সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

মুসলমানের সন্তানের নাম জিকো কীভাবে হতে পারে?

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কিংবদন্তি জিকোর নামে মিশরের এক মুসলিম তরুণের নাম রাখা ফুটবলীয় ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে অনুপ্রেরণা ও আবেগের কোনো ভৌগোলিক বা ধর্মীয় সীমানা নেই। অথচ মিশরের মতো রক্ষণশীল দেশেও যেখানে ফুটবল নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, সেখানে বাংলাদেশে একে ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।

mustafa kemal atarturk
পড়তে 5 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 107 বার পড়েছে
মুসলমানের সন্তানের নাম জিকো কীভাবে হতে পারে?

ছোটো মামার মুখে একটা নাম প্রায়ই শুনতাম, জিকো। তখন বুঝতাম না এটা কে, শুধু জানতাম এই মানুষটা নাকি ফুটবল মাঠে জাদু দেখাতেন। পরে জেনেছি তার আসল নাম আর্থার আন্তুনেস কোয়েইমব্রা। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ছেলেটা ছোটবেলায় ছিলেন রোগাপাতলা, তাই বাড়িতে আদর করে ডাকা হতো আর্থারজিনহো, তারপর সেটা হতে হতে আর্থারজিকো, তারপর তুজিকো, শেষে দাঁড়ায় জিকো। এই নামটাই পরে সারা পৃথিবী চিনেছে। ফ্লামেঙ্গো ক্লাবের হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্লেমেকার, ফ্রি কিকের জাদুকর, যাকে বলা হতো সাদা পেলে। ১৯৮২ বিশ্বকাপে সক্রেটিসের সাথে তার সেই জোগো বনিতো জুটি আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলোর একটা, যদিও তারা কখনো শিরোপা জেতেননি।

আমাদের প্রজন্মের অনেকে হয়তো আসল জিকোকে চেনেনই না। নামটা শুনেছেন, কিন্তু সেই মানুষটার খেলা দেখার সুযোগ হয়নি। আমিও দেখিনি সরাসরি টিভিতে , শুধু মামার কাছে শুনেছিলাম কীভাবে সেই সময়টায় জিকো মানে ছিল ফুটবলের অন্যরকম একটা সৌন্দর্য।

এবার ঘটল একটা আশ্চর্য ব্যাপার। আর্জেন্টিনা আর মিশরের খেলা দেখতে বসেছিলাম, হঠাৎ চোখ আটকে গেল। মাঠে একজন দুর্বার গতিতে দৌড়ে যাচ্ছে, বল জালে জড়িয়ে দিল আর্জেন্টিনার। স্কোরবোর্ডে নাম ভেসে উঠল, জিকো। প্রথমে একটু চমকে গেলাম। চল্লিশ বছর পর আবার সেই নামটা মাঠে, আবার সেই উন্মাদনা। মনে হলো যেন সময়টা একটা চক্রে ঘুরে এলো।

জিকো আসলে মিশরের ছেলে, নাম মোস্তফা মোহাম্মদ যাকি আব্দেলরাউফ। তার চাচা ব্রাজিলের সেই আসল জিকোর ভীষণ ভক্ত ছিলেন। ভাতিজার নাম যখন লম্বা মনে হলো, চাচা আদর করে ডাকতে শুরু করলেন জিকো বলে। সেই ডাকনামটাই আজ পুরো বিশ্ব চেনে। ফুটবল যে কীভাবে দেশের সীমানা ভেঙে ফেলে, এটা তার একটা জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। একজন ব্রাজিলিয়ান খ্রিস্টান ছেলের খেলা দেখে হাজার হাজার মাইল দূরে মিশরের এক মুসলিম পরিবার এতটাই মুগ্ধ হলো যে নিজের সন্তানের নামই রেখে দিল তার নামে। ধর্ম, দেশ, ভাষা কোনো কিছুই বাধা হলো না।

প্রতিটা প্রজন্মের একটা আইকন থাকে। মোস্তফার পরিবারের কাছে সেই আইকন ছিলেন জিকো। একটা মানুষের খেলা দেখে অন্য একটা মানুষের মনে যে অনুপ্রেরণা জন্মায়, সেটা কখনোই হঠাত করে হয় না। এটা তৈরি হয় বছরের পর বছর সেই আইকনের প্রতি ভালোবাসা জমতে জমতে। আর সেই ভালোবাসা একদিন একটা নামের মধ্য দিয়ে পরের প্রজন্মে বয়ে যায়। মোস্তফার বেলায় তাই হয়েছে। নাম হয়তো একটা বীজ বপন করেছিল, কিন্তু সেই বীজকে বড় করেছে তার নিজের পরিশ্রম, তার ভাইয়ের আত্মত্যাগ। বাবা হারানোর পর তার বড় ভাই নিজের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে দিয়ে পারিবারিক দোকান সামলেছেন, যাতে ছোট ভাই খেলে যেতে পারে। সেই ত্যাগের প্রতিদান আজ মোস্তফা দিচ্ছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করে।

এবার আসি আমাদের দেশের কথায়। মিশরের কথা যদি ধরি, সেই দেশে ইসলামের সবচেয়ে পুরনো ও সম্মানিত প্রতিষ্ঠান আল আজহার অবস্থিত। হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এই প্রতিষ্ঠান সুন্নি ইসলামী চিন্তাধারার একটা বড় কেন্দ্র। অথচ সেই দেশেই ফুটবল নিয়ে কোনো ধর্মীয় আপত্তি দেখা যায় না। মানুষ উৎসব করে, নিজের সন্তানের নাম প্রিয় খেলোয়াড়ের নামে রাখে, রাস্তায় নেমে উল্লাস করে।

এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনা গুলো অবাক লাগে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে যখন সারাদেশে মানুষ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের পতাকা নিয়ে উৎসব করছিল, তখন একজন কট্টরপন্থী ধর্মীয় বক্তা মুফতি হারুন ইজহার (লালখান বাজার ) একটা বক্তৃতায় বলেন যে এই সব বিদেশি পতাকা নামিয়ে কালিমা লেখা সাদা পতাকা তোলা উচিত। তার এই আহ্বানের পর ঢাকাসহ বেশ কিছু জেলায় সেই সাদা পতাকা দেখা যেতে থাকে, মোটরসাইকেল র‍্যালি বের হয় ধর্মীয় নাশাদ বাজিয়ে।

পুলিশ এই ঘটনায় বেশ সতর্ক হয়ে পড়ে, কারণ এই ধরনের সাদা পতাকা দেখতে অনেকটা আল কায়েদা বা আইএসআইএসের পতাকার মতো লাগে। সরকারের একজন উপদেষ্টা মন্তব্য করেন যে এটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের জন্য ভুল বার্তা দিতে পারে। প্রচার হচ্ছে যে এই কর্মকাণ্ডের পেছনে তাওহিদি জনতা নামে একটা গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে। ইজহার অবশ্য সাফাই দিয়ে বলেছেন যে তার অনুসারীদের পতাকাকে যেন তালেবান বা আইএসআইএসের পতাকার সাথে গুলিয়ে ফেলা না হয়, সেক্যুলার মহল সহজেই এই ধরনের পতাকাকে চরমপন্থী প্রতীক বলে দাগিয়ে দেয় বলে তার অভিযোগ।

মিশরের মতো একটা দেশ, যেখানে ইসলামের সবচেয়ে প্রাচীন প্রতিষ্ঠান অবস্থিত, সেখানে ফুটবল নিয়ে কোনো সংঘাত নেই, বরং একটা মুসলিম পরিবার নিজের সন্তানের নাম রাখছে ব্রাজিলিয়ান আইকনের নামে। অথচ বাংলাদেশে, যেখানে ফুটবল মানুষের প্রাণের খেলা, সেখানে কিছু গোষ্ঠী একে ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। মোস্তফা জিকোর গল্পটা তাই শুধু একটা ফুটবলারের সাফল্যের গল্প না, এটা প্রমাণ করে ভালোবাসা আর অনুপ্রেরণার কোনো ধর্ম, দেশ বা সীমানা থাকে না।

#জিকো #ফুটবল #মিশর #ব্রাজিল #বাংলাদেশ #ধর্ম #সংস্কৃতি #খেলাধুলা
mustafa kemal atarturk

About the Author

mustafa kemal atarturk

Financial analyst

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast