যেকোনো চায়ের দোকান বা রাজনৈতিক আড্ডায় সমাজতন্ত্র নিয়ে কথা উঠলেই একটা তাচ্ছিল্যের সুর শোনা যায়, "বাংলাদেশে কি সমাজতন্ত্রের কোনো ভবিষ্যৎ আছে, নাকি এটা শুধুই বইয়ের পাতার গল্প?"
দেশে এখন চরম বৈষম্য। একদিকে ব্যাংক লুট করে টাকার পাহাড়, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী, শোষণ যেখানে চরম পর্যায়ে, সেখানে সমাজতন্ত্র বা শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই সবচেয়ে শক্তিশালী হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে ঠিক উলটো। সাধারণ মেহনতি মানুষের মুক্তির এই আদর্শ কেন আজ খাদের কিনারায়? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের নিজেদের ভুল ও ব্যর্থতার জায়গাগুলো সহজভাবে স্বীকার করে নিতে হবে।
১. ‘বাম মানেই ধর্মবিরোধী’ - সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা
বাংলাদেশে বাম রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গা হলো 'ধর্মীয় ইস্যু'। শাসকশ্রেণি এবং উগ্র ডানপন্থীরা যুগ যুগ ধরে খুব সুকৌশলে সাধারণ মানুষের মগজে একটি কথা ঢুকিয়ে দিয়েছে, "বাম মানেই নাস্তিক, এরা ধর্মের শত্রু।"
অথচ সমাজতন্ত্রের মূল লড়াইটা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে নয়, লড়াইটা শোষকের বিরুদ্ধে। একজন কৃষকের ধর্মবিশ্বাস যাই হোক না কেন, মহাজনের শোষণের কাছে সে কেবলই একজন শোষিত মানুষ। কিন্তু আমাদের দেশের বামপন্থীরা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে গিয়ে এই সহজ সত্যটা বোঝাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। উলটো অনেক সময় অতি-প্রগতিশীলতা দেখাতে গিয়ে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষ, যাদের অধিকারের জন্য বামদের লড়াই করার কথা, তারাই বামদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
২. মানুষের ভাষায় কথা না বলা এবং তাত্ত্বিক কাঠিন্য
একজন কৃষক বা রিকশাচালক 'বুর্জোয়া', 'প্রলেতারিয়েত', 'হেজিমনি' বা 'ডায়ালেক্টিক মেটেরিয়ালিজম'-এর মতো কঠিন শব্দ বোঝেন না; তারা বোঝেন পেটের ক্ষুধা, বাজারের দাম আর মজুরির হিসাব।
বাম রাজনীতির একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো, তারা সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতে ভুলে গেছেন। বামদের রাজনীতি এখন গ্রামের মেঠোপথ বা কারখানার বস্তি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষ, প্রেস ক্লাব আর নির্দিষ্ট কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডায় আটকে গেছে। যে আদর্শের জন্ম হয়েছিল খেটে খাওয়া মানুষের ঘাম থেকে, সেই আদর্শ যখন কেবল বইয়ের কঠিন ভাষায় আটকে থাকে, তখন তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
৩. আইকনিক ফেস বা ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের অভাব
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির একটা বড় মনস্তত্ত্ব হলো, মানুষ এখানে একটা 'মুখ' বা 'আইকনিক ফেস' খোঁজে। এমন একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা, যার এক ডাকে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। অতীতে মওলানা ভাসানীর মতো নেতারা লুঙ্গি পরে একেবারে সাধারণ কৃষকের ভাষায় কথা বলে তাদের একজোট করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু বর্তমানে বাম রাজনীতিতে এমন কোনো আইকনিক বা ভরসার মুখ নেই, যিনি বিভক্ত বাম দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে পারেন এবং সাধারণ মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পারেন। নেতৃত্বের এই শূন্যতা সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
৪. নতুন মেহনতি মানুষের সাথে দূরত্ব
পুঁজিবাদের রূপ এখন বদলে গেছে। আগে কেবল কারখানার শ্রমিক বা কৃষক ছিল শোষণের শিকার। আর আজ? গিগ ইকোনমির (Gig Economy) নামে ফুড ডেলিভারি বয়, উবার চালক, কিংবা চুক্তিভিত্তিক কাজ করা তরুণরা কর্পোরেট শোষণের নতুন শিকার। এই নতুন প্রজন্মের শ্রমিকদের কোনো আইনি সুরক্ষা বা ইউনিয়ন নেই। কিন্তু বাম দলগুলো এখনো সেই পুরোনো ধাঁচের স্লোগান আর কাঠামোতেই আটকে আছে। নতুন প্রজন্মের এই 'আধুনিক শ্রমিকদের' অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তারা নিজেদের প্রাসঙ্গিক করতে পারছে না।
সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ: তবে কি পুরোটাই অন্ধকার?
না, সমাজতন্ত্র মৃত নয়। যতদিন সমাজে শোষণ, বেকারত্ব এবং বৈষম্য থাকবে, ততদিন সমাজতন্ত্রের প্রাসঙ্গিকতা ফুরোবে না। তবে বাংলাদেশে এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাম রাজনৈতিক দলগুলোর 'রি-বুট' বা খোলস বদলে ফেলার ওপর।
তাদের কঠিন তাত্ত্বিক খোলস ছেড়ে বের হতে হবে। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রতিপক্ষ না বানিয়ে, তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা সহজ ভাষায় বলতে হবে। অতীত নিয়ে নস্টালজিয়ায় না ভুগে নতুন প্রজন্মের শ্রমিক এবং তরুণদের সাথে সংযোগ তৈরি করতে হবে। ভবিষ্যৎ সমাজতন্ত্র হয়তো পুরোনো কাস্তে-হাতুড়ির আক্ষরিক রূপে আসবে না; সেটি আসবে সাধারণ মানুষের ভাত, ভোট, বাকস্বাধীনতা আর মর্যাদার লড়াইয়ের একেবারে সহজ, দেশজ একটি রূপরেখা হয়ে। সমাজতন্ত্রকে বাঁচতে হলে সবার আগে তাকে এ দেশের মাটির কাছাকাছি আসতে হবে।
About the Author
আতিকুর রহমান অন্তর
লেখক এবং ডিজিটাল মার্কেটিং প্রফেশনাল
আমি আতিকুর রহমান অন্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী। রাষ্ট্র, সমাজ, লোকসংস্কৃতি, ধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে মুক্তালাপ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করাই আমার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য।
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন