ভোর সাড়ে ৫টা। বহদ্দারহাটের আকাশটায় তখনো রাতের কালচে ছায়া লেপ্টে আছে। চারপাশের চায়ের দোকানগুলো সবেমাত্র চুলোয় কয়লা দিচ্ছে। এই আবছা অন্ধকারে, কুয়াশা আর ধুলোর মিশ্রণ গায়ে মেখে মুরাদপুর মোড়ের দিকে প্রায় দৌড়াচ্ছে ২০ বছর বয়সী আছমা খাতুন। তার গন্তব্য কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকার একটা তৈরি পোশাক কারখানা। গত রাতে যখন সে ওভারটাইম শেষ করে বাসায় ফিরেছিল, ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সাড়ে ১২টা। মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টা চোখ দুটো বোজার সুযোগ পেয়েছে সে। এর মধ্যেই রান্না করা, ঘর গোছানো আর নিজের শরীরটাকে টেনে তোলা—সব শেষ করে আবার এই অন্তহীন ছুটে চলা।
এক মিনিট দেরি হলে পুরো দিনের হাজিরা বোনাসটা কাটা যাবে। আর পাঁচ মিনিট দেরি হলে গেটের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সিকিউরিটি গার্ড আর লাইনের ইনচার্জের অকথ্য, বিষাক্ত গালিগালাজ শুনতে হবে, যা একটা ২০ বছরের মেয়ের আত্মসম্মানকে প্রতিদিন চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। যে হাতগুলো দিয়ে আছমা প্রতিদিন ইউরোপ-আমেরিকার নামী ব্র্যান্ডের লাখ টাকা দামের জ্যাকেট আর শার্ট সেলাই করে, মাস শেষে সেই হাতে যে কয়টা টাকা জোটে, তা দিয়ে এই চট্টগ্রামের বুকে মাথা গোঁজার একটা স্যাঁতসেঁতে চালার ভাড়া, মায়ের ওষুধের খরচ আর চাল-ডালের হিসাব মেলাতেই তার দম বন্ধ হয়ে আসে।
আছমার এই ছুটে চলা কোনো বিচ্ছিন্ন গল্প নয়। এটি চট্টগ্রামের জিইসি, খুলশী বা নাসিরাবাদের বিলাসবহুল বহুতল ভবনে বসে থাকা গার্মেন্টস মালিকদের বিপুল সম্পত্তি, প্রাডো গাড়ি আর অঢেল বৈভবের পেছনের আসল, নির্মম এবং রক্তাক্ত সত্য।
উদ্বৃত্ত মূল্য এবং পুঁজির আগ্রাসন: কার শ্রম, কার সম্পদ?
বামপন্থী চিন্তাধারার মূল ভিত্তিটাই হলো মানুষের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন এবং মানুষের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া। কার্ল মার্ক্স আজ থেকে দেড়শ বছর আগে যে উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব দিয়েছিলেন, চট্টগ্রামের গার্মেন্টস সেক্টর আজ তার সবচেয়ে নিখুঁত এবং জীবন্ত গবেষণাগার।
একটি পোশাকের জন্মপ্রক্রিয়াটা লক্ষ্য করলেই শোষণের এই নগ্ন রূপটি পরিষ্কার হয়ে যায়। কালুরঘাট বা সিইপিজেডের (CEPZ) একটা অন্ধকার, গাদাগাদি ফ্যাক্টরি রুমে যে কোটটি তৈরি করতে কাপড়ের দাম, সুতো, বোতাম, বিদ্যুৎ বিল আর শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে মোট খরচ হয় হয়তো ১,০০০ টাকা, সেই একই কোট চট্টগ্রামের নামী শোরুমগুলোতে বা বিদেশের কোনো শপিং মলে বিক্রি হচ্ছে ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকায়।
প্রশ্ন হলো, এই যে মাঝখানের বিশাল লভ্যাংশ, এটা কার পাওনা ছিল? যিনি নিজের চোখ নষ্ট করে, পিঠ বাঁকা করে দিন-রাত সুই-সুতো চালালেন, তার? নাকি যিনি শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে বসে সই করলেন, তার?
পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এই লভ্যাংশের সিংহভাগই কেড়ে নেয় মালিকের পকেটের জন্য। এই লুটের টাকায় মালিকেরা পতেঙ্গা নেভাল এভিনিউতে দামি গাড়ির হাওয়া খান, তাদের সন্তানেরা বিদেশে নামী ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। আর যে শ্রমিক এই সম্পদের প্রকৃত স্রষ্টা, তার কপালে জুটছে কী? সামান্য কিছু টাকা, যা দিয়ে চট্টগ্রামের রেয়াজুদ্দিন বাজারের ঊর্ধ্বমুখী তরকারির ব্যাগ ছোঁয়াও আজ বিলাসিতা। শ্রমিকের হাড় জল করা শ্রম দিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বৃত্ত মূল্যই মালিককে ‘পুঁজিপতি’ বানাচ্ছে, আর শ্রমিককে ঠেলে দিচ্ছে এক অন্তহীন, বংশানুক্রমিক দারিদ্র্যের দিকে।
চট্টগ্রামের চাকা ঘোরে যাদের রক্তে, তারা আজ অবহেলিত।
চট্টগ্রামকে বলা হয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড। আর এই হৃদপিণ্ডের প্রধান রক্তকণিকা হলো এর লাখ লাখ গার্মেন্টস কর্মী। কিন্তু এই শহরের আধুনিকায়নের প্রতিটি ধাপে শ্রমিকদের শুধু ব্যবহারই করা হয়েছে, মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
চকচকে কাঁচের ফ্যাক্টরি বিল্ডিংগুলোর ভেতরে ঢুকলে দেখা যাবে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ। অপর্যাপ্ত ফ্যান, তীব্র গরম, আর কেমিক্যালের ঝাঁঝালো গন্ধ। দুপুরের খাবারের জন্য যে সামান্য সময় দেওয়া হয়, সেখানেও যেন গবাদিপশুর মতো লাইন ধরে দাঁড়াতে হয়। মানুষের মৌলিক সম্মানটুকুও সেখানে উধাও।
চট্টগ্রামের শ্রমিক আন্দোলনের একটা গৌরবময় ইতিহাস ছিল। কিন্তু আজ রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের গোপন আঁতাত সেই আন্দোলনের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। কোনো শ্রমিক যদি নিজের ন্যায্য পাওনা, ওভারটাইমের বকেয়া টাকা বা মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য আওয়াজ তোলে, তবে পরদিনই তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় ছাঁটাইয়ের নোটিশ। শুধু তাই নয়, কালুরঘাট বা সাগরিকা অঞ্চলের ফ্যাক্টরিগুলোর গেটে তার নাম-ছবি পাঠিয়ে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করে দেওয়া হয়, যেন চট্টগ্রামের আর কোনো কারখানায় সে কাজ না পায়। এটা সরাসরি একটা মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া।
আইনের ঠুঁটো জগন্নাথ রূপ: রাষ্ট্র যেন আজ কেবল ধনীদের পাহারাদার। যখনই শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবি ওঠে, তখন মালিকেরা বৈশ্বিক মন্দা, ডলার সংকট আর ব্যবসার ক্ষতির দোহাই দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করেন। অথচ সেই একই মন্দার বাজারে মালিকদের জীবনযাত্রার মান বিন্দুমাত্র কমে না। শ্রমিকের থালায় ভাতের পরিমাণ কমে যায়, কিন্তু মালিকের ব্যাংকের ব্যালেন্স ঠিকই জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।
কর্পোরেট শোষণের আন্তর্জাতিক জাল: ব্র্যান্ড এবং দেশী বুর্জোয়াদের আঁতাত
পুঁজিবাদ আজ বৈশ্বিক। আমরা প্রায়ই মালিকদের মুখে শুনি, বিদেশী ক্রেতারা (Buyers) কাপড়ের দাম কম দেয়, তাই তারা শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে পারছেন না। এটি আসলে শোষণের দায় একে অপরের ওপর চাপানোর একটা নোংরা খেলা।
বিদেশী শোষক কর্পোরেট কোম্পানিগুলো আর আমাদের দেশের বুর্জোয়া মালিকশ্রেণী—উভয়ে মিলেই এই আধুনিক দাসত্বের জাল বুনেছে। তারা ভালো করেই জানে, বাংলাদেশের, বিশেষ করে চট্টগ্রামের এই প্রান্তিক মানুষদের সস্তা শ্রম হিসেবে ব্যবহার করতে না পারলে তাদের বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য টিকবে না।
চট্টগ্রাম পোর্টে প্রতিদিন যে হাজার হাজার কনটেইনার জাহাজে তোলা হচ্ছে, তার প্রতিটি সুতোয় লেগে আছে আছমাদের মতো হাজারো নারীর চোখের জল, না-খাওয়া দুপুরের ক্লান্তি আর ভাঙা স্বপ্নের গল্প। মালিকেরা বিদেশী ক্রেতাদের সাথে দর কষাকষি করে নিজেদের প্রফিট মার্জিন ঠিকই ধরে রাখছেন, কিন্তু যখনই শ্রমিকের জন্য একটা ফ্যান বাড়ানোর কথা আসে, তখনই তারা নিঃস্ব হয়ে যান। এই প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতার শেষ কোথায়?
মুক্তির গান: লাল পতাকার আলোয় নতুন ভোর
গার্মেন্টস মালিকদের এই নিয়মতান্ত্রিক, সুপরিকল্পিত শোষণ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে শ্রেণী চেতনা এবং শ্রমিক শ্রেণীর ইস্পাতকঠিন ঐক্য। চাটগাঁর মেহনতি মানুষকে আজ বুঝতে হবে, তাদের এই দুবেলা আধপেটা খেয়ে বেঁচে থাকাটা কোনো ভাগ্য বা নিয়তি নয়। এটা একটা পুঁজিপতি ও শোষক শ্রেণীর তৈরি করা কৃত্রিম দাসত্ব।
যতক্ষণ না পর্যন্ত উৎপাদনের উপায়গুলোর ওপর (যেমন ফ্যাক্টরি, মূলধন ও যন্ত্রপাতি) পুঁজিপতিদের একক স্বৈরতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে শ্রমিকের যৌথ অংশীদারিত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যাবে, ততক্ষণ শুধু প্রতি বছর কয়েকশ টাকা বেতন বাড়িয়ে এই দাসত্ব থেকে মুক্তি মিলবে না।
চট্টগ্রামের সিইপিজেড থেকে শুরু করে কালুরঘাট, নাসিরাবাদ থেকে সাগরিকা—প্রতিটি কারখানার চত্বরে আজ প্রয়োজন লাল পতাকার নিচে শোষিত মানুষের একতাবদ্ধ হওয়া। নিজেদের অধিকার দয়া বা ভিক্ষা হিসেবে নয়, বরং ছিনিয়ে নিতে হবে।
"যে হাত হাতুড়ি চালায়, যে হাত সেলাই করে কাপড়,
সেই হাতের শক্তিতেই গড়ে উঠুক নতুন এক শহর।"
শোষকের তৈরি করা এই কাঁচের প্রাসাদ যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন, মেহনতি মানুষের সম্মিলিত জাগরণের সামনে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। যেদিন আছমারা তাদের শ্রমের পুরো দাম নিজে বুঝে পাবে, সেদিনই এই চট্টগ্রামের আকাশ সত্যিকারের আলোয় উদ্ভাসিত হবে।
আসিফ তানভীর আরিয়ান
শিক্ষার্থী - লোকপ্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
About the Author
Asif Tanvir Arian
Music
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) । প্রগতিশীল চিন্তাধারা থেকে সমাজ ও রাজনীতির নানান অসঙ্গতি নিয়ে লিখি। আর জীবনের বাকিটা জুড়ে আছে মিউজিক—গিটার আর পিয়ানোই আমার অবসরের সঙ্গী।
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন