সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

চে গুয়েভারা: বিপ্লবের প্রতীক নাকি বিতর্কিত এক ইতিহাস?

চে গুয়েভারা কেবল একটি টি-শার্টের ছবি নন, বরং বিংশ শতাব্দীর রাজনীতির এক জটিল ও বহুমাত্রিক চরিত্র।

RAJIN AHAMMED SAMI
RAJIN AHAMMED SAMI মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 3 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 131 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 1 জন পাঠক পড়েছেন
চে গুয়েভারা: বিপ্লবের প্রতীক নাকি বিতর্কিত এক ইতিহাস?

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের নাম উচ্চারিত হলেই প্রশংসা ও সমালোচনা একই সঙ্গে সামনে আসে। আর্নেস্তো "চে" গুয়েভারা তাদেরই একজন। কারও কাছে তিনি শোষিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামের প্রতীক, আবার কারও কাছে তিনি সশস্ত্র বিপ্লব ও রাজনৈতিক সহিংসতার প্রবক্তা। তাই চে গুয়েভারাকে বুঝতে হলে আবেগ নয়, ইতিহাসের আলোকে তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ডকে বিচার করা প্রয়োজন।

১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন চে গুয়েভারা। চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করলেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে লাতিন আমেরিকা ভ্রমণের সময়। এই ভ্রমণে তিনি দারিদ্র্য, বৈষম্য, শোষণ এবং বহুজাতিক কোম্পানির প্রভাব প্রত্যক্ষ করেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং তিনি মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন।

চে গুয়েভারার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় কিউবায়। ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেন। ১৯৫৯ সালে কিউবান বিপ্লব সফল হলে তিনি নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। শিল্পমন্ত্রী, জাতীয় ব্যাংকের প্রধান এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিউবার প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন।

চে বিশ্বাস করতেন, কেবল নির্বাচন বা সংস্কারের মাধ্যমে নয়, বরং প্রয়োজনে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমেই শোষণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তন সম্ভব। তাঁর মতে, পুঁজিবাদ বিশ্বজুড়ে বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং সমাজতন্ত্রই হতে পারে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি কিউবার বাইরে আফ্রিকা ও বলিভিয়ায় বিপ্লব সংগঠনের চেষ্টা করেন।

তবে এখানেই শুরু হয় বিতর্ক। কিউবান বিপ্লবের পর রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে তাঁর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন এবং অনেক ঐতিহাসিকের মতে, তিনি রাজনৈতিক সহিংসতাকে ন্যায্যতা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকদের দাবি, সেই সময় কিউবা একটি সশস্ত্র বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল এবং কঠোর পদক্ষেপকে তারা রাষ্ট্র রক্ষার অংশ হিসেবে দেখেন। ফলে চে গুয়েভারার মূল্যায়ন আজও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্কের বিষয়।

১৯৬৭ সালে বলিভিয়ায় নতুন একটি বিপ্লব সংগঠনের চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর পরই তাঁর ব্যক্তিত্ব আরও কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত প্রতিকৃতি আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ, ছাত্র আন্দোলন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে ব্যবহৃত হয়।

চে গুয়েভারা এমন এক ঐতিহাসিক চরিত্র, যাকে এককভাবে নায়ক বা খলনায়ক হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তিনি নিঃসন্দেহে অসাধারণ সাহসী, আদর্শনিষ্ঠ এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী একজন বিপ্লবী ছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মকাণ্ডের কিছু দিক মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করে।

ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে চে গুয়েভারাকে কেবল টি-শার্টে মুদ্রিত একটি মুখ হিসেবে নয়, বরং তাঁর আদর্শ, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং বিতর্কসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। তখনই বোঝা যাবে, তিনি শুধু একজন মানুষ নন, বরং বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জটিল ও বহুমাত্রিক প্রতীক।

#চে_গুয়েভারা #কিউবান_বিপ্লব #রাজনৈতিক_ইতিহাস #ফিদেল_কাস্ত্রো #লাতিন_আমেরিকা #বিপ্লবী #সমাজতন্ত্র #ইতিহাস
RAJIN AHAMMED SAMI

About the Author

RAJIN AHAMMED SAMI

মজদুরের নিয়মিত লেখক

প্রগতিশীল লেখক ও এক্টিভিস্ট

কলম ধরেছি অবহেলিতের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নীরব মানুষের কথা বলাই আমার দায়িত্ব।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast