দারিদ্র্য আর বৈধব্যের অভিশাপ থেকে বাঁচতে ২০২৪ সালের শেষে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ফারহানা (ছদ্মনাম)। ভেবেছিলেন একটি সংস্থায় চাকরি করে সন্তানদের মুখে অন্ন জোগাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাত্র কয়েক মাসেই রূপ নেয় এক জীবন্ত নরকে। মানব পাচার, দাসত্ব, উপর্যুপরি যৌন নিপীড়ন এবং কারাদণ্ড ভোগ করে অবশেষে যখন তিনি দেশে ফেরেন, তখন তিনি সমাজ-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন, অন্তঃসত্ত্বা এবং মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত।
ফারহানার এই লোমহর্ষক গল্প কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি প্রতি বছর মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া হাজার হাজার নারী শ্রমিকের চরম সুরক্ষাহীনতার এক নির্মম দলিল।
১. স্বপ্নের আড়ালে দালালের মরণফাঁদ
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া ফারহানার জীবন শুরু থেকেই ছিল কণ্টকাকীর্ণ। অল্প বয়সে বাবা হারানো, মায়ের পুনর্বিবাহ এবং পরবর্তীতে স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু তাকে ঠেলে দেয় চরম দারিদ্র্যে। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে এক কাপড়ের কারখানায় কাজ করার সময় পরিচয় হয় এক দালালের সাথে।
প্রলোভন: সৌদি আরবের এক নামী কোম্পানিতে ভালো বেতনের চাকরি।
বাস্তবতা: পাসপোর্ট, মেডিকেল পরীক্ষা ও দালালকে কমিশন দেওয়ার পর সৌদি আরবে পা রাখতেই পাল্টে যায় পুরো দৃশ্যপট।
২. ধাপে ধাপে দাসত্ব ও যৌন নিপীড়ন
সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর ফারহানাকে কোনো কোম্পানিতে নয়, বরং আটকে রাখা হয় একটি হোটেলে। এরপর শুরু হয় তাকে হাতবদল ও বিক্রির এক অন্ধকার অধ্যায়:
গৃহদাসের জীবন: একটি পাঁচতলা বাড়িতে তাকে দিনরাত কাজ করতে বাধ্য করা হয়। ক্ষুধার্ত অবস্থায় ফ্রিজ থেকে কয়েকটি খেজুর খাওয়ার অপরাধে তার রান্নাঘরে ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়।
মানুষ কেনাবেচা: পরে অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে ফারহানা জানতে পারেন, তাকে ১০,০০০ সৌদি রিয়ালে কিনে নেওয়া হয়েছে।
ধারাবাহিক নিগ্রহ: মালিকের ছেলের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে পুলিশে অভিযোগ করতে গেলে উল্টো তাকেই দোষী করা হয়। সেখান থেকে পালিয়ে জেদ্দায় গেলে 'পুতুল' ও 'খলিল' নামের দুই বাংলাদেশি দালালের খপ্পরে পড়ে জোরপূর্বক দেহব্যবসায় বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়।
মরুভূমির বন্দিদশা: মক্কায় পালিয়ে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। এক পাকিস্তানি চক্রের খপ্পরে পড়ে মরুভূমির এক প্রত্যন্ত বাড়িতে আবারও যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিনি।
"বিদেশে যাওয়ার আগে ভেবেছিলাম আমার জীবন বদলে যাবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর বুঝতে পারলাম মানুষ কীভাবে বিক্রি হয়।" — ফারহানা
৩. গর্ভধারণ, জেলখানা ও দেশে প্রত্যাবর্তন
চরম নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর সৌদি পুলিশ ফারহানাকে উদ্ধার করলেও ভাগ্য সহায় হয়নি। মেডিকেল পরীক্ষায় তিনি অন্তঃসত্ত্বা প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে পাঠানো হয় কারাগারে। সেখানে চলে চাবুক মারা ও বৈদ্যুতিক শকের মতো অমানুষিক নির্যাতন।
দীর্ঘ ৫ মাস জেল খাটার পর গত মার্চ মাসে শূন্য হাতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয় তাকে। বিমানবন্দরে তাকে উদ্ধার করে ব্র্যাক (BRAC) এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (BNWLA)-র আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়, যেখানে গত ২৪ মে তিনি এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন।
৪. নীতিগত প্রশ্ন: রাষ্ট্র আসলে কোথায়?
ফারহানার এই গল্প নতুন কিছু নয়। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর মধ্যপ্রাচ্য (বিশেষ করে সৌদি আরব) থেকে প্রায় ৩,০০০ নারী কর্মী এভাবে নির্যাতিত ও নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে আসেন। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের অনেকেই বৈধ এজেন্সির মাধ্যমে সরকারি নিয়ম মেনেই বিদেশ গিয়েছিলেন।
এই বাস্তবতায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে কিছু জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন:
আইনি ও পুনর্বাসন সহায়তার অভাব: বেসরকারি সংস্থাগুলো জরুরি সেবা দিলেও, ভুক্তভোগী নারীদের পুনর্বাসনে রাষ্ট্রের স্থায়ী কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই।
জবাবদিহিতার অভাব: ফারহানা দেশে ফেরার চার মাস পার হয়ে গেলেও কোনো সরকারি সংস্থা তার খোঁজ নেয়নি।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি: যে দালাল বা এজেন্সিগুলো নারীদের এভাবে বিদেশে পাচার করছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনার হার নেই বললেই চলে।
শেষ কথা
সব হারিয়ে ফারহানা এখন তাঁর সদ্যজাত কন্যাসন্তানের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ চান। তিনি চান না অন্য কোনো বাংলাদেশি নারীর ভাগ্য যেন তাঁর মতো এমন নির্মম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—আর কত ফারহানার জীবন ধ্বংস হলে টনক নড়বে প্রশাসনের?
About the Author
কাজী মোহাম্মদ আসিফ
মজদুরের নিয়মিত লেখকBarisal sodor, Barisal, bangladah.
"সমতা, ন্যায়বিচার এবং মেহনতি মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে ও লিখতে পছন্দ করি। একটি বৈষম্যহীন এবং সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নে বিশ্বাসী।"
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
1এরকম একটা লেখা দরকার ছিলো। ধন্যবাদ লেখককে। এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত লেখা প্রয়োজন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন