এক
২৭ জুন, ২০২৬। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকীর দিন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান জোহা — শিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রতিনিধি — নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে লিখল: "জাহান্নামের ইমামের মরণদিবস আজ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বাস্তবায়ন করেছিল বিদেশি নকশা।"
একটা শব্দের ভেতরেই এই গোটা রাজনৈতিক প্রবৃত্তির চরিত্র ধরা পড়ে। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মায়ের নামের সঙ্গে জাহান্নাম জুড়ে দেওয়া — এটা স্রেফ অশ্লীলতা না, এটা একটা পরিকল্পিত মতাদর্শিক চিহ্নায়ন। যে নারী মুক্তিযুদ্ধে পুত্র ও স্বামী দুজনকেই দিয়েছেন, যিনি ক্যানসারে মৃত্যুপথযাত্রী হয়েও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন, পুলিশি আক্রমণের স্বীকার হয়েছেন — তাঁকে নিয়ে এই বিদ্রূপ আকস্মিক ক্ষোভ না। এটা জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক বংশলতিকার মধ্যেই প্রোথিত একটা ঘৃণা, যা যথাসময়ে প্রকাশ পায় মাত্র।
ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ হয়েছে, পদ স্থগিতের দাবি উঠেছে — ভালো কথা। কিন্তু একটা পোস্টকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভেবে সন্তুষ্ট থাকলে আসল জিনিসটাই থেকে যাচ্ছে ধরাছোয়ার বাইরে। এই পোস্ট একটা উপসর্গ, মূল রোগ না। রোগটা হলো জামায়াতে ইসলামী নামক রাজনৈতিক প্রকল্প— এবং তার ছাত্র শাখা শিবির— যাদের গোটা ইতিহাস, গঠনতন্ত্র ও কার্যপ্রক্রিয়া একটামাত্র লক্ষ্যে নিবেদিত: ধর্মকে হাতিয়ার করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল।
দুই
জাহানারা ইমাম (১৯২৯-১৯৯৪) কোনো বিমূর্ত প্রতীক না। ১৯৭১-এ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শাফী ইমাম রুমী ক্র্যাক প্ল্যাটুনের গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে ঢাকায় একাধিক অপারেশন চালান, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন, নির্যাতনে শহীদ হন। সেই বছরেই পাকবাহিনীর নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেন তাঁর স্বামী, প্রকৌশলী শরীফ ইমাম। স্বামী আর সন্তান — একই বছরে দুজনকে হারিয়ে যে নারী ভেঙে পড়েননি, বরং অবরুদ্ধ ঢাকায় বসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনলিপি লিখে গেছেন, তা থেকেই জন্ম নেয় "একাত্তরের দিনগুলি" — মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন বাস্তব দলিল।
কিন্তু জাহানারা ইমামের আসল অপরাধ— জামায়াতের চোখে— এইটা না। তাঁর আসল অপরাধ হলো, তিনি থেমে থাকেননি কেবল শোকে। ১৯৯১ সালে গোলাম আযমকে জামায়াতের আমির ঘোষণা করা হলে তিনি ১০১ সদস্যের "একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি" গড়ে তোলেন, এর আহ্বায়ক হন। ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান রাজনৈতিক জোট ও ৭০টি সংগঠনের জাতীয় সমন্বয় কমিটির নেতৃত্বও তাঁর হাতে আসে। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি আয়োজন করেন গণআদালত — এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেখানে রাষ্ট্র যা করতে অস্বীকৃত হয়েছিল, জনগণ নিজেদের বিবেক দিয়েই তা করে দেখিয়েছিল। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গঠিত হয় এই গণআদালত, যার চেয়ারম্যান ছিলেন জাহানারা ইমাম স্বয়ং, এবং বিচারক ছিলেন গাজীউল হক, আহমদ শরীফ, মাজহারুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমানের মতো বুদ্ধিজীবীরা।
রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? জাহানারা ইমাম ও আরও ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অ-জামিনযোগ্য মামলা, তখন ক্ষমতাসীন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। ১৯৯৩ সালে নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশের লাঠিচার্জ, যাতে আহত হন জাহানারা ইমাম নিজে। মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত একজন মানুষ — যিনি প্রতি বছর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাতায়াত করেন — তাঁকেও রেহাই দেয়নি রাষ্ট্র। ১৯৯৪ সালে ডেট্রয়েটের হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি এই লড়াই থামাননি।
এখানেই জামায়াত-শিবিরের ঘৃণার উৎস। জাহানারা ইমাম প্রমাণ করেছিলেন, একজন সাধারণ নাগরিক — কোনো রাষ্ট্রযন্ত্র বা দলীয় ক্ষমতা ছাড়াই — যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে লাখো মানুষকে রাস্তায় নামাতে পারেন, এবং সংসদের ১০০ জন সাংসদকেও তাঁর পক্ষে দাঁড় করাতে পারেন। এই উদাহরণ জামায়াত-শিবিরের কাছে আজও পর্যন্ত স্থায়ী আতঙ্ক, কারণ এটা প্রমাণ দেয় যে তাদের রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি— ১৯৭১-এ পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়ানোর ইতিহাস— কোনোদিনই মুছে যাবে না জনস্মৃতি থেকে।
তিন
জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরকে শুধুই "একটি রক্ষণশীল ধর্মীয় দল" বলে বর্ণনা করা একটা রাজনৈতিক ভুল, ইচ্ছাকৃত বা অজান্তে। এই সংগঠনের কাঠামো, কার্যপ্রক্রিয়া ও লক্ষ্য— তিনটাই ফ্যাসিবাদী রাজনীতির ক্লাসিক বৈশিষ্ট্য বহন করে।
প্রথমত, কাঠামোগত সামরিকতা বা মিলিট্যান্ট সাংগঠনিক পদ্ধতি। শিবিরের সাংগঠনিক পদ্ধতি— কোষ-ভিত্তিক গঠন, "সাথী", "কর্মী", "সদস্য" স্তরবিন্যাস, প্রশ্নাতীত আনুগত্যের দাবি— এটা কোনো গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের কাঠামো না, এটা একটা কর্তৃত্ববাদী ক্যাডার বাহিনীর কাঠামো, যা ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী যুব সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক যুক্তির সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়।
দ্বিতীয়ত, ধর্মকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে রূপান্তর। জামায়াতের নিজস্ব মতাদর্শ "ইকামতে দ্বীন"— অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা— এখানে ধর্ম আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের বিষয় না, এটা একটা রাজনৈতিক প্রকল্পের আইনি বৈধতার আবরণ মাত্র। এই কাঠামোয় ভিন্নম্তের মানেই হলো ধর্মদ্রোহিতা, আর এদের প্রতিপক্ষ মানেই "ইসলামের শত্রু"— এই দ্বিত্ববাদী বিশ্বদৃষ্টিই ফ্যাসিবাদের মূল ভাষাতাত্ত্বিক কৌশল, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে পবিত্র-অপবিত্রের লড়াইয়ে রূপান্তর করা হয়।
তৃতীয়ত, ইতিহাস-বিকৃতি ও পুনর্লিখনের চেষ্টা। গোলাম আযম-নিজামী-মুজাহিদের ১৯৭১-এর ভূমিকা অস্বীকার করা, মুক্তিযুদ্ধকে "ভারতের চক্রান্ত" বলে দেখানো, গণআদালতকে "বিদেশি নকশা" বলে অপবাদ দেওয়া— এই প্রতিটি বাক্যই একটা সংগঠিত ইতিহাস-পুনর্লিখন প্রকল্পের অংশ, যার লক্ষ্য নিজেদের রাজাকার-অতীতকে জাতীয় স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা।
চার:
জোহার পোস্টে যে ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে,সেটাকে ব্যক্তিগত বিচ্যুতি বলে পাড় পেয়ে যাওয়ার সুযোগ নাই— এইটা পিতৃতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শনের যুক্তিসঙ্গত পরিণতি। জাহানারা ইমাম, বেগম রোকেয়ার মতো নারী যাঁরা প্রকাশ্য রাজনৈতিক বা সামাজিক নেতৃত্ব দিয়েছেন— বিশেষ করে যাঁরা ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন— তাঁদের প্রতি এই সংগঠনগুলোর সহিষ্ণুতা কখনোই স্থায়ী থাকেনি।
২০২৬ সালের মে মাসে একজন নারী শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন যে একটি "বট আইডি" থেকে তিনি ক্রমাগত গালি ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন; অভিযুক্ত নিজেই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করেন। আবার শিবির-প্যানেলের এক নারী প্রার্থী নিজেই জানিয়েছেন তিনি "শিবিরের বট আইডি অ্যাটাকের" শিকার হয়েছেন। এই বট-বাহিনী কোনো স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া না— এইটা একটা সংগঠিত পদ্ধতি, যার লক্ষ্য নারীদের গলার আওয়াজকে প্রকাশ্য পরিসর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া, অপমান করে নিশ্চুপ করে দেওয়া। জাহানারা ইমামকে "জাহান্নামের ইমাম" বলার প্রবৃত্তি আর এই বট-আইডি দিয়ে নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্থা করার প্রবৃত্তি— এই দুটো একই রাজনৈতিক উৎস থেকে আসে।
পাঁচ
জামায়াত নিজেকে বলে "গণতান্ত্রিক ইসলামি রাজনৈতিক দল"। এই আত্ম-পরিচয়ের পেছনে যুক্তি যাই থাক, ইতিহাস তার নিজস্ব রায় দিয়ে রেখেছে— ১৯৭১-এ পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান, গণআদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, এবং আজও পর্যন্ত তার ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বের মুখ থেকে বের হওয়া "জাহান্নামের ইমাম"-এর মতো বাক্য— এসব মিলিয়েই এই দলের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায়, তাদের নিজের সংবিধান-লিখিত পরিচয় থেকে না। একটা সংগঠন কী বলে নিজের সম্পর্কে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সে আসলে কী করে— এবং জামায়াত-শিবিরের কাজ বরাবরই তাদের কথার বিপরীতে দাঁড়িয়েছে।
ছয়:
প্রতিরোধ তাহলে কোন পথে
ক্ষোভ প্রকাশ যথেষ্ট না। প্রতিরোধ হতে হবে সংগঠিত ও স্থায়ী:
১. প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা— ক্যাম্পাস প্রশাসন ও ছাত্র সংসদকে বাধ্য করতে হবে এমন বক্তব্যের জন্য লিখিত শাস্তি-নীতি প্রতিষ্ঠা করতে, সমালোচনার ঢেউয়ে সন্তুষ্ট না থেকে।
২. ভুক্তভোগীদের সংগঠিত সুরক্ষা— বট-আইডি হেনস্থার শিকার নারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব দিতে হবে, প্রমাণ সংরক্ষণ ও অভিযোগ দাখিলে সক্রিয় সহায়তা দিতে হবে।
৩. ইতিহাসের পুনরুদ্ধার— "একাত্তরের দিনগুলি", গণআদালত, নির্মূল কমিটির আন্দোলন— এসব নতুন প্রজন্মের কাছে নিয়মিতভাবে পৌঁছে দিতে হবে, কারণ ইতিহাসের শূন্যতাই বিকৃতির সুযোগ তৈরি করে।
৪. মতাদর্শিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া— ক্যাম্পাস রাজনীতি, ছাত্র সংসদ নির্বাচন, এবং বৃহত্তর জাতীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় রাজনীতির বিপরীতে প্রগতিশীল, মুক্তবুদ্ধী পন্থী শক্তিকে সংগঠিত রাখা— এটাই একমাত্র স্থায়ী জবাব, কোনো একক পোস্ট বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাময়িক ক্ষোভের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।
জাহানারা ইমামকে "জাহান্নামের ইমাম" বলা একটা ফেসবুক পোস্টের ভাষাই না এইটা একটা রাজনৈতিক প্রকল্পের নবরূপে আত্মপ্রকাশ, যে প্রকল্প আজ পর্যন্ত তার ১৯৭১-এর জায়গা থেকে এক ইঞ্চিও সরেনি। শহীদ জননীর স্মৃতি রক্ষা করার অর্থ তাই কেবল একটা পোস্টের প্রতিবাদ না এর অর্থ সেই পুরো রাজনৈতিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে আদর্শিক সংগ্রাম অব্যাহত রাখা, যার সর্বশেষ প্রকাশ এই পোস্টটি মাত্র।
About the Author
Nasim sarker
মজদুরের নিয়মিত লেখকStudent
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। যোগাযোগঃ email:[email protected] Facebook profile: https://www.facebook.com/share/1QYbj7qtnU/
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
3যাদের রাজনীতি মিথ্যার উপর দাড়িয়ে আছে অচিরেই তাদের ধ্বস নামবে
অবশ্যই
অবশ্যই।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন