সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

মার্ক্সবাদ রোগাক্রান্তকে দেবে আরোগ্য: একটি চিত্রকর্ম ও কমরেড ফ্রিদা কাহলো

ফ্রিদা কাহলো তাঁর ডায়েরিতে লিখে যান-"আমি একজন কমিউনিস্ট এবং ?...

Md. Belal Hosain Bidda
Md. Belal Hosain Bidda মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 4 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 52 বার পড়েছে
মার্ক্সবাদ রোগাক্রান্তকে দেবে আরোগ্য: একটি চিত্রকর্ম ও কমরেড ফ্রিদা কাহলো

ফ্রিদা কাহলো তাঁর ডায়েরিতে লিখে যান-"আমি একজন কমিউনিস্ট এবং কমিউনিস্ট হিসেবেই আমি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করব।"

ফ্রিদা কাহলো এমন এক যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যা ছিল রাজনৈতিক উথাল-পাথাল, বৈপ্লবিক আদর্শ এবং বিশ্বযুদ্ধের কালপর্ব। ১৯১০ সালে মেক্সিকোতে মার্ক্সবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। শৈশবেই তিনি কৃষক শ্রেণীর ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ এবং মেক্সিকোর আদিবাসী সংস্কৃতি ‘মেক্সিকানিদাদ’ (Mexicanidad)-এর পুনরুত্থান প্রত্যক্ষ করেন। ২০ বছর বয়সে পদার্পণ করতেই তিনি মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন, যা তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করেছিল। নির্বাসিত রুশ বিপ্লবী নেতা লিওন ট্রটস্কির সাথে তাঁর সংক্ষিপ্ত সম্পর্কটি পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পভাবনাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে ফ্রিদা কাহলো তাঁর কাজের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে "পার্টির সেবা করা" এবং "বিপ্লবকে বেগবান করার" প্রয়াস চালিয়েছিলেন। আলোচ্য চিত্রকর্মটি তেমনই এক প্রয়াস, যেখানে ফ্রিদা এই ইউটোপিয়ান বা কাল্পনিক তত্ত্বে বিশ্বাস রেখেছিলেন যে, তিনি এবং এই পৃথিবীর সমস্ত নিপীড়িত মানুষ রাজনৈতিক বিশ্বাসের শক্তিতে দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি ও পরিত্রাণ পেতে পারেন।

এই চিত্রে দেখা যায়, তিনি তাঁর চামড়ার কর্সেট (corset) পরিহিত অবস্থায় একটি দ্বিখণ্ডিত পটভূমির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এই পটভূমির এক অর্ধাংশ শান্তি ও শুভ শক্তির প্রতীক এবং অন্য অংশটি অশুভ ও ধ্বংসের আশঙ্কায় জর্জরিত। দুটি বিশাল হাত তাঁকে রোগমুক্ত করছে, যা মূলত মার্ক্সবাদের প্রতীকী রূপ। তাঁর নিজের হাতে তিনি মার্ক্সবাদের একটি লাল বই ধারণ করে আছেন এবং তাঁর ক্রাচ দুটি থেকে নিজেকে মুক্তি দিয়েছেন।

এই পেইন্টিংটি ছিল তাঁর শেষ আত্মপ্রতিকৃতিগুলোর একটি যা তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। চিত্রকর্মটির মূল শিরোনাম ছিল: "পৃথিবীতে শান্তি আসুক, যেন মার্ক্সবাদী বিজ্ঞান অসুস্থ্যদের এবং অপরাধী ইয়াঙ্কি পুঁজিবাদের দ্বারা নির্যাতিতদের রক্ষা করতে পারে।"

কাহলো কয়েক দশক ধরে এমন অনেক যুগান্তকারী ও নারীবাদী আত্মপ্রতিকৃতি তৈরি করেছিলেন, যেখানে তিনি তাঁর নিজের জীবনের শারীরিক ও মানসিক বেদনার দিকগুলো, যেমন বৈবাহিক সম্পর্কের ভাঙন থেকে শুরু করে গর্ভপাত; অতি সূক্ষ্মভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন। সেই জায়গা থেকে জীবনের শেষলগ্নে তাঁর এই প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ ছিল শিল্পীর নিজস্ব এক ধরণের আত্মিক সমাধান। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি কাহলোর দায়বদ্ধতা যত বাড়ছিল, তাঁর শিল্পকর্মের সাথে রাজনৈতিক বিশ্বাসের একটি বৃহত্তর সংযোগ স্থাপনের আকাঙ্ক্ষাও তত তীব্র হচ্ছিল।

কাহলোর ঘরটি ছিল তৎকালীন বহু আমূল সংস্কারবাদী চিন্তাবিদদের (Radical Thinkers) আশ্রয়স্থল। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন; পা কেটে ফেলা এবং স্বাস্থ্যের চরম অবনতি সত্ত্বেও তিনি হুইলচেয়ারে বসেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে কাহলো তাঁর এই চিত্রকর্মটি অসমাপ্ত রেখেই মৃত্যুবরণ করেন। এই মহান শিল্পীর শেষকৃত্যে সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয়েছিল বিখ্যাত বিপ্লবী সঙ্গীত 'দ্য ইন্টারন্যাশনাল' (The International) এবং তাঁর কফিনটি হাতুড়ি-কাস্তের কমিউনিস্ট প্রতীক সংবলিত লাল পতাকায় আচ্ছাদিত করা হয়েছিল।

কাহলো এমন একজন নারী ছিলেন যিনি লিঙ্গ এবং যৌনতার প্রচলিত সামাজিক বৃত্তকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন। একজন মেক্সিকান হিসেবে, এবং তীব্র ব্যক্তিগত ট্রমা ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করা একজন মানুষ হিসেব, মুক্তির সংগ্রামের আসল অর্থ কী, তা তিনি খুব ভালো করেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। আর এই আদর্শটিই তিনি মার্ক্সবাদের দর্শনে খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, তাঁর শিল্পের পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, স্বদেশের প্রতি প্রেম এবং আমরণ লড়াইয়ের জেদই কাহলোকে পূর্ণতা দিয়েছিল। কাহলো দৃশ্যত তাঁর শেষ পেইন্টিংয়ের বার্তার মধ্যেই নিজের আত্মিক শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন, যেখানে এক জীবনের ব্যক্তিগত বেদনা এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কাহলোর পেইন্টিংগুলো (যেমন- ‘দ্য ব্রোকেন কলাম’) সাধারণত চোখের জলের চিত্রায়নের জন্য বিখ্যাত; কিন্তু জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার প্রাক্কালে এই শিল্পকর্মটি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন- "জীবনের প্রথম বারের মতো, আমি আর কাঁদছি না।"

তথ্যসূত্র:

  1. https://www.fridakahlo.org/marxism-will-give-health-to-the-sick.jsp

  2. https://medium.com/the-collector/how-marxism-healed-frida-kahlo-81bc11b67340

  3. https://actipedia.org/project/marxism-will-give-health-sick

  4. https://artsandculture.google.com/asset/marxism-will-give-health-to-the-ill/HAElPPnYYlxEWA?hl=en

 

Md. Belal Hosain Bidda

About the Author

Md. Belal Hosain Bidda

মজদুরের নিয়মিত লেখক

Lawyer

“জীবন যেখানে দ্রোহের প্রতিশব্দ, মৃত্যুই সেখানে শেষ কথা নয়।”

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast