মাদ্রাসা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমরা সাধারণত ধর্ম নিয়ে কথা বলি। কেউ ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন, কেউ মাদ্রাসা ব্যবস্থার সমালোচনা করেন। কিন্তু এই বিতর্কের ভেতরে একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই হারিয়ে যায়, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে বসবাসকারী শিশুদের জীবন নিয়ে আমরা আসলে কতটুকু ভাবি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় স্বীকার করতে হবে। বাংলাদেশের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের জন্য মাদ্রাসা কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি খাদ্য, আশ্রয়, তদারকি এবং সন্তানকে কোথাও নিরাপদে রাখার একটি উপায়। ফলে মাদ্রাসার প্রশ্নটি শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে নয়; এটি দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তা, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও।
বাংলাদেশের নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর বাস্তবতা অনেক সময় মধ্যবিত্ত কল্পনার চেয়ে অনেক কঠিন। একজন রিকশাচালক ভোরে বের হয়ে রাতে ফেরেন। একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার আগেই। একজন দিনমজুর জানেন না পরদিন কাজ পাবেন কি না। এই মানুষগুলো সন্তানকে ভালোবাসেন না, এমনটা নয়। বরং অনেক সময় তাদের ভালোবাসাই সবচেয়ে করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। কারণ তারা সন্তানকে সময় দিতে পারেন না, পর্যাপ্ত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন না, সারাদিন দেখাশোনার ব্যবস্থাও করতে পারেন না। ফলে যখন কোনো প্রতিষ্ঠান বলে, “খাওয়া থাকবে, থাকা থাকবে, পড়াশোনা হবে”, তখন সেটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব নয়; সেটি একটি ফুল প্যাকেজ তথা সব সমস্যার সমাধানের প্রস্তাব।
এই বাস্তবতাকে বোঝা জরুরি। কারণ অনেক শিশু মাদ্রাসায় যায় ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে, কিন্তু বিপুল সংখ্যক শিশু সেখানে যায় অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেও। তাদের পরিবারের সামনে বাস্তব বিকল্প খুব সীমিত।
এই জায়গাতেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে। আমরা কি শিশুদের শিক্ষার জন্য মাদ্রাসায় পাঠাই, নাকি আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলোর ভার বহনের জন্য?
বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর, মফস্বল এবং গ্রামে হাঁটলে একটি পরিচিত দৃশ্য দেখা যায়। ছোট ছোট শিশু দল বেঁধে বাজারে, বাসস্ট্যান্ডে বা দোকানে দোকানে গিয়ে অনুদান সংগ্রহ করছে। কোথাও মাইকে ঘোষণা হচ্ছে মাদ্রাসার জন্য সাহায্যের আবেদন। কোথাও শিশুরা মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ চাইছে। অনেকেই এটিকে স্বাভাবিক দৃশ্য হিসেবে দেখেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে প্রশ্ন জাগে, কেন একটি শিশুর শৈশবের অংশ হয়ে উঠছে প্রতিষ্ঠানের অর্থসংগ্রহ? কেন এত অল্প বয়সে তাকে প্রাপ্তবয়স্কদের অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ঢুকে পড়তে হচ্ছে?
আবার অনেক আবাসিক প্রতিষ্ঠানে এমন শিশুও আছে, যারা বছরের বড় একটি অংশ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কাটায়। ঈদে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ সবার হয় না। অসুস্থ হলে মা পাশে থাকেন না। গভীর রাতে ভয় পেলে বাবার কাঁধে মাথা রাখার সুযোগ নেই। এগুলো শুধু আবেগের বিষয় নয়; এগুলো শিশুর মানসিক বিকাশের প্রশ্ন। একটি শিশুর শৈশব কেবল খাবার ও আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার নিরাপত্তা, স্নেহ, ব্যক্তিগত যত্ন এবং আবেগগত সম্পর্কও তার বেড়ে ওঠার মৌলিক উপাদান।
এই বাস্তবতার মধ্যেই আরেকটি বড় প্রশ্ন জাগে, জবাবদিহিতার প্রশ্ন।
বাংলাদেশে বহু কওমি মাদ্রাসা স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এবং তাদের অনেকেই নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন অসংখ্য প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যাদের সম্পর্কে রাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। সেখানে কতজন শিশু আছে, তাদের পারিবারিক অবস্থা কী, তাদের স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে নিশ্চিত হয়, তারা নির্যাতনের শিকার হলে অভিযোগ কোথায় করবে। এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর অনেক সময় পাওয়া যায় না।
সমস্যাটি এখানেই।
কোনো সমাজে যখন শিশুদের নিয়ে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠান জনসম্মুখের পর্যবেক্ষণ, স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত জবাবদিহিতার বাইরে অবস্থান করে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কী ঘটছে তা জানা কঠিন হয়ে যায়। আর যেখানে শিশুদের জীবন অদৃশ্য হয়ে যায়, সেখানে নির্যাতন, শোষণ এবং অবহেলার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
প্রতিবার কোনো নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশিত হলে আমরা সাধারণত একজন অপরাধীকে খুঁজি। অবশ্যই অপরাধীর বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু ব্যক্তিকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। প্রশ্ন হলো, কেন একটি শিশু দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও কেউ জানতে পারল না? কেন অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা ছিল না? কেন নিয়মিত স্বাধীন পরিদর্শন ছিল না? কেন শিশুটির জীবনের ওপর বাইরের কোনো নজরদারি ছিল না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা একটি কাঠামোগত বাস্তবতার মুখোমুখি হই। যেখানে দারিদ্র্য পরিবারকে অসহায় করে, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব পরিবারকে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করে, আর জবাবদিহিতার অভাব শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
এই কারণে মাদ্রাসার প্রশ্নকে শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রশ্ন হিসেবে দেখা ভুল হবে। সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে শিশু। বিশেষ করে দরিদ্র শিশু। কারণ ইতিহাসের একটি নির্মম সত্য হলো সমাজের সবচেয়ে কম দৃশ্যমান মানুষরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
ধনী পরিবারের সন্তান হারিয়ে গেলে সংবাদ হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সমস্যায় পড়লে সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। কিন্তু হাজার হাজার দরিদ্র শিশুর জীবন এমনভাবে কেটে যায়, যেন তাদের খোঁজ রাখার মতো কেউ নেই। তাদের অস্তিত্ব সমাজের প্রান্তে, পরিসংখ্যানের ভেতরে, প্রতিষ্ঠানের দেয়ালের আড়ালে হারিয়ে যায়।
তাই সমাধান কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঘৃণা করার মধ্যে নেই, কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নাতীত মর্যাদা দেওয়ার মধ্যেও নেই। সমাধান হলো শিশুদের দৃশ্যমান করে তোলা। শিশুদের নিয়ে কাজ করা সব আবাসিক প্রতিষ্ঠানের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, নিয়মিত স্বাধীন পরিদর্শন, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং জনসম্মুখে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য এমন সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক চাপে সন্তানকে কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতে বাধ্য না হয়।
শেষ পর্যন্ত মাদ্রাসা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিকও নয়; এটি গভীরভাবে মানবিক। একটি সমাজ তার শিশুদের কীভাবে দেখে? মানুষ হিসেবে, নাকি একটি দায়িত্ব হিসেবে? আমরা কি তাদের শিক্ষা দিতে চাই, নাকি শুধু কোথাও রেখে নিশ্চিন্ত হতে চাই?
কারণ একটি শিশুর হাতে কোরআন, বই বা খাতা তুলে দেওয়ার আগেও আমাদের একটি দায়িত্ব আছে। সেই দায়িত্ব হলো তাকে দৃশ্যমান রাখা, নিরাপদ রাখা এবং তাকে মনে করিয়ে দেওয়া যে সে কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়, কোনো পরিসংখ্যান নয়, কোনো দানের বাক্সের মুখ নয়। সে একজন মানুষ। এবং তার শৈশবের মূল্য কোনো সমাজের সুবিধার চেয়ে বড়।
তাই আজ প্রশ্নটি মাদ্রাসার পক্ষে না বিপক্ষে, ধর্মীয় শিক্ষার পক্ষে না বিপক্ষে, সেটি নয়। প্রশ্নটি আরও মৌলিক।
বাংলাদেশে এমন কোনো শিশু থাকা উচিত কি, যার অবস্থান, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য কিংবা দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে সমাজের কোনো নির্ভরযোগ্য ধারণা নেই?
এমন কোনো প্রতিষ্ঠান থাকা উচিত কি, যেখানে শত শত শিশু বাস করছে, অথচ তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা নেই?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের দাবি খুবই সাধারণ।
শিশুদের নিয়ে কাজ করা সব আবাসিক প্রতিষ্ঠানের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন চাই। নিয়মিত ও স্বাধীন পরিদর্শন চাই। শিশু নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের স্বচ্ছ ব্যবস্থা চাই। প্রতিটি শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করার সামাজিক অঙ্গীকার চাই।
আর সবচেয়ে বড় কথা, এমন একটি সমাজ চাই যেখানে দরিদ্র বাবা-মাকে দারিদ্র্যের কারণে সন্তানকে কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হতে না হয়।
কারণ কোনো শিশু জন্মগতভাবে মাদ্রাসার, স্কুলের কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়।
সে প্রথমত একটি মানুষ।
আর একটি সভ্য সমাজের কাজ হলো তার শিশুদের কোথাও জমা রাখা নয়, তাদের নিরাপদে বড় হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা।
About the Author
Talha Mohammad Chowdhury
Reader, writer, and observer. Interested in politics, history, economics, satire, and the contradictions of modern society. Here to learn, question, and contribute to meaningful discussions.
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন (1)
চমৎকার বিশ্লেণধর্মী লেখনী কমরেড।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন