এই সমাজে কি ‘*দি’ (cdi) আসলে কাকে বললে সবচেয়ে বেশি অপমান করা হয় বলে মনে করা হয়? রাস্তাঘাটে বিভিন্ন সময় সুদানির পুয়া, মাদার**দ, এই গালি গুলো কাকে মিনিং করে দেওয়া হয়? আমরা প্রত্যেকেই জানি। এই কথাগুলো এই সামাজিক মাধ্যমে নতুন কিছু নয়। চ বর্গীয় পুরো গালিটিই নির্ভর করে আছে নারীর শরীর ও যৌনতা কেন্দ্রিক। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। ইংরেজি মাদারফাকারের উৎস আর বাংলায় মাদারচো* এর উৎস এক না। কালো দাস নারীকে যৌন সহিংস করে জন্ম দেওয়া বাচ্চারা যখন পিতার স্বীকৃতি পেতো না, তখন সেই পিতাকে তারা পিতা না বলে মাদারফাকার বলতো।
সেই কৃষ্ণাঙ্গদের মাদারফাকার বলার এক নিপীড়নের ইতিহাস আছে। কিন্ত কথায় কথায় এই শব্দগুলো ব্যবহারের পেছনে সেই উদ্দেশ্য থাকেও না। তাই এই গালিগুলো নারীর যৌনতাকে অপমান করতেই করা হয়। এই নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা না দিলেও পাঠক বুঝবে।
কিন্ত কোন জনগণের সংগ্রামকে যখন কেউ এই একই শব্দবন্ধ দিয়ে ডিমিইন করতে চায়, সে তার সর্বোচ্চ পিতৃতান্ত্রিক রাজনৈতিক ভাষাকেই প্রকাশ করে। সে একটা গণআন্দোলনকে সেই নারীর শরীর দিয়ে চিন্তা করে, যে শরীরকে (cdi) করলে ভীষণ অপমান করা হবে মনে হয়। আজকাল গালিকে ডিক্রিমিনালাইজড করার কথা অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়।
যেমন নারীবাদীদের বিচ বলে গালির উল্টোভাবে নারীবাদীরা ‘আই এম বিচ’ বলে এই গালিকে ডিক্রিমিনালাইজড করে। কালোরা নিজেদেরকে ‘নিগা’ বলে ডিক্রিমিনালাইজড করে। সেইটা একটা পাঠ। নিপীড়িত বা সংক্ষুব্ধ পক্ষের নিজেদের প্রতি গালি করা নিয়ে উপহাস করা।
কিন্ত আসলেই যদি কোন হোয়াইট সুপ্রিমেসিতে সংকল্পবদ্ধ ব্যক্তি কালোকে নিগা বলে কিংবা খুবই ঘিনঘিনে মিসোজেনিস্ট নারীকে বিচ বলে গালি দেয়, তবে তা আর উপহাস থাকে না। অপমানই হয়।
তো অভিনেত্রী শাওন জুলাই কে ডিমিইন করতে পিতৃতান্ত্রিক পথকে বেছে নিয়েছে। এই নিয়ে তো কোন সন্দেহ নেই। এই রাজনৈতিক পথ আওয়ামীলীগের মতো মনস্তাত্ত্বিক একটি ফ্যাসিস্ট দলের সমর্থকদের পক্ষে সম্ভব। যারা মানুষের লাশের উপর দিয়েও একটা গণআন্দোলনের চরিত্রকে কেবল ‘হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখতে চায়, যারা জুলাইয়ের সাথে ন্যুনতম অংশগ্রহণকারীর মৃত্যুতেও উল্লাস প্রকাশ করে, তাদের কাছে আমরা অন্য কি ই বা দেখার আশা করি?
নির্বাচনের আগে কমরেড মিশু আপা জামাতের নারীবিদ্বেষী বয়ানের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে গিয়েছিলেন, আরও কিছু নারী কমরেডসহ। লড়াকু মিশু আপাকে এক আওয়ামীলীগ রাজনীতির সমর্থনকারী এবং নিজেকে নারীবাদী হিসেবে পরিচয়, নারীবাদী নিয়ে অনেক পড়াশুনা আছে বলে ওপেন চ্যালেঞ্জ দেওয়া এক জৈবিক নারী বলেছিলো, ‘ভাসুরের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়েছে’।
কিংবা জুলাইয়ে অংশ নেওয়া নারীদেরকে লালমাগী বলা ব্যক্তিগণ ও সাপোর্টকারীদের কাছে আমরা কোন ভাষা আশা করবো? তাদের কেউ কেউ উপদেষ্টা রেজওয়ানার যোনিপথ নিয়ে মতামত দিয়ে ফেমিনিস্ট পুরুষ হিসেবেও কি পরিচয় দেয় না?
তারা জুলাই কে ‘লালমাগী’ দের আন্দোলন ভাবে বলেই, জুলাইকে চু’’তে যায়। তাদের ভেতর সেই প্রবল আগ্রাসী পুরুষটা আছে, যা পাকবাহিনীর বাঙালি নারীর উপর ধর্ষণ মনস্তত্ত্বের চাইতে ভিন্ন কিছু না।
কিন্ত মনস্তাত্ত্বিক ফ্যাসিস্ট শক্তি এর সাথে রাজনৈতিক লড়াই কি সেই একই প্রকার ধর্ষণকামী ও যৌনবাদী হচ্ছে না? যারা নারীর শরীরকে অপমান করে গালি দিচ্ছে, তাদেরকেও তো নারীর শরীর হিসেবে যোনী পথে লাল মরিচের ডলা দিতে চাচ্ছে। তারাও তো ভরে দিতে চাচ্ছে, তারাও তো ধর্ষণের সেই ভাষা ব্যবহার করছে।
যাকে জুলাই পরবর্তী ফিগার বানানোর চেষ্টা ইসলামিস্ট রাজনৈতিক পক্ষের ছিলো, সেই ফিগার হাদী জাতীয় ভাবে নারীর যোনীকে ছিঁড়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছে এবং সেইটা এমব্রেস করা হয়েছে।
পুরো লড়াই এর ময়দানটা আসলেই চলছে নারীর যোনী দিয়ে। জুলাই গণআন্দোলন হয়েছে, বলে তাতে সবটা গণ এর চরিত্র ছিলো তা নয়। আমি যখন লীগের পিতৃতান্ত্রিক আচরণ নিয়ে আলাপ করতে চাই, আমাকে বলা হয় যে ‘কেন আপনি হাসিনার ব্রেসিয়ার নিয়ে উৎসব দেখেন নি’! আমি দেখেছি। জুলাইয়ে গণক্ষোভ আর রোষের বহিঃপ্রকাশকে আমি ঔন করি, আমি গণক্ষোভের সময় স্থাপনা তছনছ করা সংগ্রামেরও পক্ষের মানুষ।
কিন্ত ব্রেসিয়ারের উৎসবটুকু আমার জুলাই না। কারণ আমি জানি ও মানি, ব্রেসিয়ার নিয়ে উৎসবকারীরা কেউই কাদেরের জাংগিয়া নিয়ে উৎসব করেনি, এবং আমি এইও বুঝি শ্রীলংকার পতিত ফ্যাসিস্ট রাজাপাকশের ঘরে নিশ্চয়ই জাঙ্গিয়া ছিলো!
আমি বুঝাতে চাই, জুলাইয়ের আগে পরে কিংবা ঐতিহাসিক নানাবিধ বুর্জোয়া রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি বিশেষ জিনিস ব্যবহার খুবই কমন, সেইটা হচ্ছে নারীর যৌনতা। সে যুদ্ধে ধর্ষণ করে হোক, যৌন সহিংসতা করে হোক, গালি দিয়ে হোক, রাজনৈতিক লড়াইটা চলে নারীর যোনী দিয়ে। সেই লড়াই নারী ও পুরুষ সমভাবেই করে। শাওনের cdi ও গণভবনে পুরুষের হাতে নারীর ব্রেসিয়ারের ছবি একই চিত্র।
আপনি বলতে পারেন বুর্জোয়া বলছেন কেন? শ্রমজীবি আন্দোলনে যৌন হয়রানি কি হয়না? শ্রমজীবি আন্দোলন কি বুর্জোয়া মনস্ত্বত্ত বহন করে না? আমি যখন ‘বুর্জোয়া রাজনৈতিক লড়াই’ বলছি, তখন কেবল আন্দোলনকারীদের শ্রেণিগত পরিচয় বোঝাচ্ছি না; বরং এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বোঝাচ্ছি, যেখানে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নারীর দেহ, যৌনতা ও মর্যাদাকে প্রতীক, অস্ত্র বা যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
নারীবাদী হিসেবে আমি মনে করি, কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নারীর যোনিকে ক্ষমতার প্রতীক, অপমানের মাধ্যম বা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে, সেটিই বিশ্লেষণ করা। আমাদের কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি বা ‘রাজনৈতিক চিন্তা’ অবশ্যই ‘গণ’ এর ক্যারেক্টার হারাবে, যখন আমরা তাকে এই পৌরুষ আধিপত্য চিন্তা ও ধর্ষণ মনস্তত্ত্ব দিয়ে নির্মাণ করতে চাইবো!
হাজার বছর ধরে নারী গণআন্দোলনে লড়াই করেছে, ঐতিহাসিকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে এবং তা করেছে সে তার নিজের মেধা ও শক্তি দিয়েই । কিন্ত বারবারই নারীর যোনী দিয়েই রাজনীতির ভাষা নির্মাণ করা হয়। পক্ষে কিংবা বিপক্ষে।
এই ধারাবাহিকতা থেকে না বের হলে, রাজনীতির নতুন লড়াইয়ের মাঠ সৃষ্টি হচ্ছে না!
About the Author
Marzia Prova
মজদুরের নিয়মিত লেখকJob
Marxist Feminist, Activist and Writer
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন