর থেকে উত্তরণ সম্ভব – সেটার ব্যাপক প্রচার দরকার। সর্বোপরি দরকার, কেউ যেন নারীকে নারী বলে কোনো ক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার করতে না পারে, তার আইনি ভিত্তি।

তবে, নারীর অধিকারের এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় ড্রাইভ হয়তো দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে। রাজনৈতিক পরিসর থেকে নারীর অধিকার বাস্তবায়নের সদিচ্ছা দরকার। সেখানে যেসব রাজনৈতিক দল নারীকে শুধু “মা” বলে অধিকার দেয়ার কথা বলে – তাদের ব্যাপারেও সতর্কতা প্রয়োজন।

আগামীর বাংলাদেশে নারী শুধু গাড়ি বা প্লেন কেনো, তারা বাস, ট্রাক বা যেকোন বাহন চালাবেন। সকল পেশাতেই নারীদের বিচরণ হোক সমান স্বাধীনতায়। ঘর বা কর্মস্থল – সকল ক্ষেত্রেই নারীর পদচারণা হোক নিরাপদ ও সম্মানের।

Mahtab Uddin

About the Author

Mahtab Uddin

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষক ও গবেষক

উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast