আমাদের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা তিনি। অথচ বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা চায়ের আড্ডায় কান পাতলে খুব সহজেই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর তীব্র 'রবীন্দ্র-বিদ্বেষ' চোখে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে তাচ্ছিল্য করে 'রঠা' বলে ডাকা, তার সাহিত্যকে 'হিন্দুয়ানি' ট্যাগ দেওয়া বা তাকে ইসলাম-বিদ্বেষী হিসেবে চিত্রিত করার এই প্রবণতা দিন দিন মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত এই রবীন্দ্র-বিদ্বেষের শেকড় আসলে কোথায়? এটি কি নিতান্তই সাহিত্যিক সমালোচনা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক এজেন্ডা?
১. মেধা, নোবেল বিজয় এবং আমাদের ট্রোল কালচার
১৯১৩ সালে যখন এশিয়া বা উপনিবেশবাদের অধীনে থাকা কোনো দেশের সাহিত্যকে পশ্চিমা বিশ্ব পাত্তাই দিত না, তখন রবীন্দ্রনাথ তার অসামান্য মেধা দিয়ে নোবেল জয় করে বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন। তার লেখনীর গভীরতা ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন বা রোমাঁ রল্যাঁর মতো বিশ্ববরেণ্য দার্শনিকরা মুগ্ধ ছিলেন।
অথচ আমাদের সাইবার স্পেসে কিছু তরুণ অত্যন্ত সুকৌশলে তাকে সম্মানহানি করার জন্য 'রঠা' (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর বিকৃত রূপ) শব্দটি ব্যবহার করে। পুঁজিবাদী সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এই সস্তা মিম আর ট্রোলিংকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। বিশ্ববরেণ্য এই দার্শনিককে সস্তা হাসির পাত্রে পরিণত করার এই চেষ্টা কেবল রবীন্দ্রনাথের অপমান নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক মেধা-বিদ্বেষী মনস্তত্ত্ব এবং কাঠামোগত বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বেরই চরম প্রকাশ।
২. "রবীন্দ্রনাথ মুসলিমদের নিয়ে লেখেননি"- একটি ডাহা মিথ্যাচার
রবীন্দ্র-বিদ্বেষীদের অন্যতম বড় একটি প্রোপাগান্ডা হলো, তার সাহিত্যে নাকি মুসলমানদের কোনো উপস্থিতি নেই বা তিনি মুসলমানদের এড়িয়ে গেছেন। যারা এই দাবি করেন, তারা মূলত রবীন্দ্রনাথ পড়েনইনি, কেবল অন্ধ বিদ্বেষ গিলেছেন।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মানবিক ও বিশ্বজনীন চরিত্র 'কাবুলিওয়ালা'র রহমত কিন্তু একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। এক আফগান মুসলিমের সাথে বাঙালি হিন্দু শিশু মিনির যে আত্মার সম্পর্ক তিনি এঁকেছিলেন, তা অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য দলিল। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের জীবনের একেবারে শেষ লেখা গল্পটির নামই হলো 'মুসলমানীর গল্প', যেখানে তিনি হিন্দু সমাজের চরম রক্ষণশীলতা ও বর্ণবাদের কড়া সমালোচনা করে মুসলিম সমাজের মানবিক রূপটি তুলে ধরেছিলেন। 'ক্ষুধিত পাষাণ' গল্পের পটভূমি কিংবা সম্রাট শাহজাহানকে নিয়ে লেখা তার বিখ্যাত কবিতায় মুসলিম ঐতিহ্যের সশ্রদ্ধ উপস্থিতি রয়েছে। তিনি তৎকালীন সমাজবাস্তবতায় যা দেখেছেন, তা-ই লিখেছেন; জোর করে কাউকে বাদ দেওয়ার রাজনীতি তিনি করেননি।
৩. ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রোপাগান্ডা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইস্যু
ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো যুগ যুগ ধরে প্রচার করে আসছে যে, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘেঁটে এর সপক্ষে কোনো প্রমাণই পাওয়া যায়নি; বরং ১৯২৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে এসে কার্জন হলে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এই মিথ্যা বয়ানটি বারবার প্রচার করার মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হলো, বাঙালি মুসলমানের মননে এমন একটি ধারণা তৈরি করা যে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূলধারাটি আসলে 'ইসলামি মূল্যবোধের পরিপন্থি'।
৪. জমিদার বনাম প্রজা: শ্রেণিসংগ্রামের মোড়কে সাম্প্রদায়িকতা
বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিদ্বেষের আরেকটি বড় হাতিয়ার হলো তার 'জমিদার' পরিচয়। বামপন্থী দৃষ্টিকোণ থেকে জমিদারি প্রথার সমালোচনা করা শতভাগ যৌক্তিক। কিন্তু বর্তমানের রবীন্দ্র-বিদ্বেষীরা এই কাঠামোগত শ্রেণিসংঘাতকে সুকৌশলে 'সাম্প্রদায়িক' রূপ দেয়।
তারা আড়াল করে যায় যে, তৎকালীন অন্যান্য অত্যাচারী জমিদারদের মতো রবীন্দ্রনাথ কেবল খাজনা আদায়কারী ছিলেন না। পতিসর বা শিলাইদহে তিনি কৃষকদের জন্য সমবায় ব্যাংক, আধুনিক কৃষিব্যবস্থা এবং শিক্ষার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা তৎকালীন সমাজকাঠামোয় অভাবনীয় ছিল। জমিদারি প্রথার কাঠামোগত শোষণের দায় ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের ওপর চাপিয়ে তাকে 'মুসলিম বিদ্বেষী শোষক' প্রমাণ করার চেষ্টা মূলত একটি সস্তা রাজনৈতিক ফন্দি।
৫. রাষ্ট্রযন্ত্রের আগ্রাসন এবং 'পাকিস্তানি মনস্তত্ত্ব'
এই বিদ্বেষ হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি; এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের দীর্ঘদিনের প্রোপাগান্ডার ফসল। আইয়ুব খানের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের গান সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি মুসলমানদের নিজস্ব শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি কৃত্রিম 'ইসলামি-পাকিস্তানি' পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া। রাষ্ট্রযন্ত্রের সেই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বীজ সমাজের একটি বড় অংশের মনস্তত্ত্বে রয়ে গেছে, যা আজকের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রধান জ্বালানি।
৬. রবীন্দ্র-পূজারিদের 'এলিটিজম' বা সাংস্কৃতিক অহংকার
এই বিদ্বেষের জন্য আমাদের শহুরে মধ্যবিত্ত সুশীল সমাজও সমানভাবে দায়ী। তারা রবীন্দ্রসংগীত বা রবীন্দ্রচর্চাকে একটি অভিজাত (Elite) শ্রেণির ড্রয়িংরুমের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছেন। যখন কোনো সংস্কৃতিকে সাধারণ মেহনতি মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে কেবল 'ভদ্রলোক শ্রেণির' বুদ্ধিবৃত্তিক অহংকারের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন সাধারণ মানুষ অবচেতনভাবেই সেই সংস্কৃতির প্রতি একধরনের বিচ্ছিন্নতা বোধ করে, যা অনেক সময় রবীন্দ্র-বিদ্বেষে রূপ নেয়।
শেষ কথা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনো দেবতা নন; তার সাহিত্য বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু বর্তমানে 'রঠা' বলে ট্রোল করা বা মুসলিম-বিদ্বেষী ট্যাগ দিয়ে যে মিথ্যাচার আমরা দেখতে পাই, তা কোনো সুস্থ সমালোচনা নয়। এটি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, ঐতিহাসিক প্রোপাগান্ডা এবং ডিজিটাল যুগের সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের এক বিষাক্ত মিশ্রণ। এই বিদ্বেষের জাল ছিন্ন করতে হলে রবীন্দ্রনাথকে অন্ধভাবে পুজো করা যেমন বন্ধ করতে হবে, তেমনি তাকে নিয়ে ছড়ানো এই সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডাকেও শক্ত রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দিয়ে রুখে দিতে হবে।
About the Author
আতিকুর রহমান অন্তর
লেখক এবং ডিজিটাল মার্কেটিং প্রফেশনাল
আমি আতিকুর রহমান অন্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী। রাষ্ট্র, সমাজ, লোকসংস্কৃতি, ধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে মুক্তালাপ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করাই আমার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য।
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন (1)
সুন্দর লেখা!
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন