সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

১২ বছর পড়াশোনার পর আমরা আসলে কী শিখছি?

বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী প্রায় ১২ বছর পড়াশোনা করে, অসংখ্য পরীক্ষা দেয়, হাজারো তথ্য মুখস্থ করে এবং শেষ পর্যন্ত একটি সার্টিফিকেট অর্জন করে। কিন্তু ১৮ বছর বয়সে এসে যদি প্রশ্ন করা হয়, “আপনি আসলে কী করতে পারেন?” উত্তরটা সবসময় পরিষ্কার নয়। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা, বাস্তব দক্ষতার ঘাটতি, সীমিত বিষয় নির্বাচনের স্বাধীনতা এবং ক্যারিয়ার অনুসন্ধানের সুযোগের অভাবের বিপরীতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাগুলো কীভাবে এগোচ্ছে, সেই তুলনার মধ্য দিয়ে এই লেখাটি একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে: একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১২টি বছর নেওয়ার পর, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাঁকে আসলে কী হতে সাহায্য করছে?

Tasbir Kabir
পড়তে 19 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 22 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 1 জন পাঠক পড়েছেন
১২ বছর পড়াশোনার পর আমরা আসলে কী শিখছি?

একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি।

২০২৬ সালের এইচএসসি বাংলা প্রথম পত্রের বহুনির্বাচনি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে,

“মোহাম্মদি বেগ কত টাকার বিনিময়ে সিরাজকে হত্যা করতে চেয়েছিল?”

ক) পাঁচ হাজার
খ) দশ হাজার
গ) পনেরো হাজার
ঘ) বিশ হাজার

একই প্রশ্নপত্রে আরেকটি প্রশ্ন,

“‘লালসালু’ উপন্যাসে হাসুনির মা ঝড় এলে কী করার অভ্যাস?”

ক) নালিশ করা
খ) ঠেঁটে করা
গ) মানত করা
ঘ) কান্না করা

এগুলো কোনো ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণির ক্লাস টেস্টের প্রশ্ন নয়। এগুলো একজন ১৭ বা ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্ন।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষার্থী যদি সঠিকভাবে মনে রাখতে পারেন মোহাম্মদ বেগ ঠিক কত টাকার বিনিময়ে সিরাজকে হত্যা করতে চেয়েছিল, তাহলে সেটি তাঁর কোন সক্ষমতার প্রমাণ?

বিশ্লেষণী ক্ষমতা?

যুক্তিবোধ?

সৃজনশীলতা?

সমস্যা সমাধানের দক্ষতা?

নাকি শুধু এটুকুই প্রমাণ করে যে পাঠ্যবইয়ের একটি নির্দিষ্ট তথ্য তিনি মনে রাখতে পেরেছেন?

এখান থেকেই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে।

প্রায় ১২ বছর একজন শিক্ষার্থীকে পড়ানোর পর আমরা আসলে তাঁকে কী শেখাতে চাইছি?

সমস্যা বাংলা সাহিত্য নয়, সমস্যা আমরা সাহিত্য দিয়ে কী করছি

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই।

বরং সাহিত্য এমন একটি জায়গা হতে পারত, যেখানে একজন শিক্ষার্থী মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝবেন, সমাজকে প্রশ্ন করবেন, ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করবেন, নিজের মত তৈরি করবেন এবং সেই মতের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাবেন।

লালসালু পড়ানো হোক।

কিন্তু একজন চরিত্র রাতে কী করতেন, সেটি মনে রাখার পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারত, ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করে কীভাবে সামাজিক ক্ষমতা তৈরি হয়?

মানুষ কেন সেই ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করে?

ভয়, অশিক্ষা এবং সামাজিক বাস্তবতা এখানে কী ভূমিকা রাখে?

আজকের সমাজের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি?

সিরাজউদ্দৌলা পড়ানো হোক।

কিন্তু মোহাম্মদ বেগ কত টাকা চেয়েছিল সেটি মুখস্থ করার চেয়ে একজন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারত, একটি রাষ্ট্রের ভেতরের বিশ্বাসঘাতকতা কীভাবে বাইরের শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করে?

ক্ষমতা, ব্যক্তিস্বার্থ এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের সম্পর্ক কী?

একটি চরিত্রের সিদ্ধান্তের সঙ্গে আপনি একমত কি না, এবং কেন?

তখন একই সাহিত্য পড়ানো হতো।

কিন্তু শিক্ষার্থী শুধু তথ্য মনে রাখতেন না।

তাঁকে চিন্তা করতে হতো।

অবশ্যই পুরো প্রশ্নপত্রকে মুখস্থনির্ভর বলা ঠিক হবে না। একই প্রশ্নপত্রে উদ্দীপকভিত্তিক কিছু প্রশ্ন আছে, যেখানে ভাব, মূল্যবোধ এবং পাঠ্যের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্নটা সেখানেই।

যদি আমরা বিশ্লেষণী প্রশ্ন করতে পারি, তাহলে ১৮ বছর বয়সী একজন শিক্ষার্থীর জাতীয় পরীক্ষার মূল্যবান নম্বর এখনো কেন এমন বিচ্ছিন্ন তথ্য মনে রাখার পেছনে ব্যয় করছি?

আমরা শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করতে নিষেধ করি, অথচ পরীক্ষায় মুখস্থ করার জন্যই নম্বর রাখি।

একজন শিক্ষার্থী যদি জানেন পরীক্ষায় তাঁকে জিজ্ঞেস করা হতে পারে কে কত টাকা চেয়েছিল, কে কোথায় ছিল, কে কী করেছিল, তাহলে তিনি এগুলো মুখস্থ করবেনই।

এটা শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা নয়।

এটা ব্যবস্থার তৈরি প্রণোদনা।

পরীক্ষা যে ধরনের জ্ঞানকে পুরস্কৃত করবে, শিক্ষার্থী সেই ধরনের জ্ঞান অর্জনেই সময় দেবেন।

আমরা পড়ি অনেক। কিন্তু শিখি কতটা?

বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী প্রায় ১২ বছর স্কুল ও কলেজে পড়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত আসেন।

বাংলা পড়েন।

ইংরেজি পড়েন।

গণিত পড়েন।

বিজ্ঞান পড়েন।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পড়েন।

হাজার হাজার পৃষ্ঠা শেষ করেন।

অসংখ্য পরীক্ষা দেন।

এসএসসি দেন।

এইচএসসি দেন।

জিপিএ পান।

সার্টিফিকেট পান।

কিন্তু ১৮ বছর বয়সে তাঁকে যদি খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করা হয়,

“আপনি আসলে কী করতে পারেন?”

উত্তরটা অনেক সময় পরিষ্কার থাকে না।

একটি শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য শুধু একজন শিক্ষার্থী কতগুলো অধ্যায় শেষ করেছেন, সেটি দিয়ে মাপা উচিত নয়।

১২ বছর শেষে তিনি কী করতে পারেন, সেটাও দেখতে হবে।

তিনি কি নিজের একটি মতামত যুক্তি দিয়ে দাঁড় করাতে পারেন?

কোনো তথ্য সত্য না মিথ্যা যাচাই করতে পারেন?

নিজে একটি ছোট গবেষণা করতে পারেন?

বাস্তব কোনো সমস্যা দেখে সমাধানের পথ ভাবতে পারেন?

একটি দলের সঙ্গে কাজ করতে পারেন?

নিজের বক্তব্য মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারেন?

প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিছু তৈরি করতে পারেন?

নিজের আগ্রহ এবং সক্ষমতা সম্পর্কে অন্তত কিছুটা ধারণা আছে?

নাকি তিনি মূলত শিখেছেন কীভাবে একটি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়?

এই পার্থক্যটাই গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষা আর পরীক্ষার প্রস্তুতি এক জিনিস নয়।

ইংরেজি শিখছি, নাকি ইংরেজি পরীক্ষার উত্তর শিখছি?

আমাদের ইংরেজি পরীক্ষায় ইমেইল লিখতে হয়।

চিঠি লিখতে হয়।

বিভিন্ন ধরনের লিখিত কাঠামো অনুশীলন করতে হয়।

ইমেইল শেখানো নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। বরং ২০২৬ সালে একজন শিক্ষার্থীর ভালো পেশাদার ইমেইল লিখতে পারা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি দক্ষতা।

কিন্তু বাস্তবে ইমেইল লেখা আর পরীক্ষার খাতায় ইমেইলের কাঠামো লেখা এক জিনিস নয়।

বাস্তবে আমাকে বুঝতে হবে আমি কাকে লিখছি, কেন লিখছি, সাবজেক্ট কী হবে, ভাষার ধরন কেমন হবে, কতটুকু সংক্ষিপ্ত হওয়া উচিত, কোনো নথি যুক্ত করলে সেটি কীভাবে উল্লেখ করব এবং কখন ফলোআপ করা উচিত।

একজন শিক্ষার্থীকে যদি বলা হতো,

ধরুন, আপনি একটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের জন্য আবেদন করবেন। একটি বাস্তব পেশাদার ইমেইল তৈরি করুন।

তিনি ইমেইলটি লিখতেন।

শিক্ষক মতামত দিতেন।

তিনি সংশোধন করতেন।

আবার লিখতেন।

একই বিষয় শেখানো হতো।

কিন্তু এবার পরীক্ষার জন্য একটি কাঠামো মনে রাখার বদলে একটি বাস্তব দক্ষতা তৈরি হতো।

আমাদের সমস্যাটা অনেক ক্ষেত্রে এখানেই।

আমরা সবসময় ভুল বিষয় পড়ছি না। আমরা অনেক প্রয়োজনীয় বিষয়ও এমনভাবে পড়ছি, যাতে পরীক্ষার পর তার ব্যবহারিক মূল্য খুব কম থেকে যায়।

আইসিটি পড়লাম। এখন প্রযুক্তি দিয়ে কী করতে পারি?

উচ্চমাধ্যমিকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ে এইচটিএমএল আছে। সি প্রোগ্রামিং আছে। ডেটাবেজের ধারণা আছে।

এসব শেখানো নিজে কোনো সমস্যা নয়।

প্রোগ্রামিং শেখা যৌক্তিক চিন্তা তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। এইচটিএমএল শেখা ওয়েব প্রযুক্তির ভিত্তি বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

কিন্তু আবারও একই প্রশ্ন।

শেখার ফলাফল কী?

একজন শিক্ষার্থী যদি এইচটিএমএলের ট্যাগ মনে রেখে পরীক্ষার খাতায় কোড লিখতে পারেন, কিন্তু বাস্তবে একটি সাধারণ ওয়েবপেজ তৈরি করতে না পারেন, তাহলে তিনি আসলে কতটা এইচটিএমএল শিখলেন?

সি প্রোগ্রামের আউটপুট বের করতে পারলেন, কিন্তু প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে একটি ছোট বাস্তব সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা হলো না, তাহলে আমরা কোন দক্ষতা তৈরি করলাম?

আর ২০২৬ সালের একজন ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর ডিজিটাল শিক্ষা কি শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত?

তিনি কি স্প্রেডশিট ব্যবহার করে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন?

একটি ভালো উপস্থাপনা তৈরি করতে পারেন?

অনলাইনে পাওয়া তথ্যের উৎস যাচাই করতে পারেন?

ফিশিং বা ডিজিটাল প্রতারণা শনাক্ত করতে পারেন?

নিজের ডিজিটাল গোপনীয়তা সম্পর্কে সচেতন?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে পারেন?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দেওয়া উত্তর ভুল হতে পারে, সেটা যাচাই করতে জানেন?

প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাস্তব কোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন?

আইসিটি শিক্ষার সাফল্য মাপার প্রশ্ন এগুলো হওয়া উচিত।

শুধু বইয়ের অধ্যায় শেষ হয়েছে কি না, সেটি নয়।

সমস্যাটা শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতার সমালোচনা নতুন কিছু নয়।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ নিয়ে শিক্ষা ও দক্ষতাবিষয়ক বিভিন্ন মূল্যায়নে উচ্চতর চিন্তনক্ষমতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং সফট স্কিল উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। উচ্চশিক্ষা নিয়ে তাদের একটি পর্যালোচনায় মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, শিক্ষার্থীর নিষ্ক্রিয়তা এবং লিখিত পরীক্ষার ওপর নির্ভরতার কারণে উচ্চতর চিন্তা ও সফট স্কিল বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সমস্যাও চিহ্নিত করা হয়েছে।

আরেকটি তথ্য আরও অস্বস্তিকর।

বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের একটি শিশু প্রায় ১১ বছর স্কুলে থাকার প্রত্যাশা করতে পারে। কিন্তু শিক্ষার মান বিবেচনায় সেই শেখা প্রায় সাড়ে ৬ বছরের সমতুল্য হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ বছরের শেখার ব্যবধান।

সময় যাচ্ছে।

শ্রেণি পরিবর্তন হচ্ছে।

পরীক্ষা হচ্ছে।

সার্টিফিকেট আসছে।

কিন্তু সেই সময়ের সমপরিমাণ শেখা হচ্ছে না।

তাহলে সমস্যাটা শুধু কারিকুলামের কয়েকটি অদ্ভুত প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়।

সমস্যাটা অনেক গভীরে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি ধীরে ধীরে পরীক্ষাব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে?

একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ছন্দটা লক্ষ্য করুন।

এক পরীক্ষা শেষ।

পরের পরীক্ষার প্রস্তুতি।

এসএসসি।

তারপর এইচএসসি।

তারপর ভর্তি পরীক্ষা।

এর মধ্যে মডেল টেস্ট।

কোচিং।

গাইড।

সাজেশন।

প্রশ্নব্যাংক।

কোন অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ?

কোন প্রশ্ন বেশি আসে?

কীভাবে কম পড়ে বেশি নম্বর পাওয়া যায়?

একসময় শিক্ষার্থীর কাছে একটি বার্তা খুব পরিষ্কার হয়ে যায়।

আপনি কতটা শিখেছেন, তার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ আপনার নম্বর।

তখন প্রশ্নটা আর থাকে না,

“বিষয়টা মজার, আরও জানতে চাই।”

প্রশ্নটা হয়ে যায়,

“এটা পরীক্ষায় আসবে?”

এই একটি বাক্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়।

এটার জন্য শিক্ষার্থীকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

মানুষ যে ব্যবস্থার মধ্যে থাকে, সেই ব্যবস্থার প্রণোদনা অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করে।

পরীক্ষা যদি মুখস্থকে পুরস্কৃত করে, শিক্ষার্থী মুখস্থ করবেন।

ভর্তি পরীক্ষা যদি নির্দিষ্ট ধরনের দ্রুত উত্তর দেওয়ার কৌশলকে পুরস্কৃত করে, শিক্ষার্থী সেই কৌশল শিখবেন।

ফলাফল যদি শিক্ষার প্রধান সামাজিক মাপকাঠি হয়, অভিভাবক ফলাফল চাইবেন।

সেখান থেকেই তৈরি হবে কোচিং, গাইড, সাজেশন এবং প্রশ্নব্যাংকের বিশাল সংস্কৃতি।

তাই শুধু শিক্ষার্থীদের বলা, “মুখস্থ করবেন না, বুঝে পড়ুন”, যথেষ্ট নয়।

পরীক্ষা না বদলালে পড়ার সংস্কৃতিও পুরোপুরি বদলাবে না।

একই বয়সের একজন আমেরিকান শিক্ষার্থীর জীবনটা একটু দেখি

এখানে যুক্তরাষ্ট্রকে আদর্শ বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই।

তাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও বড় সমস্যা আছে।

ধনী ও দরিদ্র এলাকার স্কুলের মধ্যে বৈষম্য আছে। সব শিক্ষার্থী একই সুযোগ পান না। স্ট্যান্ডার্ডাইজড পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক আছে। উচ্চশিক্ষার খরচও বড় সমস্যা।

কিন্তু তারপরও তাদের ব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত পার্থক্য আমাদের নিজেদের নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মতো পুরো দেশের জন্য একটিমাত্র জাতীয় দ্বাদশ শ্রেণির কারিকুলাম নেই।

শিক্ষা মূলত রাজ্য এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিচালিত হয়। রাজ্য, স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এবং বিদ্যালয় অনুযায়ী গ্র্যাজুয়েশনের শর্ত এবং বিষয় নির্বাচনের সুযোগে পার্থক্য থাকতে পারে।

একজন শিক্ষার্থী ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয় পড়বেন।

কিন্তু এর পাশাপাশি নিজের বিদ্যালয়ের সুযোগ অনুযায়ী বিভিন্ন ঐচ্ছিক বিষয় এবং শিক্ষাপথ বেছে নিতে পারেন।

কম্পিউটার বিজ্ঞান।

ব্যবসা।

প্রকৌশল।

স্বাস্থ্যবিজ্ঞান।

শিল্পকলা।

যোগাযোগ।

কারিগরি শিক্ষা।

ক্যারিয়ারভিত্তিক শিক্ষা।

পার্থক্যটা শুধু তারা কী পড়ছেন সেখানে নয়।

পার্থক্যটা তারা কতটা বেছে নিতে পারছেন সেখানেও।

মানুষ কি সত্যিই তিন ধরনের?

আমাদের দেশে একটি পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান, মানবিক অথবা ব্যবসায় শিক্ষার মতো ধারায় ভাগ করা হয়।

কিন্তু একজন মানুষের আগ্রহ কি সত্যিই তিনটি বাক্সে ভাগ করা যায়?

একজন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অর্থনীতি ভালোবাসতে পারেন।

একজন মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী প্রোগ্রামিংয়ে অসাধারণ হতে পারেন।

একজন ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী উচ্চতর গণিত পড়তে চাইতে পারেন।

কেউ একই সঙ্গে জীববিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞান ভালোবাসতে পারেন।

কেউ পদার্থবিজ্ঞান এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হতে পারেন।

বাস্তব পৃথিবী আন্তঃবিষয়ক।

মানুষও তাই।

একটি ন্যূনতম সাধারণ জ্ঞান অবশ্যই সবার দরকার। কিন্তু তারপর একজন শিক্ষার্থীর নিজের আগ্রহ অনুযায়ী গভীরে যাওয়ার স্বাধীনতাও থাকা দরকার।

সব শিক্ষার্থীকে একই জিনিস একই গভীরতায় শেখানোর প্রয়োজন নেই। কারণ সব শিক্ষার্থী একই মানুষ নন।

১৮ বছর বয়সটা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চবিদ্যালয় ব্যবস্থায় ক্যারিয়ার অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন বা সিটিই নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপথ রয়েছে।

এখানে শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার ও তথ্যবিজ্ঞান, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, যোগাযোগ, কৃষি, নির্মাণসহ বিভিন্ন বাস্তব পেশার সঙ্গে সম্পর্কিত শিক্ষা নিতে পারেন।

২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চবিদ্যালয় স্নাতকদের প্রায় ৮৫ শতাংশ অন্তত একটি সিটিই কোর্স নিয়েছিলেন।

কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংখ্যাটা নয়।

গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেকে আবিষ্কার করার সুযোগ।

একজন ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী স্কুলে থাকতেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন,

প্রোগ্রামিং আমার ভালো লাগে?

স্বাস্থ্যসেবা?

ব্যবসা?

প্রকৌশল?

কারিগরি কাজ?

তিনি ভুল পথও বেছে নিতে পারেন।

এক বছর পর বুঝতে পারেন, এটা তাঁর জন্য নয়।

সেটাও শিক্ষা।

কারণ ১৮ বছর বয়সে একজন মানুষের জীবনের সব উত্তর জানা থাকার কথা নয়।

তাঁর দরকার উত্তর খোঁজার সুযোগ।

এখন বাংলাদেশের একজন সাধারণ কলেজ শিক্ষার্থীর কথা ভাবুন।

তাঁর কলেজে কি নিয়মিত ক্যারিয়ার কাউন্সেলর আছেন?

কলেজ কি তাঁকে ইন্টার্নশিপ খুঁজতে সাহায্য করে?

কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাস্তবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে?

গবেষণায় যুক্ত করে?

নিজের আগ্রহ অনুযায়ী প্রকল্প করতে সাহায্য করে?

বিভিন্ন ক্যারিয়ার সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেয়?

নাকি মূল বার্তাটা প্রায় সবসময় একই?

সিলেবাস শেষ করুন।

পরীক্ষা দিন।

ভালো ফল করুন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

স্কুলে পড়েই কলেজের কোর্স

যুক্তরাষ্ট্রে ডুয়াল এনরোলমেন্ট নামে একটি ব্যবস্থাও রয়েছে।

এর মাধ্যমে যোগ্য উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থী কলেজ পর্যায়ের কোর্স নিতে পারেন এবং অনেক ক্ষেত্রে উচ্চবিদ্যালয়ে থাকতেই কলেজ ক্রেডিট অর্জন করতে পারেন।

এর পেছনের দর্শনটা গুরুত্বপূর্ণ।

একজন শিক্ষার্থী যদি প্রস্তুত থাকেন, শুধু তাঁর বয়স ১৭ বলে তাঁকে একই জায়গায় আটকে রাখা হচ্ছে না।

তিনি আরও এগিয়ে যেতে পারেন।

এখন বাংলাদেশের একজন এইচএসসি শিক্ষার্থীর কথা ভাবুন।

ধরুন, তিনি নিজের চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রোগ্রামিং শিখে ফেলেছেন।

আমাদের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা সেটিকে কীভাবে স্বীকৃতি দেবে?

তিনি যদি গবেষণা করতে চান?

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কোনো কোর্স করতে চান?

নিজের বয়সের নির্ধারিত পাঠ্যসূচির চেয়ে কোনো বিষয়ে অনেক এগিয়ে যেতে চান?

আমাদের ব্যবস্থা ব্যক্তিকে বোঝার চেয়ে ব্যাচকে বেশি সহজে বোঝে।

একই বছর।

একই বই।

একই পরীক্ষা।

একই সময়সীমা।

কিন্তু মানুষ একই গতিতে শেখে না।

১৮ বছর বয়সে একজন শিক্ষার্থী কী বানিয়েছেন?

একজন এইচএসসি শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করুন,

গত দুই বছরে আপনি কী করেছেন?

তিনি হয়তো ফলাফল দেখাবেন।

সার্টিফিকেট দেখাবেন।

এবার প্রশ্নটা একটু বদলে দিন।

আপনি কী বানিয়েছেন?

কোনো গবেষণা করেছেন?

কোনো ওয়েবসাইট?

অ্যাপ?

ছোট ব্যবসা?

সামাজিক উদ্যোগ?

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা?

দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প?

কোনো বাস্তব সমস্যার সমাধান?

কোনো বিষয়ে নিজের মৌলিক বিশ্লেষণ?

আর যদি করে থাকেন, সেটা করতে তাঁকে কে সাহায্য করেছে?

তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান?

নাকি ইউটিউব?

ইন্টারনেট?

বন্ধু?

নিজের চেষ্টা?

আজ বাংলাদেশের তরুণরা কোডিং শিখছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিখছেন।

ডিজাইন করছেন।

ব্যবসা করছেন।

ফ্রিল্যান্সিং করছেন।

কনটেন্ট তৈরি করছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন।

নিজেদের উদ্যোগে গবেষণা করছেন।

এটা প্রমাণ করে আমাদের তরুণদের মেধার অভাব নেই।

বরং এখান থেকেই আরও অস্বস্তিকর একটি প্রশ্ন আসে।

তাঁরা এত কিছু শিখছেন শিক্ষাব্যবস্থার কারণে, নাকি অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে গিয়ে?

আমরা জ্ঞান শেখাই, কিন্তু জ্ঞান ব্যবহার করতে শেখাই কতটা?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাকে শুধু “মুখস্থবিদ্যা” বললেও সম্ভবত পুরো সমস্যাটা ধরা যায় না।

সমস্যাটা আরও গভীর।

আমরা অনেক তথ্য শেখাই।

কিন্তু সেই তথ্য দিয়ে কী করতে হবে, সেটি শেখানোর জায়গা তুলনামূলকভাবে কম।

পদার্থবিজ্ঞান পড়ি।

কিন্তু বাস্তব কোনো সমস্যা নিয়ে নিজে পরীক্ষা নকশা করার সুযোগ কতবার পাই?

জীববিজ্ঞান পড়ি।

কিন্তু একটি গবেষণাপত্র কীভাবে পড়তে বা প্রশ্ন করতে হয়, সেটা কতটা শিখি?

গণিত পড়ি।

কিন্তু বাস্তব তথ্য নিয়ে কোনো মডেল তৈরি করি কতবার?

বাংলা পড়ি।

কিন্তু নিজের একটি জটিল যুক্তি প্রমাণসহ দাঁড় করাই কতবার?

ইংরেজি পড়ি।

কিন্তু বাস্তব জীবনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি কতটা?

আইসিটি পড়ি।

কিন্তু প্রযুক্তি দিয়ে কী তৈরি করেছি?

জ্ঞান থাকা আর জ্ঞান ব্যবহার করতে পারা এক জিনিস নয়।

আধুনিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি হওয়া উচিত এই দুইয়ের মধ্যে সেতু তৈরি করা।

যে উত্তর কয়েক সেকেন্ডে খুঁজে পাওয়া যায়, সেটি মুখস্থ করতে ঘণ্টা ব্যয় করছি কেন?

একসময় তথ্য পাওয়া কঠিন ছিল।

বই এবং শিক্ষক ছিলেন তথ্যের প্রধান উৎস।

এখন পৃথিবী বদলে গেছে।

পকেটের একটি ফোন কয়েক সেকেন্ডে বলে দিতে পারে মোহাম্মদ বেগ কত টাকা চেয়েছিল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক মুহূর্তে একটি বিষয় পাঁচভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।

এর মানে এই নয় যে কিছুই মনে রাখতে হবে না।

মৌলিক জ্ঞান ছাড়া গভীরভাবে চিন্তা করা সম্ভব নয়।

কিন্তু কোন জ্ঞান মাথায় থাকা জরুরি এবং কোন তথ্য প্রয়োজন হলে খুঁজে বের করতে জানা যথেষ্ট, এই পার্থক্যটা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের পৃথিবীতে একজন মানুষের সক্ষমতা শুধু তিনি কত তথ্য মনে রাখতে পারেন, সেখানে সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি কি সঠিক প্রশ্ন করতে পারেন?

তথ্যের উৎস যাচাই করতে পারেন?

দুটি বিপরীত দাবি বিশ্লেষণ করতে পারেন?

প্রমাণের দুর্বলতা ধরতে পারেন?

নতুন ধারণা তৈরি করতে পারেন?

সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

কিছু তৈরি করতে পারেন?

আর যা জানেন না, সেটি নিজে শিখে নিতে পারেন?

যদি আমাদের পরীক্ষা এখনো সবচেয়ে বেশি পুরস্কৃত করে সেই কাজকে, যেটি একটি সার্চ ইঞ্জিন কয়েক সেকেন্ডে করতে পারে, তাহলে আমাদের থেমে ভাবা দরকার।

তাহলে কি আমেরিকার শিক্ষা নকল করতে হবে?

না।

একেবারেই না।

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো স্বর্গ নয়।

সেখানে সুযোগের বৈষম্য আছে। সব বিদ্যালয়ের মান এক নয়। সব শিক্ষার্থী ভালো ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, ইন্টার্নশিপ, উন্নত কোর্স কিংবা ডুয়াল এনরোলমেন্টের সমান সুযোগ পান না। উচ্চশিক্ষার ব্যয়ও বড় সমস্যা।

বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রের কারিকুলাম কপি করার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু তাদের ব্যবস্থা থেকে কিছু নীতি শেখা যায়।

শিক্ষার্থীর পছন্দের সুযোগ।

একাধিক শিক্ষাপথ।

বাস্তব কাজের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ।

ক্যারিয়ার অনুসন্ধান।

ঐচ্ছিক বিষয়।

প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা।

শিক্ষার্থীভেদে আলাদা সক্ষমতার স্বীকৃতি।

বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মজগতের মধ্যে সংযোগ।

এগুলো কোনো একটি দেশের সম্পত্তি নয়।

এগুলো আধুনিক শিক্ষার মৌলিক ধারণা।

তাহলে আমাদের কী বদলানো দরকার?

প্রথম পরিবর্তন দরকার পরীক্ষায়।

শুধু নতুন বই ছাপিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা বদলানো যাবে না। পরীক্ষার ধরন একই থাকলে শিক্ষার্থীর পড়ার ধরনও খুব বেশি বদলাবে না।

বাংলায় সাহিত্য থাকবে।

অবশ্যই থাকবে।

কিন্তু কে কত টাকা চেয়েছিল তার চেয়ে কেন বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছিল, তার রাজনৈতিক ও মানবিক অর্থ কী, সেটি বিশ্লেষণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

ইংরেজিতে ইমেইল থাকবে।

কিন্তু পরীক্ষার খাতায় কাঠামো মনে রাখার পাশাপাশি বাস্তব যোগাযোগের দক্ষতা যাচাই করতে হবে।

আইসিটিতে প্রোগ্রামিং থাকবে।

কিন্তু কোড শুধু খাতায় নয়, কিছু তৈরি করতে ব্যবহার করতে হবে।

বিজ্ঞানে ব্যবহারিক থাকবে।

কিন্তু আগে থেকে জানা ফলাফল বের করার জন্য নির্দেশনা অনুসরণ করাই শেষ কথা হতে পারে না। শিক্ষার্থীকে নিজে প্রশ্ন করতে, পরীক্ষা পরিকল্পনা করতে এবং ফলাফল বিশ্লেষণ করতে দিতে হবে।

বিষয় নির্বাচনের স্বাধীনতাও বাড়াতে হবে।

একটি সাধারণ ভিত্তির পর শিক্ষার্থীদের নিজের আগ্রহ অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয় মেশানোর সুযোগ থাকা উচিত।

প্রকল্প, গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, ব্যবসায়িক উদ্যোগ, সামাজিক কাজ এবং কারিগরি অভিজ্ঞতাকে “পড়াশোনার বাইরের কাজ” হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে।

এগুলোও পড়াশোনা। এগুলোও শিক্ষা।

ক্যারিয়ার নির্দেশনাকেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ করতে হবে।

একজন ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী যেন অন্তত জানেন পৃথিবীতে তাঁর সামনে কী কী পথ আছে।

ডাক্তার।

প্রকৌশলী।

সরকারি চাকরি।

এই কয়েকটির বাইরেও পৃথিবী অনেক বড়।

সবশেষে, নম্বর নিয়ে আমাদের সামাজিক মোহটাও প্রশ্ন করতে হবে।

জিপিএ ৫ অবশ্যই একটি অর্জন।

কিন্তু একটি জিপিএ কখনো একজন মানুষের সম্পূর্ণ সক্ষমতার পরিচয় হতে পারে না।

সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়তো কোনো ফলাফলে দেখা যায় না

একজন ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী তরুণের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কী?

সময়।

কৌতূহল।

শক্তি।

ভুল করার স্বাধীনতা।

নতুন কিছু চেষ্টা করার সাহস।

এই বয়সে কেউ একটি অ্যাপ বানিয়ে ব্যর্থ হতে পারেন।

একটি ছোট ব্যবসা শুরু করে বন্ধ করে দিতে পারেন।

গবেষণা করতে গিয়ে ভুল করতে পারেন।

রোবট বানাতে পারেন।

একটি বই লিখতে পারেন।

কোনো সামাজিক সমস্যা নিয়ে কাজ করতে পারেন।

দশটি জিনিস চেষ্টা করে বুঝতে পারেন, কোনোটাই তাঁর জন্য নয়।

সেটাও শিক্ষা।

কিন্তু এই সময়ের বিশাল একটি অংশ যদি শুধু পরের পরীক্ষার সঠিক উত্তর মনে রাখার পেছনে চলে যায়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু একটি পুরোনো কারিকুলামের ক্ষতি নয়।

এর একটি অদৃশ্য মূল্য আছে।

হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা।

আমাদের তরুণদের মেধার অভাব নেই।

অভাব এমন একটি ব্যবস্থার, যেটি সেই মেধাকে শুধু নম্বরে রূপান্তর করতে চায় না।

কৌতূহলে রূপান্তর করে।

দক্ষতায় রূপান্তর করে।

সৃষ্টিতে রূপান্তর করে।

সমস্যা সমাধানের ক্ষমতায় রূপান্তর করে।

১২ বছর পড়াশোনার পর একজন শিক্ষার্থী যেন শুধু বলতে না পারেন,

“আমি জিপিএ ৫ পেয়েছি।”

তিনি যেন বলতে পারেন,

আমি চিন্তা করতে পারি। প্রশ্ন করতে পারি। প্রমাণ খুঁজতে পারি। ভুল তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারি। নিজের মতের পক্ষে যুক্তি দিতে পারি। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি। কিছু তৈরি করতে পারি। বাস্তব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে পারি।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,

আমি যা জানি না, সেটা কীভাবে শিখতে হয়, আমি জানি।

কারণ শিক্ষার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কোনো তিন ঘণ্টার বোর্ড পরীক্ষা নয়।

সেই পরীক্ষা শুরু হয় পরীক্ষার হল থেকে বের হওয়ার পর।

তাই প্রশ্নটা শুধু একজন শিক্ষার্থীকে করা উচিত নয়,

“আপনি ১২ বছরে কী শিখেছেন?”

একই প্রশ্ন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকেও করা উচিত,

“একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১২টি বছর নেওয়ার পর, আপনি তাঁকে আসলে কী হতে সাহায্য করেছেন?”

#বাংলাদেশের_শিক্ষাব্যবস্থা #মুখস্থনির্ভরতা #শিক্ষা_সংস্কার #মেধা_বিকাশ #বাংলাদেশ #শিক্ষার্থী #দক্ষতা_উন্নয়ন #ভবিষ্যৎ_প্রজন্ম
Tasbir Kabir

About the Author

Tasbir Kabir

Al Consultant

Al Consultant & Entrepreneur Website: www.tasbirkabir.site

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast