লেখাটি, ২২ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে MIDWESTERN MARX INSTITUTE’-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কার্লোস এল. গারিডো'র The Dialectics of Unity and the Left’ প্রবন্ধটির বাংলাদেশী সংস্করণ।
☭ সমাজে শ্রেণি-সংঘাত ও বিভাজন:
যে সমাজে শ্রেণি-বিরোধ আছে, সেখানে উৎপাদনের উপকরণ, রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ও শিক্ষার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে এক শ্রেণির হাতে; আর সেটা হলো শাসক শ্রেণি। এই শ্রেণি টিকে থাকতে চায় মানুষকে যতভাবে সম্ভব ভাগ করে রাখতে। শাসক শ্রেণির জন্য সব সময়ই কার্যকর নীতি হলো- Divide et impera (ভাগ করো ও শাসন করো) । শ্রমজীবী, সম্পত্তিহীন মানুষ যত বেশি দলে দলে বিভক্ত হবে, শাসক শ্রেণি তত বেশি শক্তিশালী হবে। এই কারণেই কার্ল মার্কস বর্ণবাদকে বলেছিলেন- “এটাই সেই গোপন অস্ত্র, যার মাধ্যমে শাসক শ্রেণি তার ক্ষমতা ধরে রাখে।”জেমস ম্যাডিসনও The Federalist No. 10-এ পুঁজিপতিদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন- “যদি সম্পত্তিহীন জনগণের মধ্যে বেশি বেশি দলাদলি সৃষ্টি করা যায়, তাহলে তারা একত্র হতে পারবে না।”
☭ ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা:
এই যে বিভাজন, এই বিভাজনের একটাই জবাব। আর সেটা হলো- ঐক্য। কোয়ামে নক্রুমাহ (Kwame Nkrumah) বলেছিলেন- “আফ্রিকাকে টুকরো টুকরো করে দুর্বল রাখাই সাম্রাজ্যবাদের প্রধান অস্ত্র, তাই আফ্রিকার মুক্তি আসবে শুধু আফ্রিকান ঐক্যের মাধ্যমেই।”কিউবার দার্শনিক ও কবি হোসে মার্তিও একই আহ্বান জানিয়েছিলেন যে, লাতিন আমেরিকা যদি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে চায়, তবে তাকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি ইউরোপীয় উপকথার “দ্যা জায়ান্ট অফ দ্য সেভেন-লিগ বুটস”-এর প্রতীক ব্যবহার করে লিখেছিলেন, “গাছগুলোকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে, যেন সেই দৈত্য পেরোতে না পারে! এখন একসঙ্গে মার্চ করার সময়, আন্দেস পর্বতের রূপালী শিরার মতো ঘন হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।”
☭ সব ঐক্য এক নয়:
তবে সব ধরনের ঐক্য একই রকম নয়। সব ঐক্য জনগণের বিভাজন দূর করে না। শাসক শ্রেণির হাতে বিভক্ত শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য এক রকম; আর বিভিন্ন বামপন্থী গোষ্ঠীর ঐক্য একেবারেই আলাদা বিষয়। প্রথমটি জনগণের শক্তি বাড়ায়, দ্বিতীয়টি অনেক সময় বিভাজনকেই গভীর করে তোলে। লেনিন সতর্ক করেছিলেন, “ঐক্য মহান একটি বিষয়, কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের জন্য দরকার মার্কসবাদীদের ঐক্য-মার্কসবাদীদের সঙ্গে, মার্কসবাদের বিকৃতিকারীদের সঙ্গে নয়।” তিনি বলেছিলেন, “সবসময় জিজ্ঞেস করতে হবে- ঐক্য কার সঙ্গে?” যে বামপন্থীরা নিজেদের নৈতিকভাবে “বিশুদ্ধ” ভাবতে গিয়ে বাস্তবে বিভাজন সৃষ্টি করে, যারা ক্যান্সেল-কালচার বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিতে আটকে যায়, তাদের সঙ্গে ঐক্য করলে ঐক্য নয়, বরং বিভাজনই বাড়ে। (৭) যে বামপন্থা শ্রমিকদের “অবিশুদ্ধ” ভেবে সংগঠিত করতে চায় না, তা শেষ পর্যন্ত শ্রেণি-সংগ্রামকে দুর্বল করে এবং শাসক শ্রেণির হাত শক্ত করে।
☭ বাম রাজনীতির ভেতরের বিভাজন:
আজকের দিনে দেখা যায়, একটার পর একটা নতুন ‘বামপন্থী দল’ বা ‘সংগঠন’ গড়ে উঠছে। বাইরে থেকে তারা নিজেদের বিপ্লবী বলে সাজায়, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তারা মূলধারার পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মানিয়ে নেয়। যে বাম রাজনীতি প্রথমেই মানুষের জন্য একগাদা ‘চেকলিস্ট’ বানায়; যেখানে লিঙ্গ, যৌনতা, ইতিহাস বা জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে দেখা হয়, কে যোগ্য বা অযোগ্য; তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাদের দল ছোট হতে থাকে, কারণ যারা সত্যিই শ্রেণি-সংগ্রামে আগ্রহী, তারা একসময় সেই চক্র থেকে বেরিয়ে যায়।
☭ ঐক্য মানেই সবসময় শক্তি নয়:
ঐক্যকে কখনো বিমূর্তভাবে ধরা যাবে না। সব সময় প্রশ্ন করতে হবে-
কার সঙ্গে ঐক্য? কী উদ্দেশ্যে ঐক্য? ফলাফল কী হবে? কোন প্রেক্ষাপটে ঐক্য ঘটছে?
যে ঐক্য পুঁজিপতি শ্রেণির সঙ্গে শ্রেণি-সমঝোতা তৈরি করে, তা শ্রেণি-সংগ্রামকে এগিয়ে নেয় না। আবার, যে ঐক্য সেইসব ‘বিশুদ্ধতা-প্রীত’ বামদের সঙ্গে হয় যারা সবাইকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাও সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের ক্ষতি করে। কার্ল লিবখনেখট বলেছিলেন- “সব ঐক্য শক্তি দেয় না। আগুন ও পানির ঐক্য মানে আগুন নিভে যাওয়া, পানি উবে যাওয়া। নেকড়ে ও মেষশাবকের ঐক্য মানে মেষশাবকের মৃত্যু। শ্রমিক শ্রেণি ও শাসক শ্রেণির ঐক্য মানে শ্রমিকের আত্মবলি। বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে ঐক্য মানে পরাজয়।” আজকের যুগে, যেখানে শ্রেণি-সংগ্রাম দিন দিন তীব্র হচ্ছে, সেখানে পুরনো ‘বিশুদ্ধতাবাদী’ বামদের সঙ্গে ঐক্য করা মানে সংগ্রামের আগুনে পানি ঢালা।
☭ আত্মসমালোচনা ও শিক্ষা:
“অতীতে, অজ্ঞতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে আমরা হয়তো এমন ঐক্য চাইতাম; কিন্তু অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে, যাদের রাজনীতি বাস্তবে বিভাজন তৈরি করে, তাদের সঙ্গে কোনও বাস্তব ঐক্য সম্ভব নয়।” যারা নিজেদের সমাজতন্ত্রী বা কমিউনিস্ট বলে দাবি করে, কিন্তু কাজের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে, তাদের সঙ্গে ঐক্য মানে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামকে ভেতর থেকে দুর্বল করা। এই তথাকথিত মধ্যবিত্ত ‘বামপন্থা’ আসলে সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোরই অংশ; তাদের সঙ্গে ঐক্য মানে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গেই ঐক্য; যা আন্দোলনের পথে বাঁধা এবং কখনও বিশ্বাসঘাতকতা।
☭ ঐক্য ও বিভাজনের দ্বন্দ্ব:
এই দ্বন্দ্বে দেখা যায়, কিছু ধরনের ঐক্যই বিভাজন ঘটায়, আবার কিছু ধরনের বিভাজনই প্রকৃত ঐক্য আনে। ‘ঐক্য’ ও ‘বিভাজন’- এই দুই শব্দ তখনই অর্থবহ যখন এগুলো শ্রেণি-সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা হয়। সত্যিকারের মার্কসবাদীদের কাজ হলো, শাসক শ্রেণি ও তাদের বাম-সহযোগীদের থেকে নিজেদের আলাদা করা, যাতে শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য গড়ে সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়।
☭ ব্যক্তিগত নয়, রাজনৈতিক সমালোচনা:
এই সমালোচনা কোনও ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নয়; অনেকেই বিভাজনমুখী বাম-সংগঠনে যুক্ত, কারণ তারা ভাবে এটাই ভিন্নমতের একমাত্র জায়গা। কিন্তু এটা আসলে পরিকল্পিত; শাসক শ্রেণি ইচ্ছাকৃতভাবে এইসব জায়গাকে নিরাপদ-বিরোধীতার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে, যাতে যুবসমাজ মনে করে তারা বিপ্লবী কিছু করছে, কিন্তু আসলে শাসক ব্যবস্থারই সীমার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তারা। তাই বলতে হচ্ছে- আমরা কাউকে ঘৃণা করি না, আমরা ঘৃণা করি সেই রাজনীতিকে, যা শ্রমজীবী মানুষদের সমাজতন্ত্র থেকে দূরে রাখে।
☭ ভবিষ্যতের বার্তা:
এডি লিগার স্মিথ বলেন- “যারা এখন আমাদের নিয়ে কটাক্ষ, আক্রমণ আর অপবাদ দেয়; শুনে রাখো, দরজাটা সব সময় খোলা। আমরা কাজ করে যাচ্ছি, যখন তোমরা তোমাদের ‘বিশুদ্ধতার নেশা’ কাটিয়ে সমাজ বদলের কাজে যোগ দেবে, আমরা তখনও এখানেই থাকব।”
তথ্যসূত্র:
১। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস, Ireland and the Irish Question, মস্কো: প্রগ্রেস পাবলিশার্স, ১৯৭০।
২। জেমস ম্যাডিসন, The Federalist No. 10, ১৭৮৭।
৩। কোয়ামে নক্রুমাহ, Neocolonialism: The Last Stage of Imperialism, ২০০৪।
৪। হোসে মার্তি, Tres Héroes, Páginas Escogidas, ১৯৯৪।
৫। ভি. আই. লেনিন, Collected Works, Part-20, ১৯৭৭।
৬। ভি. আই. লেনিন, Collected Works, Part-20, ১৯৭৭।
৭। কার্লোস এল. গারিডো, The Purity Fetish and the Crisis of Western Marxism, ২০২৩।
৮। কার্ল লিবখনেখট, The German Revolution and the Debate on Soviet Power, ১৯৮৬।
৯। কার্লোস এল. গারিডো, Revolutionizing in America the Hope Bolivia Has Given Us, ২০২০।
১০। এডওয়ার্ড লিগার স্মিথ, Speech at the Institute for a Free America, ২০২৪।
✍ লেখক পরিচিতি
কার্লোস এল. গারিডো একজন কিউবান-আমেরিকান দার্শনিক ও অধ্যাপক। তিনি Midwestern Marx Institute -এর পরিচালক এবং আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টি-র শিক্ষা সম্পাদক। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো-
• Marxism and the Dialectical Materialist Worldview (2022)
• The Purity Fetish and the Crisis of Western Marxism (2023)
• Why We Need American Marxism (2024)
তিনি বিশ্বজুড়ে বহু গবেষণাধর্মী ও জনপ্রিয় প্রকাশনায় লিখেছেন এবং Midwestern Marx Institute YouTube -এ নিয়মিত অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন।
About the Author
Md. Belal Hosain Bidda
Lawyer
“জীবন যেখানে দ্রোহের প্রতিশব্দ, মৃত্যুই সেখানে শেষ কথা নয়।”
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন