“The real divide may not be between those who have AI and those who do not. It may be between those who can think with it and those who only obey it.”
অর্থাৎ, ভবিষ্যতের আসল বিভাজন হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার কাছে আছে আর কার কাছে নেই, তা দিয়ে তৈরি হবে না। বিভাজন তৈরি হবে কে এটিকে সঙ্গে নিয়ে চিন্তা করতে পারে, আর কে শুধু এর দেওয়া উত্তর মেনে নেয়, সেই পার্থক্য থেকে।
ধরুন, বাংলাদেশের দুইজন আঠারো বছরের তরুণকে একই দিনে একই ফোন দেওয়া হলো। একই ইন্টারনেট সংযোগ। একই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ।
একজন ঢাকার একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছে। ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ, ছোটবেলা থেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তার পরিবারে এমন মানুষ আছে, যাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়, পেশা, ব্যবসা কিংবা বিদেশে পড়াশোনা নিয়ে পরামর্শ চাইতে পারে। কোনো তথ্য পেলে সে মোটামুটি বুঝতে পারে কোথায় সন্দেহ করতে হবে, কোথায় আরও খুঁজতে হবে।
অন্যজন এমন একটি পরিবার থেকে এসেছে, যেখানে সে হয়তো প্রথম প্রজন্মের কলেজ শিক্ষার্থী। তার পড়াশোনার ভিত্তি তুলনামূলক দুর্বল। কোন পেশায় কী সুযোগ আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে আবেদন করতে হয়, কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কী জিজ্ঞেস করলে নিজের জন্য সবচেয়ে উপকারী উত্তর পাওয়া সম্ভব, সেটিও সে পুরোপুরি জানে না।
এখন দুজনের হাতেই একই প্রযুক্তি।
তারা কি সত্যিই সমান হয়ে গেল?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের সময়ের সবচেয়ে আশাবাদী বিশ্বাসগুলোর একটি হলো, শক্তিশালী প্রযুক্তি যত বেশি মানুষের হাতে পৌঁছাবে, সুযোগের ব্যবধান তত কমবে।
কথাটি পুরোপুরি ভুল নয়।
কিন্তু অসম্পূর্ণ।
কারণ একটি যন্ত্র সবার হাতে তুলে দেওয়া যায়। সেই যন্ত্র দিয়ে কী করতে হবে, কোন প্রশ্ন করতে হবে, কোন উত্তর বিশ্বাস করতে হবে, কোন উত্তর প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং পাওয়া জ্ঞানকে কীভাবে নিজের জীবনে কাজে লাগাতে হবে, সেই বোধ সবার মধ্যে সমানভাবে তৈরি করা যায় না।
আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই পার্থক্যটাই হয়তো নতুন ধরনের বৈষম্যের জন্ম দেবে।
জ্ঞান সস্তা হচ্ছে, কিন্তু বিচারবুদ্ধি নয়
মানুষের ইতিহাসে জ্ঞান কখনোই পুরোপুরি সমানভাবে বিতরণ করা ছিল না।
একসময় বই ছিল দুর্লভ। পরে বই সহজলভ্য হলো, কিন্তু ভালো শিক্ষা সবার কাছে পৌঁছাল না। ইন্টারনেট এলো, পৃথিবীর বিপুল তথ্য আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এলো। তবু শুধু ইন্টারনেট থাকার কারণে সবাই সমান জ্ঞানী হয়ে যায়নি।
এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে।
আগে তথ্য খুঁজতে হতো। এখন প্রশ্ন করলেই উত্তর আসে।
আগে দশটি লেখা পড়ে একটি বিষয় বুঝতে হতো। এখন কয়েক মুহূর্তে তার সারাংশ পাওয়া যায়।
আগে কোনো কঠিন ধারণা না বুঝলে শিক্ষক, বই কিংবা অভিজ্ঞ কারও সাহায্য লাগত। এখন একই বিষয় দশ বছরের শিশুর ভাষায়ও বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব।
এটি নিঃসন্দেহে অসাধারণ একটি পরিবর্তন।
কিন্তু উত্তর পাওয়া সহজ হওয়া আর বুঝতে শেখা এক জিনিস নয়।
একজন মানুষ একটি ভুল উত্তর পড়ে সেটিকে ভুল হিসেবে চিনতে পারেন। আরেকজন একই উত্তরকে সত্য ধরে নিতে পারেন।
একজন একটি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে আরও পাঁচটি প্রশ্ন করতে পারেন। আরেকজন প্রথম উত্তরেই থেমে যেতে পারেন।
একজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিজের চিন্তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। নিজের যুক্তির দুর্বলতা খুঁজতে পারেন, বিপরীত মত জানতে পারেন, নতুন সম্ভাবনা পরীক্ষা করতে পারেন।
আরেকজন শুধু বলতে পারেন,
“আমার হয়ে উত্তরটা লিখে দাও।”
দুজনের কাছেই একই প্রযুক্তি।
কিন্তু একজনের হাতে সেটি চিন্তার বিস্তার ঘটাচ্ছে, অন্যজনের হাতে চিন্তার বিকল্প হয়ে উঠছে।
এখানেই ভবিষ্যতের একটি অস্বস্তিকর সত্য লুকিয়ে আছে।
জ্ঞান পাওয়ার খরচ কমে গেলে ভালো বিচারবুদ্ধির মূল্য বরং বেড়ে যেতে পারে।
কারণ যখন উত্তর দুর্লভ থাকে না, তখন কোন উত্তরটি গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাই হয়ে ওঠে আসল দক্ষতা।
একই প্রযুক্তি সবার ক্ষমতা সমানভাবে বাড়ায় না
আমরা প্রযুক্তিকে অনেক সময় গুণকের মতো ভাবি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনার কাজ দশগুণ দ্রুত করে দেবে।
আপনার শেখা সহজ করবে।
আপনার আয় বাড়াতে সাহায্য করবে।
আপনাকে আরও দক্ষ করে তুলবে।
কিন্তু একটি গুণকের সমস্যা আছে।
গুণ করার আগে আপনার কাছে কী আছে, ফলাফল তার ওপরও নির্ভর করে।
একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিপুল গবেষণাপত্র দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান না থাকা একজন মানুষ একই ব্যবস্থা ব্যবহার করে চিকিৎসক হয়ে যান না।
একজন দক্ষ আইনজীবী কয়েক ঘণ্টার গবেষণা অল্প সময়ে গুছিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু আইন না জানা একজন মানুষ একটি সুন্দরভাবে লেখা উত্তর পেলেই আইনের জটিলতা বুঝে ফেলেন না।
একজন অভিজ্ঞ প্রোগ্রামার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কয়েক দিনে এমন কিছু তৈরি করতে পারেন, যা আগে কয়েক সপ্তাহ লাগত। অন্যদিকে বিষয়টি না বোঝা কেউ একই প্রযুক্তি দিয়ে অনেক কিছু তৈরি করেও বুঝতে পারবেন না কোথায় ভুল আছে।
এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবসময় শূন্যকে একশ বানায় না।
অনেক সময় যার কাছে আগে থেকেই দশ আছে, তার দশকে একশ বানিয়ে দেয়।
অর্থাৎ নতুন প্রযুক্তি শুধু পিছিয়ে থাকা মানুষকে সামনে আনে না। কখনো কখনো যারা আগে থেকেই এগিয়ে আছে, তাদের আরও দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও দেয়।
সেখানেই সমতার একটি অদ্ভুত সমস্যা তৈরি হয়।
সবার হাতে একই জিনিস থাকলেও সবাই সেই জিনিস থেকে একই ক্ষমতা পায় না।
একটি গ্রামের শিক্ষার্থী আর ঢাকার শিক্ষার্থীর হাতে একই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ধরা যাক, একজন গ্রামের শিক্ষার্থী এবং একজন ঢাকার সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের শিক্ষার্থী একই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে।
প্রথম দেখায় মনে হবে ব্যবধান কমে গেছে।
গ্রামের শিক্ষার্থী এখন এমন অনেক বিষয় শিখতে পারছে, যার জন্য আগে ভালো শিক্ষক বা দামি কোচিং লাগত। সে কঠিন বিষয় সহজ ভাষায় বুঝতে পারছে। নিজের ভুল ধরতে পারছে। বিনা খরচে প্রায় ব্যক্তিগত শিক্ষকের মতো সাহায্য পাচ্ছে।
এটি সত্যিই বিশাল সুযোগ।
কিন্তু অন্য শিক্ষার্থীটিও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
পার্থক্য হলো, তার হয়তো আগে থেকেই ভালো শিক্ষার ভিত্তি আছে। সে জানে কীভাবে একটি বিষয় গভীরভাবে জানতে হয়। ইংরেজি জানার কারণে পৃথিবীর আরও বড় জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। পরিবার থেকে দিকনির্দেশনা পায়। ভালো কম্পিউটার আছে। অর্থের বিনিময়ে উন্নত সুবিধা ব্যবহার করতে পারে। নতুন কিছু পরীক্ষা করার জন্য তার হাতে সময়ও বেশি।
তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রথম শিক্ষার্থীকে দশ ধাপ এগিয়ে দিলেও দ্বিতীয়জনকে হয়তো পঞ্চাশ ধাপ এগিয়ে দিচ্ছে।
দুজনই এগোচ্ছে।
তবু ব্যবধান কমছে না।
কখনো হয়তো আরও বাড়ছে।
এ কারণেই শুধু প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারকে সমতা ভাবা বিপজ্জনক।
প্রবেশাধিকার আর সক্ষমতা এক জিনিস নয়।
দারিদ্র্য শুধু টাকার অভাব নয়, সময়ের অভাবও
এই আলোচনায় আমরা একটি বিষয় প্রায়ই ভুলে যাই।
নতুন প্রযুক্তি শেখার জন্য শুধু একটি ফোন আর ইন্টারনেট লাগে না।
সময় লাগে।
মানসিক অবকাশ লাগে।
ভুল করার সুযোগ লাগে।
পরীক্ষা করার স্বাধীনতা লাগে।
একজন তরুণ যদি পরিবারের আয়ের জন্য প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করেন, বাড়ি ফিরে তার কাছে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কয়েক ঘণ্টা পরীক্ষা করার সুযোগ নাও থাকতে পারে।
অন্যদিকে আরেকজন তরুণ একই সময়ে নতুন নতুন পদ্ধতি শিখছে, নিজের প্রকল্প তৈরি করছে, ব্যর্থ হচ্ছে, আবার চেষ্টা করছে।
দুই বছর পর পার্থক্যটি শুধু কে বেশি মেধাবী ছিল, তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
একজনের শেখার অবকাশ ছিল।
অন্যজনের ছিল না।
আমরা সাধারণত বৈষম্যকে টাকার ভাষায় বুঝি। কার আয় কত, কার সম্পদ কত, কার বাড়ি কোথায়।
কিন্তু ভবিষ্যতের বৈষম্য বোঝার জন্য হয়তো আরেকটি প্রশ্ন করতে হবে।
কার শেখার সময় আছে?
কার ভুল করার নিরাপত্তা আছে?
কার পরীক্ষা করার সুযোগ আছে?
কার কাছে এমন মানুষ আছে, যাকে জিজ্ঞেস করা যায়, “আমি কি ঠিক পথে যাচ্ছি?”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক বাধা কমাতে পারে।
কিন্তু মানুষের জীবনের সব অসমতা একটি কথোপকথনের বাক্স দিয়ে দূর করা যায় না।
ভাষাও একটি অদৃশ্য দেয়াল
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভাষার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলায় অনেক ভালোভাবে কথা বলতে পারে। এটি অবশ্যই বড় অগ্রগতি।
কিন্তু পৃথিবীর বিপুল গবেষণা, কারিগরি নথি, উচ্চমানের শিক্ষাসামগ্রী এবং বিশেষায়িত জ্ঞানের বড় অংশ এখনো ইংরেজিতে তৈরি হয়।
যে তরুণ ইংরেজি ভালো জানে, সে শুধু একটি ভাষা জানে না।
সে একটি বড় জ্ঞানজগতের দরজা খুলতে পারে।
যে জানে না, তার জন্য একই দরজা তুলনামূলক সরু।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনুবাদ করে এই ব্যবধান কিছুটা কমাতে পারে। কিন্তু ভাষা শুধু শব্দের অনুবাদ নয়।
একটি ধারণার পেছনের প্রেক্ষাপট বোঝা, সঠিক উৎস খুঁজে পাওয়া, বিভিন্ন মত তুলনা করা, মূল লেখা পড়ে সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা, এসব ক্ষেত্রেও ভাষা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ভবিষ্যতে এমনও হতে পারে, একই প্রযুক্তি ব্যবহার করেও একজন মানুষ পৃথিবীর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারে গভীরভাবে প্রবেশ করতে পারছেন, আরেকজন তার একটি সংক্ষিপ্ত অনুবাদিত সংস্করণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছেন।
এটিও বৈষম্য।
চোখে দেখা যায় না।
কিন্তু ফলাফল দেখা যায়।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যদি শুধু উত্তর শেখায়, সমস্যা আরও বাড়বে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত প্রযুক্তির অভাব নয়।
বরং আমরা কী ধরনের মানুষ তৈরি করছি, সেই প্রশ্ন।
আমাদের শিক্ষার বড় একটি অংশ এখনো সঠিক উত্তর মনে রাখার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
পরীক্ষায় কী আসবে?
কত নম্বরের উত্তর কত পৃষ্ঠা লিখতে হবে?
কোন সংজ্ঞাটি বইয়ের ভাষায় লিখলে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যাবে?
কিন্তু এমন একটি পৃথিবীতে, যেখানে যেকোনো সাধারণ প্রশ্নের সুন্দরভাবে লেখা উত্তর কয়েক মুহূর্তে পাওয়া যায়, সেখানে শুধু উত্তর মনে রাখার ক্ষমতার মূল্য স্বাভাবিকভাবেই বদলে যাবে।
তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে প্রশ্ন করার ক্ষমতা।
কেন?
কীভাবে?
এর প্রমাণ কী?
অন্যভাবে দেখলে কী হয়?
এই তথ্যটি ভুল হলে কী হবে?
কে লাভবান হচ্ছে?
কোন তথ্যটি এখানে অনুপস্থিত?
এই প্রশ্নগুলো একটি যন্ত্র মুখস্থ করিয়ে দিতে পারে না।
এগুলো চিন্তার অভ্যাস।
আর চিন্তার অভ্যাস তৈরি হয় শিক্ষা, পরিবার, পড়াশোনা, বিতর্ক, কৌতূহল এবং ভুল করার স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে।
যদি একজন শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই শুধু সঠিক উত্তর দেওয়ার জন্য পুরস্কৃত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তার হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিলেও সে হয়তো শুধু আরও দ্রুত সঠিক উত্তর চাইবে।
প্রশ্ন করবে না।
এটাই বিপদ।
ভবিষ্যতের সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষটির কাছে হয়তো বেশি তথ্য থাকবে না
একসময় যার কাছে বেশি বই ছিল, সে এগিয়ে ছিল।
তারপর যার কাছে কম্পিউটার ছিল।
তারপর যার কাছে দ্রুত ইন্টারনেট ছিল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে হয়তো এমন একটি সময় আসবে, যখন তথ্যের দিক থেকে আমরা প্রায় সবাই অস্বাভাবিকভাবে ধনী হয়ে যাব।
পকেটে থাকা একটি যন্ত্র পৃথিবীর ইতিহাস ব্যাখ্যা করবে।
গণিত শেখাবে।
চিঠি লিখবে।
ব্যবসার পরিকল্পনা করবে।
আইনের সাধারণ ধারণা দেবে।
নতুন ভাষা শেখাবে।
কঠিন বই বুঝিয়ে দেবে।
তখন তথ্য নিজেই আর সবচেয়ে বড় সুবিধা থাকবে না।
সুবিধা হবে তথ্যের সঙ্গে কী করতে হয় তা জানা।
একজন মানুষ হাজার উত্তর পেয়েও জীবনে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন।
আরেকজন একটি ভালো প্রশ্ন থেকে নিজের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
এ কারণেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হতে পারে বিচারবুদ্ধি।
কোন তথ্য গ্রহণ করব।
কোনটি সন্দেহ করব।
কোথায় থামব।
কোথায় আরও খুঁজব।
কখন যন্ত্রের কথা শুনব।
আর কখন বলব, না, এখানে সিদ্ধান্তটা আমাকে নিজেকেই নিতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈষম্য কমাতেও পারে
এতক্ষণ যা বলা হলো, তার অর্থ এই নয় যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু বৈষম্য বাড়াবে।
বরং ঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সমতাসৃষ্টিকারী প্রযুক্তি হতে পারে।
একজন শিক্ষার্থী, যার ভালো শিক্ষক নেই, সে ব্যক্তিগতভাবে বিষয় বুঝে নিতে পারে।
একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যার পরামর্শক রাখার সামর্থ্য নেই, সে ব্যবসার হিসাব বা পরিকল্পনা বুঝতে সাহায্য পেতে পারে।
একজন চাকরিপ্রার্থী নিজের জীবনবৃত্তান্ত উন্নত করতে পারে।
একজন কৃষক নিজের ভাষায় কোনো সমস্যার প্রাথমিক তথ্য জানতে পারে।
একজন নতুন উদ্যোক্তা অল্প খরচে এমন ধারণা পরীক্ষা করতে পারে, যার জন্য আগে অনেক টাকা লাগত।
একজন প্রতিবন্ধী মানুষ এমনভাবে প্রযুক্তির সাহায্য নিতে পারেন, যা তার স্বাধীনতা বাড়ায়।
সম্ভাবনাগুলো বাস্তব।
কিন্তু সম্ভাবনা নিজে থেকে ন্যায়বিচার তৈরি করে না।
বিদ্যুৎ সবার জীবন বদলেছে, কিন্তু সবাই একইভাবে শিল্পপতি হয়নি।
ইন্টারনেট সবার কাছে তথ্য এনেছে, কিন্তু সবাই একই অর্থনৈতিক সুবিধা পায়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও শুধু প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিলেই হবে না।
মানুষকে সেটি ব্যবহার করার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাও দিতে হবে।
সবাইকে একই যন্ত্র দেওয়া সমতা নয়
আমরা যদি সত্যিই চাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈষম্য কমাক, তাহলে শুধু কতজন মানুষ এটি ব্যবহার করছে সেই সংখ্যা গুনলে হবে না।
দেখতে হবে তারা কীভাবে ব্যবহার করছে।
বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে উত্তর বের করা শেখালে হবে না। শেখাতে হবে উত্তর যাচাই করা।
শুধু প্রশ্ন লেখা শেখালে হবে না। শেখাতে হবে ভালো প্রশ্ন আর খারাপ প্রশ্নের পার্থক্য।
শুধু তথ্য নেওয়া নয়। তথ্যের উৎস খুঁজে দেখা।
শুধু দ্রুত কাজ করা নয়। কখন ধীরে চিন্তা করা দরকার, সেটিও বোঝা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রযুক্তিকে এমনভাবে শেখাতে হবে যেন মানুষ নিজের ক্ষমতা হারিয়ে না ফেলে।
কারণ একটি সমাজে সবাই যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে, কিন্তু অল্প কিছু মানুষই সেটিকে সত্যিকার অর্থে বুঝে নিজের সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তাহলে আমরা প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক হব।
কিন্তু সমান হব না।
নতুন শ্রেণিবিভাগটি হয়তো চোখে দেখা যাবে না
ধনী মানুষকে অনেক সময় তার বাড়ি, গাড়ি, পোশাক দেখে বোঝা যায়।
চিন্তার বৈষম্য এত সহজে দেখা যায় না।
একই শ্রেণিকক্ষে দুইজন শিক্ষার্থী বসে থাকতে পারে।
দুজনের হাতেই একই ফোন।
দুজনই একই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে।
কিন্তু একজন প্রতিটি উত্তরকে শুরু হিসেবে দেখে।
অন্যজন শেষ হিসেবে।
একজন জিজ্ঞেস করে,
“এটা কেন সত্য?”
অন্যজন ভাবে,
“উত্তর পেয়ে গেছি।”
একজন যন্ত্রকে ব্যবহার করে নিজের চিন্তা প্রসারিত করতে।
অন্যজন নিজের চিন্তার দায়িত্ব যন্ত্রের হাতে তুলে দিতে শুরু করে।
পাঁচ বছর পর তাদের ব্যবধান হয়তো ফোনের দামে দেখা যাবে না।
দেখা যাবে সিদ্ধান্তে।
দক্ষতায়।
আয়ে।
আত্মবিশ্বাসে।
সুযোগ চিনতে পারার ক্ষমতায়।
নিজের জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে ভাবতে পারার ক্ষমতায়।
এটাই চিন্তার বৈষম্য।
এবং সম্ভবত এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, যে মানুষ এর ভেতরে পিছিয়ে পড়ছে, সে হয়তো বুঝতেই পারবে না যে ব্যবধানটি তৈরি হচ্ছে।
আমাদের সামনে আসল প্রশ্ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করি,
এটি কত মানুষের চাকরি নেবে?
কত নতুন কাজ তৈরি করবে?
কত দ্রুত আরও শক্তিশালী হবে?
এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য আরেকটি প্রশ্ন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রযুক্তি আমাদের বিদ্যমান বৈষম্যের সঙ্গে কী করবে?
একজন ভালো শিক্ষিত মানুষকে আরও শক্তিশালী করবে, কিন্তু দুর্বল শিক্ষার মানুষটিকে শুধু প্রস্তুত উত্তর দেবে?
ইংরেজি জানা মানুষকে পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডারের আরও গভীরে নিয়ে যাবে, আর বাকিদের অনুবাদের ওপর নির্ভরশীল রাখবে?
যাদের সময়, অর্থ এবং পরীক্ষা করার স্বাধীনতা আছে, তারা কি আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে?
নাকি আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পারব, যেখানে প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা করার ক্ষমতাও সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হবে?
উত্তর এখনো নির্ধারিত নয়।
এটাই আশার জায়গা।
“A tool can be made available to everyone. The ability to use it wisely cannot.”
অর্থাৎ, একটি যন্ত্র সবার হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেটিকে বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহার করার ক্ষমতা নিজে থেকে সবার মধ্যে পৌঁছে যায় না।
আগামী দিনের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষটি হয়তো সে হবে না, যার কাছে সবচেয়ে বেশি তথ্য আছে।
কারণ তথ্য ক্রমেই সবার নাগালের মধ্যে আসছে।
সুবিধাপ্রাপ্ত হবে সে, যে জানে কোন প্রশ্নটি করতে হবে। কোন উত্তরটি সন্দেহ করতে হবে। কখন আরও গভীরে যেতে হবে। কখন নিজের মত বদলাতে হবে। আর কখন যন্ত্রের দেওয়া সুন্দর উত্তরটির সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে,
আমি নিশ্চিত নই। আমাকে আরও ভাবতে হবে।
এতদিন আমরা বৈষম্য মেপেছি কে কত টাকা পায়, কার কত সম্পদ আছে, কে কোন বিদ্যালয়ে পড়ে, কার ঘরে কম্পিউটার আছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে হয়তো আরেকটি প্রশ্ন যোগ করতে হবে।
একই অসীম জ্ঞানের সামনে দাঁড়িয়ে, কে কতটা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে?
কারণ আগামী দিনের বৈষম্য শুধু কার কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আছে আর কার কাছে নেই, সেখানে তৈরি হবে না।
বৈষম্য তৈরি হতে পারে একই প্রযুক্তি হাতে নিয়েও কে প্রশ্ন করতে শেখে, আর কে শুধু উত্তর গ্রহণ করতে শেখে, সেই ব্যবধান থেকে।
About the Author
Tasbir Kabir
Al Consultant
Al Consultant & Entrepreneur Website: www.tasbirkabir.site
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন