ভোরবেলা। আজও সূর্য প্রথমে জাপানকে কিরণ দিয়াই তাহার দিন শুরু করিবে। জাপানের হিরোশিমা শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত একটি গ্রাম।বরাবরের মতোই আজ সূর্যের নরম আলোর স্পর্শ পাইয়া পক্ষীকুল মিষ্টি কূজন শুরু করিলো, বুভুক্ষু লজ্জাবতী গাছ তাহার পত্রসমূহ খাবার পাইবার আশায় মেলিয়া ধরিতে শুরু করিলো। ক্ষোপের ছিদ্র দিয়া আবছা রশ্মি প্রবেশ করিতেই বুড়ি সাচিকোর মোরগটি ডাকিয়া ডাকিয়া গাঁ মাথায় তুলিয়া তাহার দায়িত্ত্ব সমাপ্ত করিলো। সূর্যের রাজত্বে আসিয়া পড়িয়াছে বলিয়া পৃথিবীর সখা লুনা চলিয়া যাইতে লাগিলো। শান্ত গ্রাম। মনোরম গন্ধ। সকালের ঠান্ডা হাওয়া আসিয়া গাছগুলির মগডালে লাফাইয়া লাফাইয়া চলিয়া যাইতেছে, ফলে গাছগুলির ডাল ও পাতা এক অপরূপ-অগাণিতিক ও অযান্ত্রিক ছন্দে হেলিয়া দুলিয়া চলে - দেখিবার মতো দৃশ্য। এমনি অপরূপ স্বর্গীয় দৃশ্যের মধ্যে ও কে? ও - কে?
ও এক নগণ্য কৃষক। দুর্ভাগা বেচারা। ক্ষণজন্মা। তাহাদের হাজার বছরের ইতিহাস। উহারা মেথর হইতে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, শ্বেতাঙ্গ - কৃষ্ণাঙ্গ, বাম - ডান, মানুষ - অমানুষ সবার টেবিলেই আহার পৌঁছাইয়া এক অমার্জনীয় অপরাধ করিয়াছে, ফলে শাস্তিস্বরূপ সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ - বঞ্চনা, লাথি - ঘুষি ব্যতীত ভালো কিছুই পায়নাই। ঐ যে দেখা যাইতেছে, ঐ কৃষকের নাম কেনজি। সাতো কেনজি। এককালে সে টোকিও শহরে এক যন্ত্রাংশের কারখানায় কাজ করিতো। দেশে নাকি যুদ্ধ আসিয়াছে, তাই বছর দুয়েক আগে কারখানার ব্যবসায় বড় রকমের ক্ষতি হওয়ার দরুণ কেনজি সব আরো বহু শ্রমিককে তাহাদের কাজ ছাড়িতে হয়। এরপর টোকিও হইতে ফিরিয়া সে পৈতৃক জমিতে ফসল ফলাইয়া পুরোদস্তুর কৃষক হইয়া গিয়াছে। তাহার কাছে কারখানায় বদ্ধ কক্ষে বসিয়া একটানা একই কাজ করিয়া করিয়া একঘেয়ে হইয়া যাওয়ার তুলনায় কৃষিকাজ করা ঢের আনন্দের। কৃষিকাজে তাহাকে বদ্ধ কক্ষে বসিয়া থাকিতে হয় না। সে তাহার সন্তানতুল্য শস্যদের নিজেদের জন্য তিলে তিলে বড় ও হৃষ্টপুষ্ট করিয়া তোলে। দিনশেষে সে বলিতে পারে, "এই ফসল আমার।" ইহাতে অন্যরকম এক মানবিক আনন্দ নিহিত রহিয়াছে। কিন্তু কারখানায় সে বলিতে পারেনা যে এই উৎপাদটি তাহার। একই কাজ বারংবার করাতে বিরক্তি ব্যতিত অন্য কিছুই নাই।
কেনজি প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় ওঠে। প্রাতঃকাজ সারিয়া ১৫-২০ মিনিটের ভেতরে ছেড়া ময়লা জুতাটি পরিধান করিয়া, কাধে লাঙ্গল লইয়া মাঠে যাইয়া উপস্থিত হয়। বেলা দশটার দিকে ফিরিয়া আসিয়া সকালের নাস্তা সারে। আবার দুপুরে সূর্য যখন শীর্ষে চড়িয়া তাহার মতো কৃষক ও শ্রমিকদের অত্যাচার করিতো, তখন কেনজি ঘরে আসিয়া খানিকক্ষণ দুপুরের আহার সারিয়া নিদ্রা যাইতো। সূর্য যখন আবার তেজ কমাইয়া পশ্চিম গগনের প্রথমাংশে হেলিয়া পড়ে, তখন আবার মাঠে যাইয়া কাজ শুরু করে। কাজ করিতে করিতে একেবারে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরিয়া আসে। যখন সে মাঠে কাজ করে, তখন শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক চাপ আসিয়া জোটে। দেশে যুদ্ধ। বাড়তি দাম। কেনজি নাহয় খাদ্যশস্য নিজে উৎপাদন করিতে পারে, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যতো সে আর তৈরি করিতে পারে না। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকাইয়া ভাবে, এই সূর্যতো প্রত্যেকদিন একইভাবে ওঠে। যুদ্ধের দিনেও ওঠে, শান্তির দিনেও ওঠে। পাখি প্রতিদিন গান গায়। নদী প্রতিদিন জল বহন করিয়া সাগরের নিকট জমা দেয়। মানুষও তো প্রকৃতির অংশ - মানুষ কেন তাহার মনুষ্যত্ব ধ্রুব রাখিতে পারে না? সামনের দিন কিভাবে কাটাইবে? এমনভাবে চলিতে থাকিলে শুধুমাত্র তাহার উৎপাদিত শস্যই খাইতে হইবে। কিন্তু ইহাতো কোনো সমাধান নহে। এই হইলো কেনজির দৈনিক রুটিন।
এই যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক ধ্বসের ভেতরে দাড়াইয়াও কৃষিকাজ করিয়া যাহা আয় হয়, তাহাতে খাইয়া-পড়িয়া কোনো রকম পরের বছরের চাষের মৌসুম পর্যন্ত চলিয়া যায়। সব টানা টানা - মাপা মাপা।
কেনজির পরিবারে তাহাকে নিয়া মোট চারজন। কেনজি নিজে, মেয়ে হিনা, ছেলে কাইতো, এবং স্ত্রী ইউনা। হিনা ও কাইতো যমজ। তাহাদের বয়স ৭ হইলো। মিশুক, দুর্দম, জিজ্ঞাসু। কেনজি - ইউনা দম্পতির ঘর এরাই আলো ও জীবন্ত করিয়া রাখে। ওটা কি, এটা কেন হয়, কিভাবে হয় এমন নানা প্রশ্ন করিয়া তাহারা তাহাদের মা বাবাকে ব্যস্ত করিয়া রাখে। কিছু উত্তর তাহারা দিতে পারে, কিছু পারেনা।
সেদিন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পাতায় সেদিন ৬ আগস্ট, ১৯৪৫। জাপানে গ্রীষ্মকাল। সোমবার। হিনা ও কাইতোর জন্মদিন। কেনজি সিদ্ধান্ত নিয়াছে আজ সে মাঠে গরহাজির থাকিবে। সারাটা দিন আজ পরিবারকেই দিবে। ভাই - বোন সপ্তাহখানেক পূর্বেই বায়না করিয়াছে যে এ বছর তাহাদের জন্মদিন পালন করিতেই হইবে। ইউনো ও কেনজি প্রথমদিকে রাজি না হইলেও প্রচন্ড বায়নার জন্য হার মানিয়াছে। ঠিক হইয়াছে যে সকাল সকালই জন্মদিনের সব অনুষ্ঠান সমাপ্ত করিয়া পুরো পরিবার হিরোশিমা দুর্গ দেখিতে যাইবে - সুন্দর একটি দিন কাটাইবে। খুব ভোরে উঠিয়া কাজে লাগিয়া গিয়াছে। ঘরের সাজসজ্জা, খাদ্য তৈরি, পরিবেশন আরো নানান কাজ। খাবারের তালিকায় রহিয়াছে হিনোমারু বেনটো, সাতসুমাইমো, ওনিগিরি, জুকেমোনো, কাজু আরো কত কি!
রান্না শেষ হইতে হইতে সূর্য সম্পূর্নভাবে পূর্বাকাশে উঠিয়াছে। বাহিরে গাঁয়ের অন্যান্য লোকেদের আওয়াজ পাওয়া যায়। মানুষ নামিয়াছে। গৃহপালিত পশু মাঠে চরার উদ্দেশ্যে রাখালের নির্দেশমোতাবেক চলিতেছে, রান্নাঘরের জানালা দিয়া সূর্যের একটুকরো সোনালী আলো মেঝেতে পড়িয়া চকচক করে, জনজীবন সচল হইয়া উঠিয়াছে। খুবই সাধারণ একটি দিন আরম্ভ হইয়াছে - জাপানের সকাল।
হিনা ও কাইতোর ঘুম ভাঙ্গিলে তাহারা যখন দেখিলো তাহাদের জন্মদিন উদ্যাপনের ঘনঘটা চলিতেছে, তখন তাহাদের খুশি আর দেখে কে! ঘর হইতে একদৌড়ে তাহারা তাহাদের বন্ধুদের নিকট খবরটি পৌঁছাইয়া দিতে ছুটিয়া গেলো। জন্মদিন উদ্যাপন প্রতিটি শিশুর নিকটই স্বভাবতই আনন্দের। কিন্তু তাহাদের আনন্দ আজ একটু বেশিই ছিলো যখন তাহারা শুনিলো আজ তাহারা হিরোশিমা দুর্গেও যাইবে। খানিকক্ষণ পরে দুই ভাইবোন ফিরিয়া আসিলো, সঙ্গে ৩-৪ জন বন্ধু সহ। তাহারা সংরক্ষিত সবচেয়ে ভালো কাপড়টি পড়িলো, হাসিলো, খেলিলো।
রান্নাঘর হইতে ডাক আসিলো। রান্না হইয়াছে। তাহারা সকলে যখন টেবিলে বসিলো, সামনে খাবার আসিলো, তখন সকাল আটটা পনেরো। কাইতো একবার তাহার বন্ধুর জন্মদিনে দেখিয়েছিলো উহারা ফুঁ দিয়া মোমবাতি নিভাইয়া অনুষ্ঠানের সূচনা করিয়াছিলো। সে ঘটনা যুদ্ধের আগের। এই ব্যাপার ইউনোকে জানাইলে তিনি কঠোরভাবে ধমক দিয়া জানাইয়া দেন যে এই মুহূর্তে মোমবাতি নাই, তিনি জোগাড় করিতে পারিবেন না। অগত্যা কাইতো মন খারাপ করিয়া টেবিল ছাড়িয়া দৌড়ে দরজা থেকে বের হইয়া গেল। কেহ আর সে বেচারার দিকে নজর দিলো না। মন খারাপ থাকিলে সে শস্যের ঘরের নিচের তলায় গিয়ে বসে থাকে। খানিকটা মাটির নিচে। সেদিনও সে সেইখানে গিয়া কাঁদিতে লাগিলো।
সবাই যখন টেবিলে আবারো গোল হইয়া বসিলো, জন্মদিনে গান গাইয়া খাবার একযোগে মুখে দিবে, পরের নিমেষেই গগনে এক বিরাট কান ফাটা আওয়াজ শোনা গেলো। অমানুষিক তাহা, তীব্র, তীক্ষ্ণ, বিভীষিকাময়। প্রতিবর্তি ক্রিয়ায় ঘরের সবাই কানে হাত দিলো। সবার মুখেই ভয় আর আতঙ্কের ছাপ। ইউনা ভাবিতেছিলো হয়তো কোনো জঙ্গিবিমান আশেপাশে বিধ্বস্ত হইয়াছে যতক্ষণ না তাহারা দেখিলো এক তীব্র আলো ও ধ্বংসাত্মক ঢেউ তাহাদের ঘর ঘিরিয়া ফেলিয়াছে। আলো দেখিলে প্রাণীরা আনন্দিত হয়, আলো আশা দেখায়। কিন্তু এ আলো হইতেছে মৃত্যুর দূত। এ আলো তাহাদের সব আশ কাড়িয়া লইতে আসিয়াছে, মৃত্যুকে সখি করিয়া আনিয়াছে। কয়েক নিমেষের ভেতরেই জাপানের হিরোশিমা শহরের হাজার হাজার নিরীহ নাগরিক অজ্ঞাতে ছায়া ও ছাই হইয়া নিঃশেষ হইয়া গেলো। তাহারা নিষ্ঠুর রাজনীতির শিকার, অস্ত্র ব্যবসায়ীদের শিকার, ওপেনহাইমারের শিকার, সাম্রাজ্যবাদের শিকার, সর্বোপরি কুবিজ্ঞানের শিকার। কেনজি, ইউনা, হিনার মতো আরো বহু মানুষ জানিতেই পারিলোনা কেন তাহাদের আশা, তাহাদের জীবন কাড়িয়া লওয়া হইলো?
কয়েকদিন পরে যখন উদ্ধার অভিযান চালানো হইয়াছিলো, কেনজি পরিবার সহ ওই গ্রামের কারো কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নাই। সেদিন মোমবাতি না থাকায় কাইতো বাঁচিয়া গিয়াছিলো। কাইতোকে অজ্ঞান অবস্থায় সেই শস্য ঘরের নিচের তলায় কাঠের নিচে চাপা পড়া অবস্থায় পাওয়া যায়। ওই এক গাঁ হইতে শুধুমাত্র কাইতোকেই জীবিত পাওয়া যায়। কেনজির ভাঙা-পোড়া কাঠের ঘর তন্ন তন্ন করিয়া যখন দমকল কর্মীরা কেনজিদের জীবনের কোনো স্পন্দন খুঁজিতে ব্যস্ত, তখন তাহাদের অগোচরে এক অর্ধগলিত, বিকৃত কাঁটাচামচ কাঠের নিচ হইতে উন্মুক্ত হইয়া দমকল কর্মীদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে কহিলো, "আমি ইস্পাতের চামচ যখন গলিয়া যাই, সেই তাপে মানুষ টিকিবে কোন ছাই! মানুষকে ভালোবাসিতে শেখ, ভালোবাসাকে যথার্থরূপে ব্যবহার করিতে শেখ। তবে এই অসুস্থ্য পৃথিবী পুনঃরায় ভরিয়া উঠিবে সবুজে শান্তিতে। অন্যথায় মানুষ হইয়া উঠিবে পৃথিবীর ক্যান্সার"। এক দমকল কর্মী অজ্ঞাতে তাহাকে বুটের নিচে মাড়াইয়া, কণ্ঠ রোধ করিয়া চলিয়া গেলো - পরের অভিযানে।
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন