সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

ইরান ওয়ার্ল্ড কাপ বয়কট করে নাই কারণ...

ইরান আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ খেলে প্রমাণ করেছে যে চরম বৈরিতার মধ্যেও টিকে থাকাটাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিবাদ। অথচ বাংলাদেশ সস্তা আবেগের বশে আইপিএল বিতর্কের জেরে বিশ্বকাপ বয়কট করে নিজেদের সেরা খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার ধ্বংস করেছে।

mustafa kemal atarturk
পড়তে 6 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 61 বার পড়েছে
ইরান ওয়ার্ল্ড কাপ বয়কট করে নাই কারণ...

সেখানে একজন আসিফ নজরুল ছিলেন না, আমিনুল ইসলাম বুলবুল ছিলেন না! পুরো বিশ্বজুড়ে এখন ফুটবলের উন্মাদনা। যে সব দেশ মাঠে লড়ছে আর যারা কোয়ালিফাই করতে পারেনি উত্তেজনা সবখানেই সমান ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এই সবকিছুর ভিড়ে এবার আলাদা করে পৃথিবীর নজর কেড়ে নিয়েছে একটি দেশ। ইরান।

একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক। আমেরিকা ইরানে বোমা মেরেছে। সেই একই আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে ইরান এখন বিশ্বকাপ খেলছে। যে দেশ তোমার শহরে মিসাইল ছুড়েছে, তোমার পারমাণবিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে, তোমার সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করেছে সেই দেশের মাটিতে তুমি বুক ফুলিয়ে, জার্সি গায়ে মাঠে নামছ। এটাকে যারা 'দুর্বলতা' ভাবছেন, তারা বোকার স্বর্গে আছেন। এটা দুর্বলতা না, এটা হলো চরম বৈরিতার মধ্যে টিকে থাকার লড়াই।

আমেরিকা অবশ্য ইরানকে আটকানোর জন্য কোনো নোংরামি বাকি রাখেনি। ইরানি সমর্থকদের ভিসা দেয়নি, শেষ মুহূর্তে ফ্যানদের টিকিট বাতিল করেছে, ফুটবল ফেডারেশনের বড় কর্তাদের ড্র অনুষ্ঠানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি এবং সাপোর্ট স্টাফদের একটা বড় অংশ ভিসাই পায়নি। এমনকি মূল খেলোয়াড়দের ভিসা দেওয়া হয়েছে প্রথম ম্যাচ শুরুর মাত্র দশ দিন আগে। স্বয়ং ট্রাম্প পর্যন্ত টিপ্পনী কেটে বলেছিলেন নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানের এখানে না আসাই ভালো ছিল। এত অপমান আর বাধা সত্ত্বেও ইরান খেলতে গেছে, কারণ আবেগ সরিয়ে রেখে একটু ঠান্ডা মাথায় হিসাব করলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে।

ইরানের অর্থনীতি এখন আইসিইউতে। দশকের পর দশক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা তেল বিক্রি করতে পারছে না ঠিকমতো, ইরানি রিয়াল এখন প্রায় মূল্যহীন এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনও বন্ধ। এই অবস্থায় বিশ্বকাপে শুধু গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও ইরান ফিকার কাছ থেকে সরাসরি পাবে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশী টাকায় যা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। এই টাকা আসবে আমেরিকার চোখ রাঙানি এড়িয়ে, একদম সরাসরি ফিফার তহবিল থেকে। এই সুযোগ ইরান কেন হাতছাড়া করবে? এর বাইরে আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে মাঠে নামাটাই ইরানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিবাদ। বিশ্বের কোটি কোটি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে জার্সি গায়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়াটাই হলো ওদের স্লোগান যে, আমরা এখনও হারিনি, আমরা আছি। ওদের কাছে সস্তা অহংকারের চেয়ে টিকে থাকাটা আগে।

ঠিক এই জায়গাটাতেই ইরান ও বাংলাদেশের বড় পার্থক্য। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় তরুণ আন্দোলনকর্মী শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর উত্তেজিত জনতা ভারতীয় হাই কমিশনে চড়াও হয়। মানুষের রাগ হয়তো যৌক্তিক ছিল, কিন্তু কূটনৈতিক মিশনে হামলা আন্তর্জাতিক আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং গুরুতর অপরাধ। এই একটা ভুল চাল ভারতকে একটা মস্ত বড় আন্তর্জাতিক অজুহাত এনে দিল। এর পরপরই বিসিসিআই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দিল মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল দল থেকে রিলিজ করে দিতে। ৯ কোটি ২০ লাখ রুপির মুস্তাফিজকে হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ায় আমাদের ভুয়া জাতীয়তাবাদীদের গায়ে যেন আগুন ধরে গেল।

ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তৎক্ষণাৎ মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করতে হুঙ্কার ছাড়লেন যে, দাসত্বের দিন শেষ। বিসিবিকে নির্দেশ দেওয়া হলো আইসিসির কাছে কড়া চিঠি পাঠাতে যেন ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ না খেলে ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরানো হয়। আইসিসি বারবার না বলা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আলটিমেটাম দিয়ে নিজের দাবিতে অনড় রইল। এই হাই ভোল্টেজ ড্রামার নেপথ্যে চলছিল আরেকটা নোংরা খেলা। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি হঠাৎ বাংলাদেশের পরম বন্ধু সেজে পাশে এসে দাঁড়ালেন। আইসিসির সভায় একমাত্র পাকিস্তানই বাংলাদেশের দাবির পক্ষে ভোট দিল। আমাদের দেশের আবেগপ্রবণ মানুষ পুরোপুরি গলে গেল , ভাবল বিপদের দিনে মুসলিম ভাই পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

এরপর বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল লাহোরে গিয়ে মহসিন নাকভির সাথে কোলাকুলি করলেন। দেশে ফিরে গদগদ হয়ে বললেন, পাকিস্তানের সাথে আমাদের ভ্রাতৃত্ব চিরকাল টিকুক। শুধু তাই নয়, তিনি পাকিস্তানকে অনুরোধ করে এলেন যেন তারা ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটা খেলে। নিজে মাঠে না থেকে, নিজের দলকে কোরবানি দিয়ে অন্যকে খেলার পরামর্শ দিচ্ছেন দেশের ক্রিকেট প্রধান। এর চেয়ে করুণ আর লজ্জাজনক দৃশ্য আর কী হতে পারে ? বাংলাদেশ নিজের জেদের কারণে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে গেল। লিটন দাস, মুস্তাফিজ বা নাজমুল শান্তর মতো এই প্রজন্মের সেরা খেলোয়াড়রা তাদের জীবনের সেরা ফর্ম এবং শেষ বিশ্বকাপটা মিস করে ঘরে বসে রইলেন। আমাদের জায়গায় বিশ্বকাপে খেলে দিল স্কটল্যান্ড।

পরবর্তীতে প্রাক্তন এসিসি সিইও সৈয়দ আশরাফুল হক পুরো রহস্যটা উন্মোচন করে বললেন, মহসিন নাকভি আসলে বুলবুলকে খুব সহজেই প্রভাবিত করেছিলেন। বুলবুল আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা কূটনীতির 'ক' ও বোঝেন না। স্রেফ সরকারকে খুশি করতে গিয়ে তিনি দেশের একঝাঁক ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার আর বিশ্বকাপকে বিসর্জন দিলেন। আর আসিফ নজরুল প্রথমে বললেন এটা সরকারের সিদ্ধান্ত, পরে পিঠ বাঁচাতে বললেন এটা বিসিবি আর খেলোয়াড়দের যৌথ সিদ্ধান্ত। দায় এড়ানোর এই নোংরা খেলায় ক্ষতি যা হওয়ার, তা হলো ওই নিরপরাধ খেলোয়াড়দের, যাদের কোনো হাতই ছিল না এই নোংরা রাজনীতিতে।

বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান কখনো বাংলাদেশের জন্য লড়েনি। তারা চেয়েছিল ভারতকে একটা আন্তর্জাতিক ধাক্কা দিতে আর সেই ধাক্কা দেওয়ার বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করেছে আবেগে অন্ধ বাংলাদেশকে। যখন শ্রীলঙ্কা এসে বলল, এসো আমরা খেলি, পাকিস্তান টুপ করে খেলতে চলে গেল। বাংলাদেশের কথা তাদের মনেও রইল না। ইরান যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে, শত অপমান মুখ বুজে সহ্য করে আমেরিকার মাঠে নেমেছে। কারণ ইরান জানে টিকে থাকাটাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ।

আর বাংলাদেশ একটি ঘরোয়া আইপিএল বিতর্কের জেরে, সস্তা আবেগের বশে পুরো বিশ্বকাপটাই বয়কট করে বসে রইল। কারণ আমাদের এখানে একজন আসিফ নজরুল ছিলেন, যিনি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে আগুন ছড়িয়ে মানুষকে বোকা বানাতে পারেন। আমাদের একজন আমিনুল ইসলাম বুলবুল ছিলেন, যিনি লাহোরে গিয়েও ফাঁদটা ধরতেই পারলেন না। ইরান আজ বিশ্বমঞ্চে লড়ছে, কারণ ওদের কোনো আসিফ নজরুল কিংবা বুলবুল ছিল না।

Ex-BCB official unveils how Bangladesh cricket chief fell into Mohsin Naqvi’s trap over T20 World Cup withdrawal-Cricket Times

photocard courtesy : Bdsportstime

#ইরান_বিশ্বকাপ_বয়কট #বাংলাদেশ_ক্রিকেট #বিশ্বকাপ_ক্রিকেট #আসিফ_নজরুল #আমিনুল_ইসলাম_বুলবুল #মহসিন_নাকভি #ক্রিকেট_রাজনীতি #আন্তর্জাতিক_ক্রিকেট
mustafa kemal atarturk

About the Author

mustafa kemal atarturk

Financial analyst

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast