Searching…

অ্যালগরিদম, অশ্রু এবং পুঁজিবাদ

একজন অন্ধ মানুষ দেখতে পেল। কিন্তু কেন সে এতদিন দেখতে পায়নি, সেই প্রশ্ন কি অদৃশ্য হয়ে গেল?

Talha Mohammad Chowdhury
1 11 মিনিট লাগতে পারে পড়তে
অ্যালগরিদম, অশ্রু এবং পুঁজিবাদ

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে একজন মানুষের ক্ষুধা, অসুস্থতা, গৃহহীনতা কিংবা বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুধু সামাজিক বাস্তবতা নয়, একইসঙ্গে একটি সম্ভাব্য ভিডিওও। একজন শিশু স্কুলে যেতে পারছে না, একজন শ্রমিক চিকিৎসা করাতে পারছে না, একজন পরিবার ঋণের বোঝায় ডুবে আছে, এসব দৃশ্য একসময় সংবাদপত্রের রিপোর্ট, গবেষণার বিষয় বা রাজনৈতিক আন্দোলনের স্লোগান ছিল। আজ এগুলো কোটি ভিউয়ের ইউটিউব ভিডিওও হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সত্যিই মানবিকতার এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি, নাকি পুঁজিবাদ মানবিকতাকেও নিজের বাজারে নিয়ে এসেছে?

এই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন MrBeast এর মতো ইনফ্লুয়েন্সাররা। তিনি এক হাজার মানুষের চোখের অপারেশনের খরচ বহন করেন, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে শতাধিক কুয়ো খননের উদ্যোগ নেন, গৃহহীন মানুষকে বাড়ি কিনে দেন, দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেন। কোটি কোটি মানুষ এসব ভিডিও দেখে আবেগাপ্লুত হয়। কিন্তু এখানেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন জন্ম নেয়। যদি কোনো মানুষ চিকিৎসা না পায়, সেটি কি মূলত একজন ইউটিউবারের সমাধান করার বিষয়? নাকি সেটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা? যদি কোনো শিশুর খাবারের ব্যবস্থা একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সদিচ্ছার উপর নির্ভর করে, তাহলে আমরা আসলে কোন সমাজে বাস করছি? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই সাহায্যগুলোকে আমরা যেভাবে দেখি, সেই দেখার প্রক্রিয়াটিও কি কোনো অর্থনৈতিক কাঠামোর দ্বারা নির্ধারিত?

বামপন্থী রাজনীতির একটি পুরনো যুক্তি হলো, দানশীলতা প্রায়ই সমস্যার কারণকে আড়াল করে সমস্যার লক্ষণকে সামনে নিয়ে আসে। একজন শ্রমিক ক্ষুধার্ত কেন? একজন মানুষ গৃহহীন কেন? একজন রোগী চিকিৎসা পাচ্ছে না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর সাধারণত অর্থনৈতিক কাঠামো, সম্পদের বণ্টন, রাষ্ট্রের নীতি এবং শ্রেণিসম্পর্কের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু যখন ক্যামেরা চালু হয়, তখন সেই কাঠামোগত প্রশ্নগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। দর্শক আর জানতে চায় না কেন এই মানুষটি গরিব; দর্শক জানতে চায় কে তাকে সাহায্য করল। ফলে দারিদ্র্য একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে নৈতিক আবেগের প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়। শ্রেণি-সম্পর্কের জায়গা দখল করে ব্যক্তিগত উদারতা; সামাজিক অধিকারকে প্রতিস্থাপন করে ব্যক্তিগত দান।

এখানে হয়তো কেউ আপত্তি তুলতে পারেন। একজন মানুষ বাস্তবে সাহায্য পাচ্ছে, তাহলে সমস্যা কোথায়? এই আপত্তি অযৌক্তিক নয়। একজন ক্ষুধার্ত মানুষ খাবার পেল, একজন রোগী চিকিৎসা পেল এগুলো বাস্তব পরিবর্তন। কিন্তু বামপন্থী সমালোচনা কখনোই কেবল সাহায্যের বিরুদ্ধে নয়। বরং প্রশ্নটি সাহায্যের রূপ নিয়ে। যদি একটি সমাজে হাজার মানুষ চিকিৎসা না পায়, আর তাদের মধ্যে কিছু মানুষকে ক্যামেরার সামনে চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাহলে কি আমরা সমস্যার সমাধান করছি, নাকি সমস্যার সবচেয়ে আবেগপ্রবণ অংশটুকুকে দর্শনীয় করে তুলছি? যখন কোনো মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম একটি কাহিনিতে রূপান্তরিত হয়, তখন সেই সংগ্রাম আর কেবল মানবিক বাস্তবতা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে একটি বর্ণনামূলক সম্পদ, একটি কনটেন্ট অ্যাসেট।

পুঁজিবাদের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রায় সবকিছুকেই পণ্যে পরিণত করতে পারে। শ্রম, সময়, শিল্প, ভালোবাসা সবকিছুই বাজারের অংশ হয়ে যেতে পারে। ডিজিটাল যুগে এই তালিকায় যোগ হয়েছে মনোযোগ। এখন মনোযোগ নিজেই একটি পণ্য। ভিউ, ক্লিক, শেয়ার এবং এনগেজমেন্ট অর্থে রূপান্তরিত হয়। আর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য মানুষের কষ্টের চেয়ে শক্তিশালী উপাদান খুব কমই আছে। ফলে দরিদ্রতা আর কেবল দরিদ্রতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আবেগ উৎপাদন করে, আবেগ মনোযোগ উৎপাদন করে, আর মনোযোগ মুনাফা উৎপাদন করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি শুধুমাত্র দর্শকের পছন্দের ফল নয়; এর পেছনে কাজ করে প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমিক কাঠামো। ইউটিউবের অ্যালগরিদম সাধারণত সেই কনটেন্টকেই অগ্রাধিকার দেয় যা দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকের মনোযোগ আটকে রাখতে পারে। একটি বিশ্লেষণধর্মী ভিডিও যদি ব্যাখ্যা করে কেন স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারিকরণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারকে সংকুচিত করছে, সেটি তুলনামূলকভাবে কম ছড়াবে। কিন্তু “অন্ধ মানুষ প্রথমবার পৃথিবী দেখল” এই ধরনের নাটকীয়, আবেগঘন এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ামূলক কনটেন্ট দ্রুত কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। ফলে কনটেন্ট নির্মাতারা এক ধরনের অ্যালগরিদমিক চাপের মধ্যে পড়েন, যেখানে কাঠামোগত কারণ বিশ্লেষণের চেয়ে মানবিক ট্র্যাজেডির দৃশ্যমান প্রদর্শন বেশি লাভজনক। এই অর্থে ডিজিটাল পুঁজিবাদ শুধু দারিদ্র্যকে ব্যবহারই করে না; বরং দারিদ্র্যকে নির্দিষ্ট এক নান্দনিক রূপে উপস্থাপন করতেও উৎসাহিত করে।

এই প্রক্রিয়ার একটি গভীর মানবিক মূল্যও রয়েছে। অধিকাংশ ভাইরাল চ্যারিটি ভিডিওর থাম্বনেইল লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে দরিদ্র মানুষের হাসির চেয়ে কান্না বেশি গুরুত্বপূর্ণ, মর্যাদার চেয়ে অসহায়ত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি মুখের ক্লোজ-আপ, চোখের জল, ভাঙা ঘর, অসহায় শিশু এসব কেবল তথ্য নয়; এগুলো দর্শকের আবেগ সক্রিয় করার উপকরণ। কিন্তু সাহায্য পাওয়ার পূর্বশর্ত যদি হয়ে দাঁড়ায় নিজের দুর্দশাকে সর্বসমক্ষে প্রদর্শন করা, তাহলে প্রশ্ন উঠবে: একজন মানুষের মর্যাদার মূল্য কত? একজন ক্ষুধার্ত মানুষ কি কেবল সাহায্যের জন্য নিজের ব্যক্তিগত দুর্ভোগকে বিশ্বব্যাপী প্রদর্শনের অনুমতি দিতে বাধ্য হবে? এখানে শোষণ আর অর্থনৈতিক বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি প্রতীকী ও মানসিক স্তরেও প্রবেশ করে। মানুষকে তার শ্রম নয়, তার দুর্দশা প্রদর্শনের মাধ্যমেও মূল্য উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়। এই কারণেই অনেক সমালোচক “poverty porn” ধারণাটিকে গুরুত্ব দেন। কারণ সমস্যাটি শুধু দরিদ্রতা নয়; সমস্যাটি দরিদ্রতার প্রদর্শনকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করা।

এই অবস্থাকে বৃহত্তরভাবে “ফিলানথ্রো-ক্যাপিটালিজম” বলেও ব্যাখ্যা করা যায়। আধুনিক পুঁজিবাদে দানশীলতা আর কেবল নৈতিক কার্যকলাপ নয়; এটি একটি ব্যবসায়িক মডেলও। ঐতিহাসিকভাবে বড় করপোরেশন ও বিলিয়নিয়াররা ফাউন্ডেশন, ট্রাস্ট বা দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে একদিকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে, অন্যদিকে কর সুবিধা ও রাজনৈতিক প্রভাবও নিশ্চিত করেছে। ডিজিটাল যুগে সেই মডেল নতুন রূপ পেয়েছে। দান এখন শুধু দান নয়; এটি ব্র্যান্ড নির্মাণ, দর্শক বৃদ্ধি, আয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজারমূল্য বৃদ্ধির অংশ। যখন একটি দাতব্য উদ্যোগ একইসঙ্গে একটি জনপ্রিয় কনটেন্ট ব্র্যান্ডে পরিণত হয়, তখন মানবিকতা ও ব্যবসার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়। দানের অর্থ বাস্তব; কিন্তু দানের অর্থনৈতিক রিটার্নও বাস্তব। ফলে প্রশ্নটি দাঁড়ায় আমরা কি মানবিক সহায়তা দেখছি, নাকি মানবিক সহায়তার সফল বাজারীকরণ দেখছি?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দর্শকের অবস্থান। আমরা কেন এসব ভিডিও দেখে কাঁদি? কেন আমরা ভিডিওর শেষে স্বস্তি অনুভব করি? সম্ভবত কারণ পুঁজিবাদী সমাজে বসবাসকারী মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত সামাজিক বৈষম্যের সাক্ষী হই। আমরা জানি পৃথিবীতে ক্ষুধা আছে, গৃহহীনতা আছে, চিকিৎসাবঞ্চনা আছে। কিন্তু সেই বাস্তবতাগুলো এত বিশাল যে ব্যক্তিগতভাবে আমরা নিজেকে অসহায় অনুভব করি। এই অবস্থায় একটি ভিডিও আমাদের মানসিক মুক্তি দেয়। আমরা দেখি সমস্যার অন্তত একটি সুখী সমাপ্তি হয়েছে। আমরা একটি লাইক দিই, একটি মন্তব্য করি, ভিডিওটি শেয়ার করি, এবং অবচেতনভাবে অনুভব করি যে আমরাও কোনোভাবে ভালো কিছুর অংশ হয়েছি। এই অনুভূতিকে “ফিল-গুড ক্যাপিটালিজম” বলা যেতে পারে, যেখানে সামাজিক পরিবর্তনের পরিবর্তে সামাজিক পরিবর্তনের অনুভূতি বিক্রি করা হয়। ফলত নাগরিক ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সত্তা থেকে আবেগপ্রবণ দর্শকে রূপান্তরিত হয়। সংগঠন, আন্দোলন, নীতিগত পরিবর্তন বা কাঠামোগত সংগ্রামের পরিবর্তে সে ভোগ করে মানবিকতার নাট্যরূপ।

এই প্রক্রিয়াটি নতুন নয়। বহু এনজিও বহু বছর ধরে ক্ষুধার্ত শিশুদের ছবি ব্যবহার করে তহবিল সংগ্রহ করেছে। সংবাদমাধ্যম দুর্যোগের ছবি ব্যবহার করে দর্শক টেনেছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সম্পর্ককে আরও ব্যক্তিগত, আরও তাৎক্ষণিক এবং আরও লাভজনক করে তুলেছে। এখন একজন ব্যক্তি নিজেই একটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান। একজন ইনফ্লুয়েন্সার একইসঙ্গে সাংবাদিক, দাতা, ব্র্যান্ড এবং উদ্যোক্তা। ফলে সাহায্য ও ব্যবসার মধ্যকার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো অন্যত্র। আমরা কেন MrBeast এর ভিডিও দেখে এত আবেগপ্রবণ হই? কারণ আমরা এমন একটি পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে মৌলিক মানবিক চাহিদাগুলো পূরণ হওয়াকে স্বাভাবিক বলে মনে করি না। যখন একজন অন্ধ মানুষ চিকিৎসা পায়, আমরা বিস্মিত হই। যখন একজন গৃহহীন মানুষ বাড়ি পায়, আমরা কাঁদি। কিন্তু হয়তো আমাদের বিস্মিত হওয়া উচিত ছিল অন্য কারণে! কেন এই মানুষগুলো শুরুতেই চিকিৎসা বা বাসস্থানের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল?

এখানেই দানশীলতা ও অধিকারের পার্থক্য। অধিকার দাবি করা যায়; দান চাওয়া যায়। অধিকার নাগরিকের প্রাপ্য; দান দাতার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। বামপন্থী রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে মানুষের জীবনকে দানের উপর নয়, অধিকারের উপর প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। তাই প্রশ্নটি কখনোই “MrBeast ভালো না খারাপ?” নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি এমন একটি সমাজ কল্পনা করতে পারি যেখানে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কোনো ইউটিউবারের প্রয়োজন হবে না?

তবু একটা অস্বস্তিকর সত্য রয়ে যায়। সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু বিকল্পটা কী?

ধরা যাক, একজন মানুষ সত্যিই অন্ধ। বহু বছর ধরে চিকিৎসার অভাবে সে দেখতে পাচ্ছে না। রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়ায়নি। স্বাস্থ্যব্যবস্থা তাকে বাঁচায়নি। কোনো রাজনৈতিক দল তার জন্য আন্দোলন করেনি। কোনো বিপ্লব তার দরজায় পৌঁছায়নি। তারপর একদিন একটি ইউটিউব চ্যানেল এসে তার অপারেশনের খরচ বহন করল, এবং সে আবার দেখতে শুরু করল।

এই মানুষটিকে কী বলা হবে? "অপেক্ষা করো, আমরা আগে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার করব, তারপর তোমার চিকিৎসার প্রশ্ন আসবে?" ইতিহাসে খুব কম মানুষই কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে পেরেছে। ক্ষুধার্ত মানুষ ভবিষ্যতের সমাজতন্ত্র খেতে পারে না। অসুস্থ মানুষ আগামী প্রজন্মের বিপ্লব দিয়ে চিকিৎসা করাতে পারে না। এখানেই পুরো বিতর্কের সবচেয়ে নির্মম দিকটি লুকিয়ে আছে।

সম্ভবত এ কারণেই MrBeast-এর ভিডিওগুলো এত জনপ্রিয়। মানুষ শুধু একজন ইউটিউবারকে দেখে না; মানুষ দেখে একটি ব্যর্থ পৃথিবীর ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অলৌকিকতা। দর্শক জানে সমস্যাটা এখনও রয়ে গেছে, তবুও কয়েক মিনিটের জন্য সে অন্তত দেখতে পায় যে একজন মানুষ বেঁচে গেল, একজন পরিবার ঘর পেল, একজন শিশু খাবার পেল। এই আবেগকে পুরোপুরি ভণ্ডামি বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন ফিরে আসে। যদি কোনো অন্ধ মানুষের চোখের আলো ফিরে পাওয়া আমাদের কাছে অলৌকিক মনে হয়, তাহলে কি সেটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি নয়? একটি সভ্য সমাজে চিকিৎসা অলৌকিকতা হওয়ার কথা নয়; সেটি হওয়ার কথা ছিল স্বাভাবিক অধিকার। একটি শিশুর খাবার পাওয়া সংবাদ হওয়ার কথা নয়; সেটি হওয়ার কথা ছিল দৈনন্দিন বাস্তবতা। আমরা এমন এক পৃথিবীতে এতদিন বাস করেছি যেখানে মৌলিক অধিকারগুলো এতটাই অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে যে, সেগুলো পূরণ হলেই আমরা সেটিকে মানবতার বিজয় হিসেবে উদযাপন করি।

সমস্যাটা তাই MrBeast নন। সমস্যা হলো এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে MrBeast-এর প্রয়োজন হয়।

আর সেখানেই বামপন্থী সমালোচনার মূল প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে। একজন ইউটিউবারের সাহায্য বাস্তব হতে পারে, তার মানবিকতাও আন্তরিক হতে পারে। কিন্তু একটি সমাজকে কি ব্যক্তিগত সদিচ্ছার উপর দাঁড় করানো যায়? কোনো মানুষের চিকিৎসা, খাদ্য বা বাসস্থানের অধিকার কি একজন দাতার মেজাজ, জনপ্রিয়তা বা অ্যালগরিদমিক সাফল্যের উপর নির্ভর করতে পারে?

ডিজিটাল পুঁজিবাদের যুগে হয়তো এটাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন। কারণ আজ আমরা শুধু দারিদ্র্য দেখছি না; আমরা দারিদ্র্যের উপস্থাপনাও দেখছি। আমরা শুধু মানবিকতা দেখছি না; আমরা মানবিকতার বাজারীকরণও দেখছি। আর যখন কোনো সমাজে মানুষের কষ্ট একইসঙ্গে ট্র্যাজেডি এবং কনটেন্টে পরিণত হয়, তখন আমাদের জিজ্ঞাসা করতেই হয়, আমরা কি সত্যিই সমস্যার সমাধান দেখছি, নাকি সমস্যার সবচেয়ে লাভজনক সংস্করণটি দেখছি?

Talha Mohammad Chowdhury

About the Author

Talha Mohammad Chowdhury

Reader, writer, and observer. Interested in politics, history, economics, satire, and the contradictions of modern society. Here to learn, question, and contribute to meaningful discussions.

প্রোফাইল দেখুন

আলোচনায় অংশ নিন

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

সাইন ইন করুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast