Searching…

১৯৭১ সালের ৩ জুন: পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির জন্মকথা

১৯৭১ সালের জুন মাস। চারদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্?...

কাজী মোহাম্মদ আসিফ
5 7 মিনিট লাগতে পারে পড়তে

১৯৭১ সালের জুন মাস। চারদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা আর সাধারণ মানুষের হাহাকার। অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মূল ধারার সশস্ত্র লড়াইয়ের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক দুর্গম জল-অরণ্যে জন্ম নিচ্ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার এক বামপন্থী রাজনৈতিক ও গেরিলা অধ্যায়।

একাত্তরের ৩ জুন ঝালকাঠি-স্বরূপকাঠি এলাকার বিখ্যাত পেয়ারাবাগানে এক গোপন সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে "পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি"। সেদিনের সেই রোমাঞ্চকর এবং ঐতিহাসিক মুহূর্তটির এক অনন্য দলিল লুকিয়ে আছে এক প্রত্যক্ষদর্শীর ডায়েরির পাতায়।

আতা গ্রামের শিবমন্দির: বিপ্লবের গোপন আস্তানা

একাত্তরের মে মাসের শেষদিকে ঝালকাঠি-স্বরূপকাঠির আটঘর-কুরিয়ানার ভীমরুলি হাইস্কুল থেকে আধ মাইল দূরে অবস্থিত ডুমুরিয়ার পেয়ারাবাগান। এর উত্তরের শেষ প্রান্তের গ্রামটির নাম 'আতা'। পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচারের ভয়ে হিন্দু অধ্যুষিত এই গ্রামের মানুষ তখন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

জনমানবহীন এই গ্রামের এক পরিত্যক্ত শিবমন্দিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন দুজন মানুষ—একজন এই বিবরণীর লেখক (যাকে কমরেডরা 'স্যার' বলে সম্বোধন করতেন), আর অন্যজন তখনকার 'পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন'-এর প্রধান কমরেড সিরাজ সিকদার, যিনি কর্মীদের কাছে পরিচিত ছিলেন 'সালাম ভাই' নামে।

১৯৬৮ সালের ৮ জানুয়ারি মাও সেতুঙের আদর্শে পরীক্ষামূলকভাবে 'পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন' গঠিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মার্চের পর এর কেন্দ্রীয় কমান্ড স্থানান্তর করা হয় পেয়ারাবাগানের এই দুর্গম এলাকায়। উদ্দেশ্য ছিল—গেরিলা যুদ্ধের অনুকূল পরিবেশ ব্যবহার করে পাকবাহিনী ও স্থানীয় দালালদের পরাভূত করে একটি 'মুক্তাঞ্চল' গড়ে তোলা।

অন্ধকার ক্লাসরুমে আলোর মশাল:

সম্মেলনের আগের দিনগুলোতে প্রায়ই সন্ধ্যার পর হারিকেনের আলোয় ভীমরুলি হাইস্কুলের ক্লাসরুমে বসত গোপন ক্লাস। কালো ফ্রেমের চশমা, ধোয়া শার্ট-লুঙ্গি পরিহিত সিরাজ সিকদারকে তখন মনে হতো এক আদর্শ শিক্ষক। বাঁ হাতে হারিকেন উঁচিয়ে ধরে, ডান হাতে চকে ব্ল্যাকবোর্ডে এঁকে তিনি তরুণদের বোঝাতেন মাও সেতুঙের তত্ত্ব ও বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)।

সিরাজ সিকদারের রণকৌশল ও মাওবাদী দর্শন

৩ জুন সকাল ৭টা। মন্দিরের গাছগাছালি ঘেরা আঙিনায় হাতে একটি লাল বই নিয়ে পায়চারি করছিলেন সিরাজ সিকদার। গভীর কোনো তাত্ত্বিক সমাধানের খোঁজে মগ্ন তিনি। লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে সেদিনের সভার মূল এজেন্ডা—পার্টীর নাম পরিবর্তন করে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া।

সিরাজ সিকদার লেখককে অনুরোধ করেন নাম প্রস্তাবের এবং ভোট দেওয়ার। রাজনীতির জটিল সমীকরণ নিয়ে লেখকের দ্বিধার জবাবে সিরাজ সিকদার মাওবাদী দর্শনের সহজ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন:

  • সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্ব: চেয়ারম্যান মাও সেতুঙের রাজনীতির মূল আদর্শ হলো সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে গণতন্ত্র।

  • সশস্ত্র বিপ্লব: বুর্জোয়া বা পুঁজিবাদীরা কখনো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করে না। তাই সশস্ত্র বিপ্লবই একমাত্র পথ।

  • বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস: "পলিটিক্যাল পাওয়ার গ্রোজ আউট অব দি ব্যারেল অব গান"—অর্থাৎ, রাজনৈতিক ক্ষমতা বন্দুকের নল থেকেই বেরিয়ে আসে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও 'মাছ-পানি'র তত্ত্ব

সে সময় চলমান ভিয়েতনাম যুদ্ধের উদাহরণ টেনে সিরাজ সিকদার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, আমেরিকার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। গেরিলাদের তিনি 'মাছ' এবং জনগণকে 'পানি'র সঙ্গে তুলনা করতেন। জনগণের সমর্থনই গেরিলা যুদ্ধের প্রাণশক্তি।

তিনি পেয়ারাবাগানের শিশুদের একটি রণকৌশলও শোনাতেন—কীভাবে ভিয়েতনামের শিশুরা আমেরিকান সৈন্যদের ওপর ভীমরুলের চাকে ঢিল ছুঁড়ে আক্রমণ করত এবং বিভ্রান্ত সৈন্যদের খতম করে আধুনিক অস্ত্র ছিনিয়ে নিত। মাওয়ের থিওরি অনুযায়ী তিনি বলতেন, "শত্রুরা যত আধুনিক অস্ত্র তৈরি করছে, তা প্রকারান্তরে আমাদের জন্যই করছে। গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে সেই অস্ত্র হস্তগত করেই শত্রুকে মোকাবেলা করা হবে।"

চশমাধারী তরুণদের মেলা ও আত্মগোপনের কৌশল

বিকেল গড়িয়ে যখন গোধূলিলগ্ন এলো, কমরেড সিরাজ সিকদার এবং লেখক প্রস্তুত হলেন ভীমরুলি হাইস্কুলের উদ্দেশ্যে। জগদীশের ছোট ছইওয়ালা নৌকায় চড়ে তারা রওনা হলেন। চারদিকে নিস্তব্ধ সাঁঝবেলা। যুদ্ধকালীন থমথমে পরিস্থিতিতে যে জনপদে সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনি হারিয়ে গিয়েছিল, সেখানে এক অদ্ভুত নীরবতা মাড়িয়ে নৌকা চলল।

ভীমরুলি হাইস্কুলে যখন তারা পৌঁছালেন, তখন চারিদিকের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়েছে। হারিকেনের আলোয় সজ্জিত বড় ক্লাসরুমটিতে একে একে জড়ো হচ্ছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুর্গম পথ হেঁটে আসা তরুণ কর্মীরা।

একটি অদ্ভুত কৌশল:

সমবেত তরুণদের অধিকাংশেরই চোখে ছিল চশমা। সিরাজ সিকদার মনে করতেন, তরুণরা চশমা পরলে তাদের 'ইনটেলেকচুয়াল' বা বুদ্ধিজীবী মনে হয়। ফলে রাস্তাঘাটে পাকবাহিনী বা দালালরা প্রথম দেখায় সহজে সন্দেহ করতে পারে না। এটি ছিল তাদের আত্মগোপনের একটি অন্যতম কৌশল।

এই সম্মেলন ক্ষমতা ভাগের ছিল না, ছিল জীবন উৎসর্গের। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতীক ড. নরম্যান বেথুনের মতো নিঃস্বার্থভাবে তারা সমবেত হয়েছিলেন এক ঐতিহাসিক মিলনমেলায়।

ঐতিহাসিক মুহূর্ত: যেভাবে জন্ম নিলো ‘সর্বহারা পার্টি’

সভা শুরু করে কমরেড সিরাজ সিকদার (সালাম ভাই) সবাইকে সংগ্রামী লাল সালাম জানালেন। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে যৌথভাবে গঠিত ঐক্যফ্রন্টের গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি তুলে ধরলেন এবং পার্টীর পূর্ণাঙ্গ নামকরণের জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মত আহ্বান করলেন।

একে একে কর্মীরা উঠে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন নামের প্রস্তাব করতে লাগলেন। সিরাজ সিকদার ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে নামগুলো লিখছিলেন:

১. পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি

২. বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

৩. প্রলেতারিয়েত পার্টি

৪. সর্বহারা পার্টি

সব মিলিয়ে ছয়-সাতটি নাম প্রস্তাব করা হলো। এরপর শুরু হলো ঐতিহাসিক ভোটাভুটি। লম্বা, ফর্সা ও সদা হাসিমুখের ধীরস্থির ব্যক্তিত্বের মাহতাব ভাই ভোট গণনায় সহায়তা করছিলেন।

ভোটাভুটির শেষ পর্যায়ে বিপুল ব্যবধানে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয় "সর্বহারা পার্টি" নামটি। শেষ মুহূর্তে সিরাজ সিকদার, মাহতাব ভাই এবং স্বোদর লেখক নিজেও হাত তুলে এই নামের পক্ষে ভোট দেন। সর্বসম্মতিক্রমে ঘোষিত হলো—আজ থেকে পার্টীর নামকরণ করা হলো "পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি"। করতালির মাধ্যমে আনন্দমুখর পরিবেশে শেষ হলো সম্মেলন।

একনজরে সেদিনের ঐতিহাসিক সম্মেলন

  • তারিখ: ৩ জুন, ১৯৭১ সাল (সকাল থেকে রাত)।

  • স্থান: ভীমরুলি হাইস্কুল, ঝালকাঠি-স্বরূপকাঠি এলাকা।

  • মূল নেতৃত্ব: কমরেড সিরাজ সিকদার (সালাম ভাই)।

  • পূর্বতন নাম: পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন (প্রতিষ্ঠা: ৮ জানুয়ারি, ১৯৬৮)।

  • গৃহীত নতুন নাম: পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি।

উপসংহার: ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী

সভা শেষে রাতের আঁধারে জগদীশের নৌকায় চড়ে যখন সিরাজ সিকদার এবং লেখক আতা গ্রামের শিবমন্দিরে ফিরে এলেন, তখন সিরাজ সিকদারের চোখে-মুখে ছিল এক পরম তৃপ্তি। তিনি উৎফুল্ল হয়ে লেখককে বলেছিলেন:

"কেমন হলো স্যার? আপনি পার্টীর নামকরণ করার ইতিহাসে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে রইলেন। বিপ্লবী হয়ে যান স্যার, বিপ্লবী হয়ে যান।"

একাত্তরের ৩ জুনের সেই নিভৃত রাতের সিদ্ধান্তটি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক রক্তাক্ত, বিতর্কিত এবং গভীর অধ্যায়ের সূচনা করেছিল, যার বীজ বোনা হয়েছিল পেয়ারাবাগানের সেই নিস্তব্ধ খালের পাড়ে, হারিকেনের আলোয়।

কাজী মোহাম্মদ আসিফ

About the Author

কাজী মোহাম্মদ আসিফ

Barisal sodor, Barisal, bangladah.

"সমতা, ন্যায়বিচার এবং মেহনতি মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে ও লিখতে পছন্দ করি। একটি বৈষম্যহীন এবং সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নে বিশ্বাসী।"

প্রোফাইল দেখুন

আলোচনায় অংশ নিন

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

সাইন ইন করুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast