বুর্জোয়া ইতিহাসের কাঠগড়ায় ইতিহাস সবসময় বিজয়ীদের দ্বারা লিখিত হয় এ কথা যেমন সত্য, তেমনি সত্য হলো ইতিহাস সবসময় 'এলিট' বা উচ্চশ্রেণির সুবিধার্থেই লেখা হয়।
ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাস পড়লে মনে হয়, এটি কেবল গুটিকয়েক উচ্চশিক্ষিত 'ভদ্রলোক' নেতার মস্তিষ্কপ্রসূত একটি রোমান্টিক লড়াই। কিন্তু যারা বাস্তবে নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, সেই তরুণদের আমরা কেবলই 'আবেগী' বা 'বিপথগামী' তকমা দিয়ে আড়াল করে রেখেছি। ইতিহাসের পাতায় তাদের গল্পগুলোই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। আজ এমন দুই হারানো বিপ্লবীর কথা বলব, বয়সে যারা ছিলেন তরুণ, কিন্তু সাহসে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন গোটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, প্রফুল্ল চাকি এবং বসন্ত কুমার বিশ্বাস। ভারী রাজনৈতিক তত্ত্বের বাইরে গিয়ে আজ বরং এই দুই তরুণের জীবনের গল্প এবং তাদের মধ্যকার এক অদৃশ্য যোগসূত্রের কথা বলি।
প্রফুল্ল চাকি
প্রফুল্ল চাকির জন্ম ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর, বর্তমান বাংলাদেশের বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার ইউনিয়নে। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল, অত্যাচারী ব্রিটিশ বিচারক কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে মুজাফফরপুরে ক্ষুদিরাম বসুর সাথে বোমা ছুঁড়েছিলেন প্রফুল্ল চাকি। দুর্ভাগ্যবশত কিংসফোর্ড বেঁচে যান। এরপর শুরু হয় পুলিশের তাড়া। ক্ষুদিরাম ধরা পড়লেও, প্রফুল্ল চাকি ব্রিটিশদের হাতে ধরা দেননি। মোকামা ঘাটে পুলিশের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে নিজের রিভলবারের শেষ গুলিতে আত্মাহুতি দেন তিনি। একটি পরাধীন দেশে একজন তরুণের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করেছিল, সত্যিকারের বিপ্লবী কখনো রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে মাথা নত করে না।
বসন্ত কুমার বিশ্বাস
প্রফুল্ল চাকির মৃত্যুর ঠিক কয়েক বছর পরের ঘটনা। ১৯১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর। ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ প্রবল অহংকারে হাতির পিঠে চড়ে দিল্লিতে প্রবেশ করছেন। চারদিকে কড়া নিরাপত্তা। এর মাঝেই মেয়েদের ছদ্মবেশে হার্ডিঞ্জের ওপর হাতবোমা ছুঁড়লেন এক তরুণ। তিনি বসন্ত কুমার বিশ্বাস। নদীয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামের এই ছেলেটি সাম্রাজ্যবাদের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে যে দুঃসাহসিক আক্রমণ করেছিলেন, তা ব্রিটিশদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে আম্বালা জেলে যখন তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর।
এক অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা দুই জীবন
ইতিহাসের টাইমলাইন ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রফুল্ল চাকি ও বসন্ত কুমার বিশ্বাসের কখনো সরাসরি দেখা হয়নি। প্রফুল্ল চাকির আত্মাহুতির সময় বসন্ত ছিলেন একদমই কিশোর। কিন্তু তাদের দুজনের মধ্যে একটি দারুণ আদর্শিক ও আত্মিক সম্পর্ক ছিল। তারা দুজনেই ছিলেন বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী গোষ্ঠী 'যুগান্তর'-এর একই স্রোতের ফসল।
প্রফুল্ল চাকির মৃত্যুর পর বিপ্লবীদের মনে যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, বিপ্লবী রাসবিহারী বসু সেই স্ফুলিঙ্গকেই কাজে লাগিয়েছিলেন বসন্ত কুমার বিশ্বাসকে প্রস্তুত করতে। প্রফুল্ল চাকি যে অসমাপ্ত লড়াইয়ের ময়দান রেখে গিয়েছিলেন, বসন্ত কুমার বিশ্বাস যেন ঠিক সেখান থেকেই বিপ্লবের মশালটি হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তাদের দুজনেরই শেকড় ছিল বাংলার সাধারণ ও প্রান্তিক পরিবারে। দুজনেই খুব কম বয়সে চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় মিল হলো, দুজনেই জানতেন এই পথ থেকে জীবিত ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই, তবু হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন।
শেষ কথা
মূলধারার নেতারা যখন ব্রিটিশদের সাথে আপস-মীমাংসার রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, তখন প্রফুল্ল চাকি আর বসন্ত কুমার বিশ্বাসের মতো তরুণেরাই নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার পথ তৈরি করেছিলেন। আজ আমরা হয়তো তাদের ভুলে গেছি, কিন্তু শোষণের বিরুদ্ধে তাদের ছুঁড়ে দেওয়া বোমার আওয়াজ এখনো ইতিহাসের পাতায় কান পাতলে শোনা যায়। বাংলার এই দুই বীর সন্তান আমাদের শিখিয়ে গেছেন - লড়াইটা বয়সের নয়, লড়াইটা সাহসের।
About the Author
আতিকুর রহমান অন্তর
লেখক এবং ডিজিটাল মার্কেটিং প্রফেশনাল
আমি আতিকুর রহমান অন্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী। রাষ্ট্র, সমাজ, লোকসংস্কৃতি, ধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে মুক্তালাপ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করাই আমার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য।
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন