সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত?

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মেধাবী প্রজন্ম গড়ার বদলে সামাজিক বৈষম্যকে আরও গভীর ও স্থায়ী করে তুলছে। তিনটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত এই কাঠামো শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতা ও সুযোগের জগতে বড় করছে। দারিদ্র্য ও উচ্চ খরচের কারণে লাখ লাখ শিশু মাধ্যমিকের আগেই ঝরে পড়ছে, যা জাতীয় মেধার অপচয়।

চিত্রণ ভট্টাচার্য আদি
চিত্রণ ভট্টাচার্য আদি মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 4 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 88 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 1 জন পাঠক পড়েছেন
শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত?

একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল ভিত্তি হওয়ার কথা তার শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন উল্টো এক গল্প বলে। যে শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করবে, দক্ষ করে তুলবে এবং সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেই শিক্ষাব্যবস্থাই আজ নানা বৈষম্য, বিভাজন ও সংকটের উৎসে পরিণত হয়েছে। আমাদের শিক্ষা কাঠামো বর্তমানে তিনটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত, সরকারি সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন বা ইংরেজি মাধ্যমভিত্তিক শিক্ষা। এই বিভাজন শুধু পাঠ্যক্রমের পার্থক্য নয়; এটি সমাজের শ্রেণিগত বৈষম্যকে আরও গভীর ও স্থায়ী করে তুলছে। ফলে একই দেশের নাগরিক হয়েও শিক্ষার্থীরা বেড়ে উঠছে তিনটি ভিন্ন বাস্তবতা, ভিন্ন মানসিকতা এবং ভিন্ন সুযোগের জগতে।

প্রাথমিক শিক্ষার দিকে তাকালেই সমস্যার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিশু স্কুলে ভর্তি হলেও তাদের অনেকেই মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ঝরে পড়ে। এর পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, পারিবারিক চাপ, শিক্ষার ব্যয় এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো নানা কারণ। শিক্ষাকে যখন একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা যায় না, তখন দরিদ্র পরিবারের জন্য তা ধীরে ধীরে এক ধরনের বিলাসিতায় পরিণত হয়। ফলে অসংখ্য শিশু অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়, আর তাদের সম্ভাবনাগুলো অপূর্ণ থেকে যায়। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; একটি জাতির জন্যও বিশাল মেধা ও মানবসম্পদের অপচয়।

অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও কিছু মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এই ধারায় শিক্ষা গ্রহণ করলেও তাদের বড় একটি অংশ আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি কিংবা সমসাময়িক দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না। ফলে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মূলধারায় প্রবেশের ক্ষেত্রে তারা প্রায়ই পিছিয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে সীমিত কয়েকটি পেশার মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে যায়। এর ফলে শুধু অর্থনৈতিক সুযোগই সীমিত হয় না, সমাজের ভেতরেও এক ধরনের মানসিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব তৈরি হয়। শিক্ষা যদি সমাজের বিভিন্ন অংশকে কাছাকাছি আনার পরিবর্তে আলাদা আলাদা জগতে বিভক্ত করে ফেলে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় সংহতির জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

একই সময়ে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত বিস্তারও নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো উচ্চমানের সুযোগ-সুবিধা ও আধুনিক পরিবেশ প্রদান করলেও, সেগুলোর খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রেও এক ধরনের অর্থনৈতিক শ্রেণিবিভাগ তৈরি হয়। সমাজের সচ্ছল অংশের সন্তানরা এক ধরনের শিক্ষা পায়, আর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা অন্য ধরনের। শৈশব থেকেই এই ভিন্ন অভিজ্ঞতা সামাজিক দূরত্বকে আরও দৃঢ় করে তোলে। শিক্ষা তখন আর সমতার সেতুবন্ধন থাকে না; বরং বৈষম্যের প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।

এই বাস্তবতার মধ্যে অনেকেই মনে করেন, আংশিক সংস্কার বা ছোটখাটো নীতিগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। কারণ সমস্যাটি কেবল কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; পুরো কাঠামোর মধ্যেই এর শিকড় প্রোথিত। তাই প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে নয়, বরং সর্বজনীন অধিকার হিসেবে দেখা হবে। একটি অভিন্ন শিক্ষানীতি, মানসম্মত সরকারি শিক্ষা, বৈষম্যহীন সুযোগ এবং বাস্তবমুখী পাঠক্রম, এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে নতুন করে ভাবতে হবে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা মডেলের সমর্থকেরা যুক্তি দেন যে, শিক্ষার ওপর বেসরকারি মুনাফাভিত্তিক প্রভাব কমিয়ে এনে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও ভূমিকা বাড়ানো উচিত। তাদের মতে, দেশের সব শিশুর জন্য একই মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে শ্রেণিগত বৈষম্য অনেকাংশে হ্রাস পাবে। মাদ্রাসা শিক্ষায় আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সংযোজন, সরকারি স্কুলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এসব পদক্ষেপ একটি আরও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান সংকট কেবল শিক্ষার সংকট নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সমতা এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। আমরা কেমন সমাজ গড়তে চাই, তার উত্তর অনেকাংশেই নির্ভর করে আমরা কেমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই তার ওপর। শিক্ষা যদি সত্যিই সবার জন্য সমান সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে, তবেই একটি সচেতন, দক্ষ এবং বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

#বাংলাদেশের_শিক্ষাব্যবস্থা #শিক্ষা_সংস্কার #সামাজিক_বৈষম্য #শিক্ষানীতি #বাংলাদেশ #শিক্ষার্থী #মানসম্মত_শিক্ষা #জাতীয়_উন্নয়ন
চিত্রণ ভট্টাচার্য আদি

About the Author

চিত্রণ ভট্টাচার্য আদি

মজদুরের নিয়মিত লেখক

ছাত্রনেতা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট

সাধারণ সম্পাদক - সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, ময়মনসিংহ জেলা শাখা।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast