গত মাসের এক তপ্ত দুপুরের কথা। বাসায় যাওয়ার জন্য একে খান বাস টার্মিনালে অপেক্ষা করছিলাম। পাশেই ছোট একটা টং দোকান, যেখানে দু-তিনজন তরুণ এবং মধ্যবয়সী এক বাস হেলপার দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ হেলপারের ফোন থেকে উচ্চশব্দে একটা কাট-ছাঁট করা ভিডিও বেজে উঠল। ভিডিওতে একজন ধর্মীয় বক্তা বেশ উসকানিমূলক ভঙ্গিতে কোনো একটি বৈজ্ঞানিক বিষয়কে 'বাটপারি' আখ্যা দিয়ে কথা বলছিলেন। ভিডিওটি শেষ হতে না হতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা উনিশ-বিশ বছরের এক তরুণ তড়িৎ বলে উঠল, "দেখছেন মামা? বইপুস্তকে সব ভুয়া তথ্য লেখছে! ফেসবুকে হুজুর তো পুরো ফাটায় দিছে!"
কৌতূহলবশত তাদের জিজ্ঞেস করলাম, "ভাই, ভিডিওর বাকি অংশটা দেখেছেন? যে বিষয়টা নিয়ে উনি কথা বলছেন, সেটার মূল বই বা বিজ্ঞানচিন্তাটা কী, তা যাচাই করেছেন?" তরুণের উত্তর ছিল স্পষ্ট ও নির্দ্বিধ, "পড়াশোনা কইরা কী অইবো ভাই? এখন কি বই পইড়া মানুষ ভাত পায়? ফেসবুকে সব সত্যি তথ্য আইসা পড়ে। আসল কথা হইলো একটা পাসপোর্ট বানিয়ে রোমানিয়া বা দুবাই যাইতে পারলে বাঁচার পথ হবে। দেশে থাইকা পড়াশোনা বা ক্রিয়েটিভ কিছু কইরা কোনো লাভ নাই, ওইখানে লেবারগিরি করলেও তো টাকা আছে।"
এই দৃশ্যটি কোনো একক উদাহরণ নয়; এটি আমাদের দেশের বর্তমান মানসিক মানচিত্রকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। আমরা এমন এক ভার্চুয়াল বাস্তবতায় বাস করছি, যেখানে পুরো সমাজটা যেন সোশ্যাল মিডিয়ার চার ইঞ্চি স্ক্রিনে আটকা পড়েছে। আমাদের চিন্তা, আবেগ, জীবনমুখী লক্ষ্য, এমনকি দৈনন্দিন বিচার-বিবেচনা—সবকিছুই এখন চালিত হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমে।
ফেসবুকই যখন জীবনের পরিমাপক
যেকোনো সামাজিক বা ব্যক্তি জীবনের বিচার-বিশ্লেষণের স্থান এখন দখল করে নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল ট্রায়াল। কোনো একটা খবর বা ভিডিও সামনে এলে সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ন্যূনতম ধৈর্য বা ইচ্ছা কারোর নেই। দেশের আইনি প্রক্রিয়া কিংবা সুস্থ আলোচনার তোয়াক্কা না করে, ফেসবুকে ট্রোল করে এক রাতের ব্যবধানে কাউকে মানসিক ও সামাজিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া, আবার কোনো চটকদার ভিডিওর তোড়ে রাতারাতি কাউকে হিরো বানিয়ে দেওয়াতেই যেন নেটিজেনদের একমাত্র মানসিক খোরাক।
বাস্তব জগতের বইপড়া, জ্ঞানচর্চা, শিল্প-সাহিত্য বা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সৃষ্টিশীল উদ্যোগের প্রতি মানুষের আগ্রহ প্রায় শূন্যের কোঠায়। যদি কোনো কাজকে ফেসবুকে লাইভ করা না যায়, কিংবা রিলস বানিয়ে কয়েক হাজার 'লাইক-শেয়ার' না তোলা যায়, তবে সেই কাজ বা মেধার যেন কোনো সামাজিক অস্তিত্বই নেই।
সৃষ্টিশীলতার অবক্ষয় ও 'সস্তা শ্রম' দেওয়ার মানসিকতা
সোশ্যাল মিডিয়ার এই ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে আমাদের তরুণ প্রজন্মের লক্ষ্য ও ভাবনার ওপর। নতুন কিছু উদ্ভাবন করা, গভীর গবেষণা বা নিজ মেধা দিয়ে দেশে বড় কিছু পরিবর্তন আনার স্বপ্ন এখন বিলুপ্তপ্রয়। পড়াশোনা বা কঠিন প্রশিক্ষণের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ধৈর্য তরুণদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
এর বিপরীতে, আমাদের সামগ্রিক জাতীয় লক্ষ্য যেন একটা জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে—যেকোনো উপায়ে একটা মেট্রিক বা ইন্টারমিডিয়েটের সার্টিফিকেট জোগাড় করে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে সস্তা লেবার হিসেবে পাড়ি জমানো। সোশ্যাল মিডিয়ার সস্তা ডোপামিন আর শর্টকাট মানসিকতা আমাদের তরুণ সমাজকে দীর্ঘস্থায়ী কোনো ক্যারিয়ার বা চিন্তাশীল কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
বিনামূল্যের খেসারত: গড় আইকিউ ও যুক্তির পতন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দিলেও, এর বিনিময়ে আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি। ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ডের সস্তা রিলস আর অনবরত স্ক্রোলিংয়ের কারণে মানুষের স্বাভাবিক মনোযোগের ব্যাপ্তি (attention span) আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
এই গভীর চিন্তা করার অক্ষমতার সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী:
ধর্মীয় অন্ধত্ব ও ব্যবসায়িক প্রোপাগান্ডা: ধর্ম যেখানে নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার কথা, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়ায় সস্তা উসকানিমূলক বক্তব্য বা ফতোয়ার মাধ্যমে একে ভিউ পাওয়ার হাতিয়ার করা হচ্ছে। সত্য-মিথ্যা বিচার না করেই ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে চরমপন্থা ও হিংসা ছড়ানো এখন এক ক্লিকের ব্যাপার।
রাজনৈতিক গুজব ও অন্ধ অনুসরণ: রাজনীতির ময়দান থেকে গঠনমূলক বিতর্ক হারিয়ে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে সাইবার আর্মিও সাজানো প্রোপাগান্ডা। বিকৃত তথ্য ও ভুয়া খবর ছড়িয়ে জনগণকে খুব সহজেই রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বইবিমুখতা ও প্রজ্ঞার দৈন্য: গভীর বিষয় নিয়ে ভাবা, ইতিহাস পড়া বা সাহিত্যচর্চার মতো বিষয়গুলো এখন ব্যাকডেটেড। ফলে সামগ্রিকভাবে সমাজের গড় আইকিউ বা বুদ্ধিবৃত্তিক স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে।
অ্যালগরিদমের দাসত্ব থেকে উত্তরণের পথ
প্রযুক্তি আমাদের জ্ঞানের পথ সহজ করে দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সচেতনতার অভাবে আমরা সেই প্রযুক্তিকেই নিজেদের মানসিক কারাগার বানিয়ে ফেলেছি। যেসব জাতি বিশ্বজুড়ে এ ধরনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে, তারা একে নিজেদের উন্নতি ও উৎপাদনশীল কাজে লাগাচ্ছে; আর আমরা সস্তা কনটেন্ট গিলে নিজেদের মেধা ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করছি।
অ্যালগরিদমের এই অদৃশ্য গোলামি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, আমরা হয়তো ডিজিটালি কানেক্টেড হব, কিন্তু সামাজিকভাবে একটি বিচারবুদ্ধিহীন, অশিক্ষিত এবং দিশেহারা জাতি হিসেবে রয়ে যাব। সোশ্যাল মিডিয়াকে জীবনের মূল চালিকাশক্তি না বানিয়ে, একে কেবল একটি কাজের হাতিয়ার হিসেবে দেখার অভ্যাস তৈরি করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
About the Author
Asif Tanvir Arian
Music, Tutoring
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) । প্রগতিশীল চিন্তাধারা থেকে সমাজ ও রাজনীতির নানান অসঙ্গতি নিয়ে লিখি। আর জীবনের বাকিটা জুড়ে আছে মিউজিক—গিটার আর পিয়ানোই আমার অবসরের সঙ্গী।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন