Searching…

১৭ বছর বনাম ১৭ মাসঃ একটি নির্মোহ ক্যালিডোস্কোপ

মাস কয়েক আগে বিদায় নিলো স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সম্ভব?...

Saker Hossain Efaz (সাকির হোসেন ইফাজ)
72 15 মিনিট লাগতে পারে পড়তে

মাস কয়েক আগে বিদায় নিলো স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সম্ভবত সর্বাপেক্ষা আলোচিত-সমালোচিত, সর্বাধিক জনসমর্থিত এবং একইসাথে সর্বাধিক বিতর্কিত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার। দীর্ঘ ১৭ বছরের আওয়ামী শাসনকাঠামো ভেঙে প্রচুর সংস্কার ও সুশাসনের পৌনঃপুনিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে গণমানুষের চাওয়া ছিল স্থিতিশীলতা, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ। কিন্তু রাষ্ট্রপরিচালনার ১৭ মাসে  জাতির প্রতিশ্রুতি পূরণে ঠিক কতটা সফল তিনি?

প্রথমে আসা যাক আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিয়ে। নিঃসন্দেহে ক্ষমতা গ্রহণের পর এ সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল অব্যহত গুম,খুন,বিচারবর্হিভুত হামলা, প্রতিপক্ষ ও বিরুদ্ধমতের ওপর নিপীড়নের মতো অমানবিক অবস্থা থেকে এ রাষ্ট্রকে একটি সুষ্ঠু, নিরাপদ এবং স্থিতিশীল পরিবেশে ফিরিয়ে আনা। ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, রাজনৈতিক সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত শত্রুতা ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এমনকি এসবের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও এর বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়তে হয়। এইচআরএসএস এর মতে ২০২৩ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ৩১টি ঘটনার শিকার হয়েছেন ৩৩ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সংখ্যাটি ৩২ আর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয়ার পর পরবর্তী প্রায় চার মাসে নিহত হয়েছেন ১২ জন৷ অর্থাৎ বিগত ১৭ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সব মিলিয়ে ৪৫ জন বিচারবহির্ভূত বা পুলিশি হেফাজতে হত্যার শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’–এর প্রতিবেদন থেকেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৪ মাসে ৪০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গুলিতে মারা গেছেন ১৯ জন, নির্যাতনে মারা গেছেন ১৪ জন আর পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ৭ জনকে। এসব ঘটনায় পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সেইসাথে বৃদ্ধি পেয়েছে কারা হেফাজতে মৃত্যু্র সংখ্যা। আসকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ এর নভেম্বর মাস পর্যন্ত ৯৫ জন কারা হেফাজতে মারা গেছেন। ২০২৪ সালে ছিল ৬৫ জন, ২০২৩ সালে ১০৬ জন এবং ২০২২ সালে ৬৫ জন। বেড়েছে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যা ও । মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশের অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধারের সংখ্যা ছিল ৩৫২। ২০২৪ সালে ছিল ৫০৪ জন। আর .২০২৫ এর নভেম্বর মাস পর্যন্ত সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ৫৮৬।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের সবথেকে সমালোচিত এবং ন্যক্করজনক ঘটনা নিঃসন্দেহে মব সহিংসতা।



অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের সবথেকে সমালোচিত এবং ন্যক্করজনক ঘটনা নিঃসন্দেহে মব সহিংসতা। যে-ই সহিংসতা প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য তো দূর, ন্যূনতম কোনো পদক্ষেপ ও নেয়া হয়নি। ১৭ মাসের অজস্র কলঙ্কজনক ঘটনার মধ্যে যেমন আছে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেয়া, তেমনি আছে গাছে ঝুলিয়ে পোড়ানো কিংবা মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া অব্দি আগুনে পোড়ানো। সেইসাথে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা যেন রীতিমতো ‘ডাল-ভাত’। প্রকাশ্য দিবালোকে পাথর মেরে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় ভাত খাওয়ানোর পর দফায় দফায় পিটিয়ে উপুর্যুপরি নির্যাতন চালিয়ে হত্যার মতো বর্বরতা সম্ভবত মধ্যযুগ কিংবা আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও হার মানায়। যা আমরা ১৭ মাসের ‘আইয়ামে নোবেলিয়া’তে ঘটতে দেখেছি। পরিসংখ্যান বলছে  ২০২৩ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিলেন ৫১ জন। আর মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১৪৬ জন। এর মধ্যে ৯৮ জন নিহত হয়েছেন আগাস্ট পরবর্তী পাঁচ মাসে।  আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে আরো বলা হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর—এই ১১ মাসে মব সহিংসতার শিকার হয়ে ১৮৪ জন নিহত হয়েছেন, যা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সব মিলিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে এ সরকারের আমলে এখন পর্যন্ত গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ২৯৩। আসকের হিসাবে ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৮, ২০২২ সালে ৩৬, ২০২৩ সালে ৫১ এবং ২০২৪ সালে ১২৮। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫—এই ১৩ মাসে ৪৬টি পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ৬৭ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রথম আলোর সংগৃহীত তথ্য থেকে দেখা যায়, মামলাগুলোতে আসামি গ্রেপ্তারের হার নগণ্য। অনেক ক্ষেত্রে মামলা পর্যন্ত হয়নি বা মামলা হলেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। ৪৬টির মধ্যে ৩৬টি ঘটনায় মামলা হয়েছে, ১০টি ঘটনায় কোনো মামলাই হয়নি।
ভাঙচুর, লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ এর তালিকা এতো দীর্ঘ যে সম্ভবত এর প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধান ঐতিহাসিকদের গবেষণার বিষয় হতে পারে। যে তালিকার সবথেকে দগদগে সংস্করণ ‘প্রথম আলো’, ‘দ্য ডেইলি স্টার’ কিংবা সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ এবং ‘উদীচি’তে হামলা।
আবার ২০২৫ সালের জানুয়ারী থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১১০ টি অপহরনের ঘটনায় মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। যা ২০২৪ সালের বছর জুড়ে ছিল ৬৪২ টি ঘটনা। এ ছাড়াও ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ৩৫০৯ টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে জানা যায়।  ২০২৫ সালে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের সংখ্যাও উর্ধ্বগামী — মোট মামলা বছরে প্রায় ১৬.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মারাত্মক অপরাধ (মারধর, ডাকাতি, অপহরণ) বেশি দেখা দিয়েছে। নাগরিকরা রাতে ও জনসম্মুখে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, অনেকেই রাস্তা পরিহার করেন। Freedom House-এর রিপোর্ট উল্লেখ করে যে “দীর্ঘ আধিপত্যের পর ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও স্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোতে জোরালো প্রশ্ন আছে”। 

প্রান্তিক, সংখ্যালঘু ও নারীদের ওপর হামলা-হয়রানি, মাজারে হামলা, বাউলদের ওপর হামলা; বিভিন্ন মেলা, ওরস, উৎসব বন্ধ, নাটক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে বাধা এসব অতীতে এত প্রগাঢ়ভাবে দেখা যায়নি। আবার এসব  থামাতে অন্তর্বর্তী সরকারকে কঠোর হতে তো দেখা যায়ইনি, বরং সরকারের দায়িত্বশীল কারও কারও বক্তব্য এসবের প্রতি সমর্থনসূচক বলে সমালোচিত হয়েছে।  ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে ২০২৫ এর ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৬৭৩টি সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৮২টি হত্যা, ৪৪টি ধর্ষণের ঘটনা।  সরকার দাবী করেছে ২০২৫-এ ৬৪৫টি ঘটনায় মাত্র ৭১টি সংখ্যালঘু সংঘর্ষ “অবধারিত” ছিল, বাকিগুলিকে ‘সাধারণ অপরাধ’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর থেকে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিগত দেড় বছরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যা আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশী।

কট্টর মতাদর্শী গোষ্ঠীর দ্বারা সাংস্কৃতিক ও সমাজচেতনার ওপর চাপ বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১১৩টি মাজার ও দরগাহ-কে লক্ষ্য করে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়, যেখানে প্রশাসনের কার্যকর প্রতিরোধ আকাঙ্ক্ষিত ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত গত ১৭ মাসের অন্যতম কালো অধ্যায়। দেশজুড়ে বিভিন্ন চত্বরে থাকা শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। লালনের আখড়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাউল মেলায় উগ্রবাদী গোষ্ঠী হামলা চালিয়েছে। পাইকারি হারে ভাঙা হয়েছে মাজার। ভবঘুরে কিংবা সাধু-সন্ন্যাসী ও বাউলদের জোরপূর্বক ধরে চুল কেটে দেয়া থেকে শুরু করে গ্রেফতার, নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন সম্প্রদায় বিশেষত হিন্দু ও আদিবাসীদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ। কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ভিন্ন জাতিসত্তার নারীদের ওপর ২৪টি নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২১টি ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে, তিনটি সমতলে। ছয়জন নারী ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দুজন নিহত হয়েছেন। পাহাড় ও সমতল মিলিয়ে গ্রেপ্তারের পর মৃত্যু, বিনা বিচারে আটক, মারধর, হেনস্তা এবং জোর করে ধর্মান্তর করার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে। এমনকি তাদের যৌক্তিক আন্দোলনে কট্টরপন্থীদের হামলায়ও সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো প্রতিরোধ তো দূর, উলটো তারাই হেনস্তার শিকার হয়েছে। বিগত আমলের মতোই অব্যাহত আছে  বমদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন।

নারীদের ফুটবল খেলতে অব্যাহত বাধা, প্রকাশ্যে নারীকে শারীরিকভাবে হেনস্তা; এমনকি গ্রেফতারের পর বীরদর্পে ছাড়িয়ে আনার ঘটনা যেন গা-সওয়া। ধর্ষণবিরোধী সমাবেশে পুলিশি হামলা এসবকছুকেই রাষ্ট্রীয় মোড়ক দেয়। সেইসাথে চরমপন্থীদের নিকট নতি স্বীকার করে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় গানের শিক্ষকের বদলে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ যেন স্পষ্ট করে সমাজ-সংস্কৃতির কোন ধাপে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এ ধরনের ঘটনায় সমাজের মুক্তমনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে রূপান্তর বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের বৃহত্তর উদ্বেগ।


গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্র উল্টো। বাতিল হয়নি বহুল বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন; উল্টো টকশোতে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে গ্রেফতার হয়ে মাসের পর মাস জেল খাটছেন সাংবাদিক। শতাধিক সিনিয়র সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা ও উস্কানির অভিযোগে মামলা হয়েছে। হেনস্তার শিকার হয়েছেন নূরুল কবীরের মতো প্রথিতযশা সাংবাদিক।

তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে কয়েক দফায় ১৬৭ জন সাংবাদিকের স্থায়ী ও অস্থায়ী প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরার নামান্তর। মানবাধিকার সংগঠন ARTICLE 19 অনুসারে ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে ২৩২টি বাক-স্বাধীনতা লঙ্ঘন ঘটেছে। সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিকদের ওপর ১৫১টি অতিরিক্ত ঘটনার রিপোর্ট আছে; এতে অন্তত ৫ সাংবাদিক নিহত ও ৭১টি শারীরিক হামলা অন্তর্ভুক্ত। dhakacourier -এর তথ্য অনুযায়ী আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত মোট ৪৯৬ জন সাংবাদিক দেশে বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়েছে, এতে গণমাধ্যমে চাপ ও হুমকিসহ শারীরিক হামলা রয়েছে। এই সংখ্যা একটি স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য কতটা উদ্বেগজনক তা বলে দিতে হয় ন। বাকস্বাধীনতার পরিবেশ হয়ে উঠেছে আরো আরো সংকীর্ণ। ফেসবুকে হাহা রিয়্যাক্ট কিংবা ভিন্নমত প্রকাশের জন্য ব্যাংক কিংবা হাসপাতাল, এমনকি সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি এবং পরবর্তীতে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। নবজাতকের জন্য দুধ কিনতে গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন কেউ, কেউ বা প্যারোল পাননি আত্মহত্যা করা স্ত্রী এবং নিহত নবজাতকের দাফনেও। উলটো জামিনের জন্য বিবাদীর পক্ষে লড়তে গিয়ে একযোগে আদালত চত্বর থেকে ইতিহাসের সর্বাধিক সংখ্যক আইনজীবীর আটকের ঘটনা ঘটেছে।

ASK রিপোর্টে আরো দেখা গেছে ২০২৫ সালে ৫,৬০৪ জন আহত, ৮৬ জন মারা যায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘর্ষে।

Human Rights Watch এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠন উল্লেখ করছে যে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ডে দমনমূলক নীতি এবং বিচারহীনতার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি “গভীর উদ্বেগের বিষয়।” “Operation Devil Hunt” নামে বিভিন্ন সময়ে ৪৮,০০০+ অভিযান চালানো হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রচুর নিরাপরাধ জনমানুষকে।
প্রশাসনে নজিরবিহীন ওএসডি (OSD) সংস্কৃতি এবং মেধাবী কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে কেবল ‘ট্যাগ’ লাগিয়ে পদোন্নতি দেওয়ার ফলে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। এই প্রথম লটারির মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি প্রশাসনে ‘খুললাম খুল্লা’ভাবে স্বজনপ্রীতির নিয়োগ এ সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পচন আর অবক্ষয়ের খুব সাধারণ নজির।

অন্যদিকে শুধুমাত্র দোসর ট্যাগ দিয়ে চাকরিচ্যুত এবং হেনস্তা করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল শিক্ষক এবং কর্মকর্তাদের। নারী শিক্ষার্থীকে নারী শিক্ষক ও হিজাব খুলতে বললে চাকরিচ্যুত হতে হয়। ধর্মীয় অবমাননা হয়, ইসলামফোব হয়। কিন্তু ‘বিঁড়িতে সুখটান দিয়ে একটি বিশেষ দলের পক্ষে প্রচার’ কিংবা ‘কবরে গিয়ে বিশেষ দলকে ভোট দেয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্ন জানতে চাওয়া হবে’ বললে কোনো অবমাননা হয় না।

এসবকিছু ছাপিয়ে অর্থনীতির দিকে দৃষ্টি দিলে আতঁকে উঠতে হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী,  কোভিডের সময় বাদ দিলে দেশে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমেছে গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে। বিনিয়োগও এখন এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। টানা তিন অর্থবছর ধরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের আশপাশে। ১৯৮৬ সালের পর দেশে কখনোই টানা তিন বছর মূল্যস্ফীতি এত বেশি ছিল না। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ক্রমাগত দাম ওঠা-নামা ও বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সংকটে ফেলেছে। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় টানা ৩৯ মাস ধরে কম, ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। বিনিয়োগ স্থবিরতায় কর্মসংস্থান কমে গেছে সব খাতে, সেই সাথে প্রচুর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক লাখ শ্রমিক সম্পূর্ণ বেকার। বেড়েছে দরিদ্র এবং অতিদরিদ্রের সংখ্যা। কৃষি উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি এখন গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এতে খাদ্যনিরাপত্তাও শঙ্কার মধ্যে। ব্যাংকের পরিস্থিতি নাজুক। বেড়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতে আস্থা হ্রাস পাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।  সামাজিক খাতে বিনিয়োগ কমেছে। রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ কমেছে। এনবিআর-এর ক্রমবর্ধমান তদন্ত ও করদাতাদের ওপর চাপ ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে এবং কর ব্যবস্থা ব্যবসা-বান্ধব হচ্ছে না, যা কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পুঁজিবাজারে অস্থিরতা ও আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। স্থিতিশীলতার অভাবে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার বাজার থেকে ঝরে পড়ছে, শেয়ার মূল্য ওঠা-নামা করছে, এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আরও সাবধান। ব্যাংকিং খাতে নিরাপত্তা উদ্বেগে নতুন ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও বাতিল হয়েছে, যা খাতে বৈচিত্র্য ও বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একপক্ষের পরিবর্তে অন্যপক্ষের দখলদারিত্ব, হাটবাজার ও বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি আগের মতোই বলবৎ রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে কার্যকর সেবা ও গুণগতমানের উন্নয়ন কিংবা স্থিতিশীলতা কোনোটিই নেই। চাপের মুখে অটোপাশ প্রদান, দীর্ঘসময় যাবত চাকরির নিয়োগ বন্ধ, নির্বিচারে চাকরিচ্যুতি, MPOভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হামলা এবং সবশেষে তাদের দাবি অসম্পূর্ণ ভাবে সমাধান সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
সেইসাথে পাঠ্যপুস্তকে ‘আদিবাসী’ শব্দ সরিয়ে ফেলা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় চরমপন্থী মতাদর্শের প্রভাব, শিক্ষার্থী চিন্তাশীল পরিবেশের সংকট এবং মানসম্মত শিক্ষা ও অনুশীলনের অভাবের মতো বিষয়েরও উদ্বেগ আছে। জাতীয় সংগীতের অবস্থান বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা থেকে সরে গিয়ে কোনো রকমে ঠাঁই পেয়েছে শেষ পৃষ্ঠায়। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় কিংবা ইতিহাস বইয়ের কোথাও ‘রাজাকার’ শব্দের উল্লেখ নেই। নেই ২৫ মার্চের নির্মমতা কিংবা ১৪ ডিসেম্বরের বর্বরতার ইতিহাস। ‘৭ মার্চ দিবসে’র সাথে সাথে ‘রিসেট বাটনে’ প্রেস করে বই থেকেও বাতিল হয়ে গেছে ঐতিহাসিক সে ভাষণ।  শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত ২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বাজেটের মাত্র ১.৭ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে। 

অন্যদিকে বিশ্ব ব্যাংক রিপোর্ট অনুযায়ী জলবায়ুর প্রভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং এটি অর্থনীতির ওপর বড় চাপ ফেলছে। বিশেষ করে কর্মদিবস হারানো ও উৎপাদনশীলতার ক্ষতি।

পররাষ্ট্রনীতিতে সফলতার দিশা পাওয়াটা অনেকটা ‘অমাবস্যার রাতে ঘোরতর অন্ধকার ঘরে কালো বেড়াল খোঁজার’ সাথে তুলনীয় হতে পারে। চরম ভারতবিদ্বেষী শাসনামলে ঘুরপথে আরো অধিক অর্থব্যয় করে সেই ভারত থেকেই পন্য কেনা, বিগত আমলের চেয়েও বেশি পরিমানে এবং দেশের মানুষের প্রয়োজন না মিটিয়েই কথিত উপহার প্রদান, সেইসাথে দুতাবাসে হামলা থেকে শুরু করে শেষমেষ ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে প্রথমবারের মতো ছিটকে পড়ে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হওয়া; কী হয়নি এ সময়ে! একইসাথে আমেরিকার ভিসা বন্ধ, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি কিংবা ভর্তি না করা থেকে শুরু করে রোম, জার্মানি এবং ব্রিটেনের মতো দেশে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টার লেজেগোবরে দশা হওয়া জাতীয় লজ্জার কফিনে সম্ভবত সবথেকে সুদৃঢ় পেরেক। অন্যদিকে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ‘ভাই’ কোটায় কেউ বা পেয়ে যায় দূতাবাসে চাকরি!  তবে সব ছাঁপিয়ে আমাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য সম্ভবত পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের রসায়নের চূড়ায় আরোহণ।  আর কিছু হোক বা না হোক, সমাজের সর্বস্তরে উর্দু শব্দের ব্যবহার বেড়েছে শতগুণ। সেইসাথে প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে পাকিস্তানি গায়কদের কনসার্টে অন্তত কোনো ধরনের বাধার খবর পাওয়া যায়নি। যদিও দেশীয় পুরুষ-নারী উভয় শিল্পী এবং তারকাদের কনসার্ট থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান উদবোধন ও বাধার মুখে পড়ে বাতিল হয়েছে অস্বাভাবিক হারে। চারুকলার জয়নুল উৎসব, পুরান ঢাকার ঘুড়ি উৎসব বাতিল, কিশোর/বালকের হাফপ্যান্ট পরা নিয়ে হেনস্তা, এমনকি শতবর্ষী বটগাছের ও রেহাই না পাওয়ার ঘটনা সম্ভবত ইতিহাসে স্থান পাবে।

সর্বোপরি, ১৭ বছরের দীর্ঘ শাসনামল বনাম ১৭ মাসের ‘ঐতিহাসিক’ (?!) শাসনের বহুমুখী ব্যবচ্ছেদ মহাকাল হয়তো তার আপন গতিতেই করবে। এই ব্যবচ্ছেদে কেউ লিখবে ড. ইউনুস মেটিকিউলাস ডিজাইন করেছিলেন বটে তবে তাঁর শাসনামল ছিল নিঃসন্দেহে এক ‘মেটিকিউলাস স্যাটায়ার’। আবার কেউ হয়তো বা আপনমনে একথাও বলতে পারে যে ড. ইউনুসের উচিত ছিল দালালদের কথা না-শুনে আরও পাঁচ বছর থেকে যাওয়া।

শেষ করতে চাই বহুল আলোচিত পরিচিত একটি লাইন দিয়ে; ‘এইখানে সমস্ত নালায়েক ক্ষমতারে ভাবিতেছে ঈশ্বর’।



Saker Hossain Efaz (সাকির হোসেন ইফাজ)

About the Author

Saker Hossain Efaz (সাকির হোসেন ইফাজ)

Research Assistance, Public Hosting, Public Speaking

সাকির ইফাজ; উপস্থাপক, বাংলাদেশ বেতার। শিক্ষার্থী ও গবেষক, ইতিহাস বিভাগ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। Intern, Applied Democracy Lab; Dhaka University

প্রোফাইল দেখুন

আলোচনায় অংশ নিন

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

সাইন ইন করুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast