বিশ্বকাপ ফুটবলের মৌসুমে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ ও উত্তেজনা দেখা যায়, তা নতুন ঘটনা না। কয়েক দশক ধরেই এই ভূখণ্ডের মানুষ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার খেলাকে নিজের আনন্দের অংশ করে নিয়েছে। এর মধ্যে কোনো ধর্মীয় বিচ্যুতি নেই, কোনো আদর্শগত রূপান্তরও নেই। এটি খুবই স্বতস্ফূর্ত একটি বিনোদনমূলক ও সামাজিক অভ্যাস, যা মানুষকে সাময়িকভাবে দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট ও একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দেয়।
কিন্তু প্রতি বিশ্বকাপেই দেখা যায়, একদল ধর্মীয় বক্তা এই স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়ে বসেন। কোরআনের আয়াতের অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় যে, মেসি বা নেইমারকে সমর্থন করা জাহান্নামের কারণ। এই লেখায় প্রশ্ন তুলতে চাই - এই প্রতিক্রিয়া কেন আসে, এবং তার পেছনের প্রকৃত কারণ কী।
এক
কট্টরপন্থী ধর্মীয় ধারায় ইহজাগতিক আনন্দকে বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এই ধারার যুক্তি হলো, পরকালের প্রস্তুতিই মানুষের একমাত্র কর্তব্য, এবং ইহজগতের যে কোনো স্বতঃস্ফূর্ত উদযাপন সেই প্রস্তুতি থেকে বিচ্যুতি। এই মনোভাব থেকেই খেলাধুলা, সংগীত, চলচ্চিত্র - এই সবকিছুর বিরুদ্ধেই সময়ে সময়ে ফতোয়া আসে। বিশ্বকাপ ফুটবল তার একটি সাম্প্রতিক লক্ষ্যবস্তু মাত্র।
এই সন্দেহের পেছনে যে যুক্তিটি কখনো খোলাখুলি বলা হয় না, তা হলো - সাধারণ মানুষ যখন কোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবে আনন্দিত হয়, নিজের পছন্দমতো একটি পরিচয় বেছে নেয়, তখন তা ধর্মীয় নেতৃত্বের একচ্ছত্র প্রভাবের বাইরে চলে যায়। মানুষের মনোযোগ, আগ্রহ এবং সময় - এই তিনটি জিনিসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই যে কোনো মতাদর্শগত কর্তৃত্বের মূল লক্ষ্য। বিশ্বকাপ ফুটবল সহ যেকোনো স্বতস্ফূর্ত উদ্দীপনামূলক কর্মকান্ড এই নিয়ন্ত্রণের একটি সাময়িক ব্যতিক্রম তৈরি করে, এবং সেই ব্যতিক্রমকেই দমন করার চেষ্টা চলে নানান ফতোয়ার মধ্য দিয়ে।
দুই
ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি দেখিয়েছিলেন, শাসক বা প্রভাবশালী শ্রেণী সবসময় বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই না, তারা সংস্কৃতি ও চিন্তার ওপর প্রভাব বিস্তার করেও সমাজে তার কর্তৃত্ব বজায় রাখে। বাংলাদেশে ধর্মীয় রক্ষণশীল ধারার একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক জীবনযাত্রার ওপর একরকম আদর্শগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আসছে।
ফুটবলের মতো একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উপলক্ষ যখন মানুষকে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক পরিচয়ের সাথে যুক্ত করে, তখন তা সেই সংকীর্ণ আদর্শগত সীমারেখাকে দুর্বল করে দেয়। এই কারণেই রক্ষণশীল ধর্মীয় বক্তাদের কাছে এটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে। যেকারণে প্রশ্নটি এখানে ধর্মতাত্ত্বিকই না , সাথে সাথে রাজনৈতিকও।
তিন
বাংলাদেশের সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের অধিকারহীনতা, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অভাব - এই সংকটগুলোই মানুষের প্রকৃত দুর্দশার কারণ। কিন্তু এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো নিয়ে ধর্মীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সরব সমালোচনা দেখা যায় না।এদিকে বিশ্বকাপের মতো একটি নিরীহ সামাজিক ঘটনাকে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়, যা প্রকৃত সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেয়।
এখানে একটি সামঞ্জস্যহীনতাও লক্ষণীয়। ফিফা পরিচালিত বিশ্বকাপের আয়োজনে যে বিপুল কর্পোরেট মুনাফা, শ্রমিক শোষণ এবং আর্থিক অস্বচ্ছতা জড়িত, তার বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা ধর্মীয় বক্তাদের পক্ষ থেকে আসে না, আসার কথাও না, কারণ সেইটা করতে গেলে কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেরও প্রয়োজন। সমালোচনা আসে সাধারণ মানুষের আনন্দ উদযাপনের বিরুদ্ধে।
চার
মানুষের ব্যক্তিগত আনন্দ, পছন্দ অপছন্দ এবং বিনোদনের অধিকার খুবই বেসিক লেভেলের মৌলিক বিষয়। খেলা দেখা বা কোনো খেলোয়াড়কে পছন্দ করা কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাসে কোনোধরণের পরিবর্তন আনে না, এটি একটি নান্দনিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতা। এই স্বাভাবিক অভিজ্ঞতাকে পাপ-পুণ্যের হিসাবে টেনে আনা মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর খুবই নোংরা হস্তক্ষেপ। এইসব ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা কোনো সিভিকসেন্স সম্পন্ন মানুষের পক্ষ সম্ভবই না, এগুলো রীতিমতো ক্রাইম্র পর্যায়ে পড়ে সভ্য ভদ্র সমাজে।
সামাজিক অগ্রগতির স্বার্থে প্রয়োজন হলো, জনমানুষের সাংস্কৃতিক জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার এই ধরনের প্রবণতাকে যুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করা এবং প্রকৃত সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটগুলোর দিকে জনমনোযোগকে ফিরিয়ে আনা। বিশ্বকাপ ফুটবলের আনন্দ যেমন থাকবে, তেমনি প্রশ্ন তুলতে হবে তার আড়ালে থাকা কর্পোরেট শোষণের কাঠামো নিয়েও। এই দুটি সমালোচনা একে অপরের বিরোধী না, বরং একে অপরের পরিপূরকই বলা যায়।
About the Author
Nasim sarker
মজদুরের নিয়মিত লেখকStudent
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। যোগাযোগঃ email:[email protected] Facebook profile: https://www.facebook.com/share/1QYbj7qtnU/
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
2মূর্খ ধর্মীয় নেতাদের কথার কোন মূল্য নেই। তাদের স্রেফ উপেক্ষা করুন। অস্তিত্বহীন, কাল্পনিক ঈশ্বরকে 'খুশি' করার জন্য ধর্মচর্চা করে সময় নষ্ট করার কোন প্রয়োজন নেই। এর চেয়ে ফুটবল দেখা অনেক ভালো।
ঠিক বলেছেন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন