Searching…

রাষ্ট্র, ধর্ম ও একতারা: শাহ আবদুল করিমের অবিনাশী দর্শন

আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে মানুষের মেধা ও মননকে মাপা হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মানদণ্ডে, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকে মনে করা হয় প্রজ্ঞার চূড়ান্ত মাপকাঠি। কিন্তু বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় দার্শনিক তত্ত্বগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসেনি, এসেছে বাংলার কাদামাটি আর প্রান্তিক মানুষের ভেতর থেকে।

আতিকুর রহমান অন্তর
46 5 মিনিট লাগতে পারে পড়তে
রাষ্ট্র, ধর্ম ও একতারা: শাহ আবদুল করিমের অবিনাশী দর্শন

আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে মানুষের মেধা ও মননকে মাপা হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মানদণ্ডে, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকে মনে করা হয় প্রজ্ঞার চূড়ান্ত মাপকাঠি। কিন্তু বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় দার্শনিক তত্ত্বগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসেনি, এসেছে বাংলার কাদামাটি আর প্রান্তিক মানুষের ভেতর থেকে। এমনই একজন শেকড়সংলগ্ন দার্শনিক ছিলেন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম।

​প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডিতে তিনি আবদ্ধ ছিলেন না, অথচ তার সমাজভাবনা এবং দর্শন বর্তমানের অনেক শিক্ষিত সমাজবিজ্ঞানীর চেয়েও বহুগুণ অগ্রসর ছিল। শাহ আবদুল করিম কেবল প্রেমের গান লেখেননি; তিনি একতারা হাতে লড়াই করেছেন মোল্লাতন্ত্র, ফতোয়া এবং সমাজকাঠামোর অসাম্যের বিরুদ্ধে যে লড়াইটি আজকের বাংলাদেশে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও জরুরি হয়ে উঠেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে এক 'অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল'

​শাহ আবদুল করিমের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে ছিল মাত্র আট দিনের নৈশবিদ্যালয়ের পাঠ। বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা মূলত এমন এক সিলেবাস তৈরি করে, যা রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য কিছু অনুগত কেরানি আর আজ্ঞাবহ নাগরিক জন্ম দেয়। আবদুল করিম সেই মগজধোলাইয়ের ভেতর দিয়ে যাননি।

​তার বিশ্ববিদ্যালয় ছিল কালনীর ঢেউ, হাওরের বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর ভাটি অঞ্চলের খেটে খাওয়া কৃষকদের জীবনসংগ্রাম। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন কীভাবে মহাজন আর সমাজপতিরা সাধারণ মানুষকে শোষণ করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব তাকে অন্ধ করেনি, বরং পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে তাকে বাংলার একজন প্রকৃত 'অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল' বা মাটিঘেঁষা বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করেছিল। তিনি মানুষের জীবন থেকে সরাসরি পাঠ নিয়েছিলেন, যা তাকে শিখিয়েছিল পুঁথির চেয়ে মানুষের বাস্তব জীবন অনেক বেশি সত্য।

সাধনা: মরমীবাদের মোড়কে গণমানুষের দর্শন

শাহ আবদুল করিমের সাধনাকে কেবল আধ্যাত্মিক বা মরমীবাদ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তার সাধনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর কোনো দূর আকাশের বাসিন্দা নন, বরং মানুষের ভেতরেই তার বাস।

​তার বিখ্যাত দেহতত্ত্বের গানগুলোতে তিনি মানুষের শরীরকেই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখেছেন। যখন তিনি গেয়ে ওঠেন, "মানুষ হয়ে তালাশ করলে মানুষ পাওয়া যায়", তখন সেটি কেবল কোনো আধ্যাত্মিক বাণী থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে এক অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজের ইশতেহার। তার সাধনা কোনো বৈরাগ্য বা সংসারত্যাগের সাধনা ছিল না, বরং তা ছিল সমাজের নিচুতলার মানুষের দুঃখ-কষ্টকে বুকে ধারণ করে তাদের মুক্তির পথ খোঁজার সাধনা।

মোল্লাতন্ত্রের ফতোয়া থেকে আজকের মাজার ভাঙা: একই আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা

শাহ আবদুল করিমের জীবন কখনোই মসৃণ ছিল না। সুনামগঞ্জের উজানধল গ্রামে বসে তিনি যখন গান বাঁধছেন, তখন তাকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে স্থানীয় মোল্লাতন্ত্র এবং ধর্মীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে। ধর্ম ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি বাউলদের গান সাধারণ মানুষকে এক সুতোয় বাঁধছিল, যা স্থানীয় ধর্মান্ধ সমাজপতিদের আধিপত্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাকে কাফের ফতোয়া দেওয়া হয়, সামাজিকভাবে একঘরে (বয়কট) করে রাখা হয়।

​আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে আমরা কী দেখতে পাই? শাহ আবদুল করিমের সময় যে ধর্মান্ধতা ছিল গ্রামীণ ফতোয়ার পর্যায়ে, আজ তা রূপ নিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ও শারীরিক সহিংসতায়। অতি সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক মাজার ভাঙচুর, বাউলদের ওপর হামলা এবং তাদের চুল কেটে দেওয়ার মতো বর্বরোচিত ঘটনা আমরা দেখেছি। যে মাজার বা বাউল আখড়াগুলো শত শত বছর ধরে বাংলার অসাম্প্রদায়িক লোকসংস্কৃতি ও আশ্রয়ের কেন্দ্র ছিল, সেগুলোকে আজ একদল উগ্রবাদী শক্তি গায়ের জোরে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।

​এই আগ্রাসন কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধ নয়, এটি আসলে বাংলার হাজার বছরের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্র (Cultural Hegemony)।

​'বনলতা এক্সপ্রেস' ও স্বাধীন চিন্তার ওপর সেন্সরশিপ

এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কেবল মাজার বা আখড়াতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি আঘাত হানছে আমাদের আধুনিক শিল্পমাধ্যমগুলোর ওপরও। অতি সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হুমায়ূন আহমেদ এর উপন্যাস 'কিছুক্ষণ'  অবলম্বনে নির্মিত 'বনলতা এক্সপ্রেস' সিনেমার প্রদর্শনীতে উগ্রপন্থীদের বাধার মুখে করে দিতে হয়েছে।

​এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। শাহ আবদুল করিমের একতারাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা, বাউলদের আখড়া গুঁড়িয়ে দেওয়া, আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমার পর্দা নামিয়ে দেওয়া, এগুলো সবই একই সুতোয় গাঁথা। শাসকশ্রেণি ও উগ্রপন্থীরা সবসময়ই শিল্প, সাহিত্য ও মুক্ত সংস্কৃতিকে ভয় পায়, কারণ এগুলো মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখায়। একটি চিন্তাহীন, সংস্কৃতিহীন সমাজ তৈরি করতে পারলেই কেবল উগ্রবাদ ও পুঁজিতন্ত্রের আধিপত্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

শেষ কথা

​আবদুল করিম যখন সমাজচ্যুত হয়েছিলেন, তখন তিনি তার গানের মাধ্যমেই সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক জবাবটি দিয়েছিলেন, "গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান / মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম / আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।"

​আজকের দিনে দাঁড়িয়ে শাহ আবদুল করিমের এই গানটি কেবল কোনো নস্টালজিয়া বা অতীতবিলাস নয়, এটি একটি প্রতিরোধের গান। বর্তমানের এই মাজার ভাঙা, সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ করা আর সংস্কৃতির ওপর ফতোয়া জারির অন্ধকার সময়ে আমাদের বুঝতে হবে, লড়াইটা কেবল কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বা মতবাদের নয়; লড়াইটা আমাদের অস্তিত্বের, আমাদের ভাষার এবং আমাদের স্বাধীন চিন্তার। রাষ্ট্রযন্ত্রের উদাসীনতা বা পরোক্ষ মদদে যে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ আজ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তার বিরুদ্ধে শাহ আবদুল করিমের মতো একতারা আর শাণিত শব্দমালা নিয়েই আমাদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শোষিত ও মুক্তিকামী মানুষের প্রকৃত মুক্তি সংস্কৃতির এই স্বাধীনতা ছাড়া অসম্ভব।

আতিকুর রহমান অন্তর

About the Author

আতিকুর রহমান অন্তর

​লেখক এবং ডিজিটাল মার্কেটিং প্রফেশনাল

আমি আতিকুর রহমান অন্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী। রাষ্ট্র, সমাজ, লোকসংস্কৃতি, ধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে মুক্তালাপ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করাই আমার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য।

প্রোফাইল দেখুন

আলোচনায় অংশ নিন

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

সাইন ইন করুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast