শ্রেণী-চেতনা (Class Consciousness) এবং ভ্রান্ত চেতনা (False Consciousness) - এই দুটি ধারণা কার্ল মার্কস উপস্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে অন্যান্য সমাজতাত্ত্বিকরা আরও বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করেন। মার্কস তাঁর বই "Capital, Volume 1"-এ এবং তাঁর সহলেখক ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত বিপ্লবী গ্রন্থ "Manifesto of the Communist Party"-তেও এই তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
শ্রেণী-চেতনা বলতে বোঝানো হয়েছে কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক শ্রেণীর সদস্যদের নিজেদের অবস্থান ও স্বার্থ সম্পর্কে সেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর প্রেক্ষিতে সচেতনতা।
অন্যদিকে, ভ্রান্ত চেতনা হল এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে ব্যক্তি নিজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কেবল ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, এবং নিজেকে কোনো বৃহত্তর শ্রেণীর সদস্য হিসেবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় , ফলে সে তার শ্রেণীর যৌথ স্বার্থ ও অবস্থান সম্পর্কে অন্ধ থেকে যায়।
মার্কসের শ্রেণী-চেতনার তত্ত্ব
মার্কসবাদী তত্ত্ব অনুসারে, শ্রেণী-চেতনা হলো নিজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণী সম্পর্কে সচেতনতা; অন্য শ্রেণীগুলির তুলনায় নিজের অবস্থান ও ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা, এবং সমাজের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে নিজের শ্রেণীর অর্থনৈতিক অবস্থান বোঝা। এর পাশাপাশি, শ্রেণী-চেতনা মানে হলো সেই শ্রেণীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য, এবং বিদ্যমান সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে শ্রেণীর যৌথ স্বার্থ ও পরিচয় বোঝা।
শ্রেণী-চেতনা মার্কসের শ্রেণী-বিরোধ তত্ত্বের (Theory of Class Conflict) একটি কেন্দ্রীয় উপাদান, যেখানে মূলত পুঁজিবাদী অর্থনীতির শ্রমিক ও মালিক শ্রেণীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই ধারণা মার্কসের সেই তত্ত্বের সঙ্গেও যুক্ত, যেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে শ্রমিকরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উৎখাত করে সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক নতুন সমাজ-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
প্রলেতারিয়েত বনাম বুর্জোয়া
মার্কস বিশ্বাস করতেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মূলত শ্রেণী-বিরোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত; বিশেষত বুর্জোয়ারা (উৎপাদনের মালিক ও নিয়ন্ত্রক) প্রলেতারিয়েতদের (শ্রমিকদের) অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করে। তিনি যুক্তি দেন যে এই ব্যবস্থা ততক্ষণই টিকে থাকবে যতক্ষণ শ্রমিকরা তাদের শ্রেণী-একতা, অভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ, এবং সংখ্যার শক্তি সম্পর্কে সচেতন না হয়।
মার্কসের মতে, যখন শ্রমিকরা এই বাস্তবতা উপলব্ধি করবে, তখন তারা শ্রেণী-চেতনা অর্জন করবে, আর এই চেতনা তাদেরকে একত্রিত করে একটি বিপ্লবী আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাবে, যা অবশেষে পুঁজিবাদী শোষণব্যবস্থাকে উৎখাত করবে।
হাঙ্গেরিয় সমাজতাত্ত্বিক জর্জ লুকাচ (Georg Lukács), যিনি মার্কসবাদী ধারার অনুসারী, তিনি ধারণাটি আরও প্রসারিত করে বলেন যে শ্রেণী-চেতনা হলো এক ধরনের অর্জন, যা ব্যক্তিকেন্দ্রিক চেতনার বিরোধিতা করে এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার "সম্পূর্ণতা" উপলব্ধির জন্য সমষ্টিগত সংগ্রামের ফল।
ভ্রান্ত চেতনার সমস্যা
মার্কসের মতে, শ্রমিকরা শ্রেণী-চেতনা অর্জনের আগে ভ্রান্ত চেতনার মধ্যে বাস করে। যদিও মার্কস সরাসরি “false consciousness” শব্দটি ব্যবহার করেননি, কিন্তু ধারণাটি তাঁর তত্ত্বে স্পষ্টভাবে উপস্থিত।
সহজভাবে বলতে গেলে, ভ্রান্ত চেতনা হলো শ্রেণী-চেতনার বিপরীত। এটি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে, যেখানে একজন মানুষ নিজেকে প্রতিযোগিতামূলক ব্যক্তিগত সত্তা হিসেবে দেখে, নিজের মতো অবস্থানে থাকা অন্যদের সঙ্গে সংগ্রামী সহযোদ্ধা হিসেবে নয়। এর ফলে সে নিজের শ্রেণীর অভিন্ন অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও স্বার্থ সম্পর্কে অন্ধ থাকে।
মার্কস ও তাঁর পরবর্তী তাত্ত্বিকদের মতে, ভ্রান্ত চেতনা বিপজ্জনক কারণ এটি মানুষকে এমনভাবে ভাবতে ও কাজ করতে প্ররোচিত করে, যা তাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী।
মার্কস দেখিয়েছিলেন যে ভ্রান্ত চেতনা গঠিত হয় একটি বৈষম্যমূলক সামাজিক ব্যবস্থায়, যা ক্ষমতাবান অল্পসংখ্যক এলিট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই ভ্রান্ত চেতনা শ্রমিকদের মধ্যে জন্মায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বস্তুগত সম্পর্ক ও অবস্থা, শাসক শ্রেণীর মতাদর্শ (প্রধান বিশ্বদৃষ্টি ও মূল্যবোধ), এবং সমাজের বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যপ্রণালীর মাধ্যমে।
পণ্য পূজার ভূমিকা
মার্কস Commodity Fetishism-এর (পণ্য পূজা) ধারণাটি তুলে ধরেন, যেখানে পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা মানুষে-মানুষে সম্পর্ক (শ্রমিক ও মালিক) কে জিনিসে-জিনিসে সম্পর্ক (টাকা ও পণ্য) হিসেবে উপস্থাপন করে। এর ফলে শ্রমিকদের মধ্যে ভ্রান্ত চেতনা জন্মায়, কারণ এতে প্রকৃত সামাজিক সম্পর্ক আড়াল হয়ে যায় এবং মানুষ বুঝতে পারে না যে এসব সম্পর্ক আসলে পরিবর্তনযোগ্য।
গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্য তত্ত্ব
ইতালীয় চিন্তাবিদ ও কর্মী অ্যান্টোনিও গ্রামশি (Antonio Gramsci) মার্কসের ধারণাকে আরও প্রসারিত করে দেখান যে সমাজে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতাধর গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য (Cultural Hegemony) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে সমাজে একটি "কমন সেন্স" বা “স্বাভাবিক বোধ” গড়ে ওঠে, যা বিদ্যমান অবস্থাকে বৈধতা দেয়।
গ্রামশি বলেন, মানুষ যখন এই "কমন সেন্স"-এ বিশ্বাস করে, তখন সে আসলে নিজের ওপর চলমান শোষণ ও আধিপত্যকে মেনে নেয়। এই “কমন সেন্স” বা প্রচলিত মতাদর্শই ভ্রান্ত চেতনা তৈরি করে, যা সমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রকৃত চিত্রকে বিকৃত করে।
স্তরবিন্যস্ত সমাজে ভ্রান্ত চেতনা
সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ফলে কীভাবে ভ্রান্ত চেতনা তৈরি হয়, তার একটি উদাহরণ হলো সেই বিশ্বাস যে, কেউ চাইলে কঠোর পরিশ্রম ও শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক অবস্থান উন্নত করতে পারে, জন্মপরিস্থিতি যাই হোক না কেন। মার্কিন সমাজে এই ধারণাটি "আমেরিকান ড্রিম" নামে পরিচিত।
এই ধারণা মানুষকে সমাজে নিজের অবস্থানকে ব্যক্তিগত পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে দেখতে শেখায়, এবং বৃহত্তর সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোকে উপেক্ষা করতে বাধ্য করে। ফলে সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়, এবং সমাজের বৈষম্যমূলক কাঠামো আড়াল থেকে যায়।
মার্কসের সময়ে শ্রেণী নির্ধারিত হতো উৎপাদনের উপায়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে; অর্থাৎ মালিক বনাম শ্রমিক। আজকের দিনে আমরা শ্রেণীকে আয়, পেশা ও সামাজিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করেও দেখতে পারি।
তবে কয়েক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ দেখায়, “আমেরিকান ড্রিম” মূলত এক প্রকার মিথ। বাস্তবে, একজন মানুষ যে অর্থনৈতিক শ্রেণীতে জন্মায়, তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের আর্থিক অবস্থান অনেকাংশে সেই শ্রেণী দ্বারা নির্ধারিত হয়। কিন্তু যতদিন মানুষ এই মিথে বিশ্বাস রাখে, ততদিন সে ভ্রান্ত চেতনার মধ্যে বাস করবে।
শ্রেণী-চেতনা না থাকলে মানুষ বুঝতে পারবে না যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি এমনভাবে তৈরি, যেখানে শ্রমিকরা কেবল ন্যূনতম উপার্জন পায়, আর মালিক, নির্বাহী ও আর্থিক শ্রেণী বিশাল মুনাফা ভোগ করে।
উৎস:
Crossman, Ashley. "Understanding Karl Marx's Class Consciousness and False Consciousness." ThoughtCo, 28 এপ্রিল, 2025, thoughtco.com/class-consciousness-3026135.
লেখক পরিচিতি:
অ্যাশলে ফেনজল ক্রসম্যান, পিএইচডি একজন সমাজবিজ্ঞানী, তথ্যবিশ্লেষক এবং লেখিকা; যিনি তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও বিতরণের মাধ্যমে সমাজ এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জটিল বিষয়গুলোতে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেন। তিনি Tivity Health এবং Healthways-এ সিনিয়র ম্যানেজার, প্রধান ডেটা সায়েন্টিস্ট এবং সিনিয়র বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন, যেখানে তিনি স্বাস্থ্য ও সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কিত তথ্যের গুণগত ও পরিমাণগত বিশ্লেষণে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
Crossman ThoughtCo এবং Sociology Guide-এর জন্য সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগুলোর মধ্যে রয়েছে Major Sociological Theories, An Overview of Qualitative Research Methods, এবং Chaos Theory। এছাড়াও, তিনি ২০০৫ সালে Southwest Interdisciplinary Research Center-এ (SIRC) শিক্ষিকা ও রিসার্চ মেথডোলজিস্ট হিসেবে, এবং ২০০৯ সালে HSAG-এ ইনফরমেটিকস অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন।
তিনি শুধু একাডেমিক বা প্রফেশনাল ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নন; নারী ক্ষমতায়ন ও ক্রীড়া উদ্যোগেও তিনি সক্রিয়। ২০০৪ সালে তিনি Girls on the Run of Maricopa & Pinal Counties প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০১০ সালে She Runs Strong চালু করেন, যেখানে নারীদের ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ, জীবন কোচিং এবং আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে সহায়তা প্রদান করা হয়। তার শারীরিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে তিনি দুইবার Ironman এবং তিনবার Half-Ironman সম্পন্ন করেছেন।
শিক্ষাগতভাবে, Ashley Fenzl Crossman Arizona State University থেকে সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেছেন এবং University of Colorado Boulder থেকে সমাজবিজ্ঞানে ব্যাচেলর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। তার গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি সমাজবিজ্ঞান, তথ্য বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্য এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।
About the Author
Md. Belal Hosain Bidda
মজদুরের নিয়মিত লেখকLawyer
“জীবন যেখানে দ্রোহের প্রতিশব্দ, মৃত্যুই সেখানে শেষ কথা নয়।”
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন