Searching…

নারী ও শিশুর নিরাপত্তা প্রশ্নে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও দায়

Shahriar Khan Nafiz
396 5 মিনিট লাগতে পারে পড়তে
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা প্রশ্নে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও দায়

বাংলাদেশে সময়ের সাথে রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল হয়, রাজনৈতিক ভাষা বদলায়, উন্নয়ন ও শাসনের অগ্রাধিকারের কথাও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু কিছু মৌলিক প্রশ্ন প্রতিটি সময়েই একইভাবে ফিরে আসে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো- রাষ্ট্র কি নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সত্যিকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে? আইন আছে, শাস্তির বিধান আছে, তবুও বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রতিটি নতুন ঘটনার পর সমাজ আবারও একই আতঙ্ক, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে ফিরে যায়।

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ বিদ্যমান আইনি কাঠামো কাগজে-কলমে অত্যন্ত কঠোর। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার মতো অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত নির্ধারিত। রাষ্ট্রীয়ভাবে বলা হয়, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কোনো আপস নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকা এবং তার কার্যকর প্রয়োগ এক জিনিস নয়। বিচারব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা অনেক সময় এই কঠোর আইনকেও কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেয়।

প্রতিটি আলোচিত ঘটনার পর দেখা যায় দ্রুত মামলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারও হয়, কিন্তু এরপরই শুরু হয় অনিশ্চয়তার দীর্ঘ পথ। তদন্ত ধীরগতিতে এগোয়, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ঘাটতি দেখা দেয়, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সামাজিক ও মানসিক চাপ, যার কারণে অনেক ভুক্তভোগী শেষ পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারেন না। ভয়, লজ্জা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তা তাদের আদালতের পথ থেকে সরিয়ে নেয়।

এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয় বিচার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। তদন্ত সংস্থার সীমিত সক্ষমতা, মামলার অতিরিক্ত চাপ এবং কখনো কখনো পেশাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অনেক সাক্ষী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, ফলে আদালতে সঠিকভাবে সাক্ষ্য দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিচার প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

আরেকটি সংবেদনশীল বাস্তবতা হলো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা। যদিও রাষ্ট্রীয়ভাবে বলা হয় আইনের চোখে সবাই সমান, বাস্তবে অনেক সময় এই সমতার প্রয়োগ নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়। কোনো ঘটনায় যদি প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় জড়িত থাকে, তাহলে তদন্ত ও বিচার কতটা নিরপেক্ষ থাকে এই প্রশ্ন সমাজে আস্থা সংকট তৈরি করে। ন্যায়বিচার তখন শুধু আইন নয় বরং ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

এই পুরো ব্যবস্থার বাইরে সমাজ নিজেই একটি বড় ভূমিকা পালন করে। সমাজে ভুক্তভোগীকে সহানুভূতির পরিবর্তে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা এখনও বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে কেন ঘটল বা কীভাবে ঘটল এই প্রশ্নগুলো এমনভাবে তোলা হয়, যাতে ভুক্তভোগী নিজেই এক ধরনের বিচারের মুখোমুখি হয়ে যান। এই সংস্কৃতি শুধু ব্যক্তিকে আঘাত করে না বরং অনেককে ন্যায়বিচারের পথে আসতেই নিরুৎসাহিত করে। সামাজিক কলঙ্ক, পারিবারিক চাপ এবং আপসের সংস্কৃতি অনেক সময় অপরাধকে আড়াল করে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।

গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন কোনো ঘটনা সামনে আসে, তখন ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মানুষ প্রতিবাদ করে, ন্যায়বিচারের দাবি ওঠে, রাষ্ট্রও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আলোচনার তীব্রতা কমে যায়, নতুন ঘটনার ভিড়ে পুরোনো ঘটনা হারিয়ে যায়। ফলে বিচার প্রক্রিয়ার ওপর যে ধারাবাহিক সামাজিক চাপ থাকা দরকার, তা অনেক সময় তৈরি হয় না।

রাষ্ট্রীয়ভাবে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা ও এই নীতির বাস্তবতা নির্ভর করে এর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগের ওপর। গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে তদন্ত, বিচার এবং রায় কার্যকর হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যদি একই কঠোরতা এবং স্বচ্ছতা বজায় না থাকে, তবে এই নীতি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্যে পরিণত হয়। শুধু ঘোষণা বা প্রতিক্রিয়া দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না; ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় ফলাফলের মাধ্যমে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীর সংস্কার প্রয়োজন। তদন্ত ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ করতে হবে, ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয় ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

তবে শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামো নয়, সমাজকেও পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পরিবার পর্যন্ত নারীর প্রতি সম্মান, নিরাপত্তা এবং সমতার ধারণা গড়ে তুলতে হবে। ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে, কারণ এই সংস্কৃতি ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় নীরব বাধা। যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজ ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে না শিখবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আইন একা সবকিছু বদলাতে পারবে না।

সবশেষে বলা যায়, নারীর নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব এবং নৈতিক পরীক্ষা। প্রতিটি ভুক্তভোগীর আর্তনাদ রাষ্ট্রের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যায় ন্যায়বিচার কি সত্যিই নিশ্চিত হচ্ছে, নাকি তা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ? রাষ্ট্রের শক্তি তার আইন নয় বরং সেই আইনের প্রতি মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থা তখনই গড়ে ওঠে, যখন ন্যায়বিচার দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং বাস্তব হয়ে ওঠে।

লেখক: শাহরিয়ার খান নাফিজ।

শিক্ষার্থী: জনাব আলী সরকারি কলেজ।

Shahriar Khan Nafiz

About the Author

Shahriar Khan Nafiz

Writer & Activist

Hi, I'm Shahriar Khan Nafiz. I am an activist driven by a deep commitment to social change. Through my writing, I strive to highlight pressing social issues, raise awareness and inspire thoughtful change in society.

প্রোফাইল দেখুন

আলোচনায় অংশ নিন

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

সাইন ইন করুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast