ভগৎ সিংয়ের নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে মাথায় হ্যাট পরা, হাতে পিস্তল নেওয়া এক ক্ষুব্ধ তরুণের ছবি। মূলধারার ইতিহাস এবং বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ন্যারেটিভ অত্যন্ত সুকৌশলে তাকে কেবল একজন 'রোমান্টিক সশস্ত্র বিপ্লবী' হিসেবেই ফ্রেমে বন্দি করে রেখেছে। তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তিনি কেবলই রক্তগরম করা এক আবেগী যুবক। কিন্তু রাজনৈতিক দর্শন ও ইতিহাসের বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আবিষ্কার করা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভগৎ সিংকে। যার কাছে বোমা বা পিস্তল নয়, বরং শাণিত চিন্তাই ছিল বিপ্লবের প্রধান হাতিয়ার।
অন্ধ আবেগের বদলে তাত্ত্বিক ভিত্তি
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাংলায় ও ভারতবর্ষে যেসব সশস্ত্র বিপ্লবী গোষ্ঠী ছিল, তাদের অনেকেরই প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তীব্র আবেগ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ। কিন্তু ভগৎ সিং খুব দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলেন, সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শন ও সমাজতান্ত্রিক কাঠামো ছাড়া কেবল আবেগ দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মতো বিশাল রাষ্ট্রযন্ত্রকে উৎখাত করা সম্ভব নয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় তরুণদের অন্ধ আবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ার বদলে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার কাছে বিপ্লব মানে কেবল ক্ষমতার হাতবদল ছিল না, বরং পুরো সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ছিল।
"বিপ্লবের তরবারি শাণিত হয় চিন্তার পাথরে"
আদালতে দাঁড়িয়ে ভগৎ সিং এক ঐতিহাসিক জবানবন্দিতে বলেছিলেন, "বিপ্লব মানেই রক্তপাত বা সশস্ত্র সংগ্রাম নয়। বিপ্লবের তরবারি শাণিত হয় চিন্তার পাথরে (The sword of revolution is sharpened on the whetstone of ideas)।"
তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে সমাজে চিন্তার বা মতাদর্শের বিপ্লব ঘটাতে হবে। জেলখানায় বসে দিনের পর দিন মার্ক্স, লেনিন, ট্রটস্কি বা বাকুনিন পড়ার যে তীব্র নেশা তার ছিল, তা প্রমাণ করে তিনি কতটা তত্ত্ব-সচেতন ছিলেন। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেও তিনি লেনিনের বই পড়ছিলেন, এটি কেবল কোনো মিথ নয়, বরং একজন আদর্শিক বিপ্লবীর চূড়ান্ত রাজনৈতিক স্থিরতার প্রমাণ।
সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা: হত্যার জন্য নয়, প্রচারের জন্য
১৯২৯ সালে সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত যে বোমা ছুঁড়েছিলেন, তার উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল গ্রেপ্তার বরণ করা এবং ব্রিটিশ আদালতকে নিজেদের সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রচারের একটি মঞ্চ (Platform) হিসেবে ব্যবহার করা। সেদিন ছড়ানো লিফলেটে তারা লিখেছিলেন ফরাসি নৈরাজ্যবাদী অগাস্ত ভ্যালিয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তি - "বধিরকে শোনাতে হলে জোরাল শব্দের প্রয়োজন হয়।"
এটি নিছক কোনো সন্ত্রাসী হামলা ছিল না, বরং ছিল একটি নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল। তারা জানতেন, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তারা যে বয়ান দেবেন, তা পত্রিকার মাধ্যমে পৌঁছে যাবে ভারতবর্ষের প্রতিটি শোষিত মানুষের কাছে।
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে যখন রাজনীতিতে আমরা তাত্ত্বিক দৈন্যদশা এবং কেবল পেশিশক্তির আস্ফালন দেখি, তখন ভগৎ সিংয়ের এই 'চিন্তার বিপ্লব'-এর ধারণাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। শাসকশ্রেণি সবসময় চায় শোষিত মানুষ যেন চিন্তাশূন্য থাকে, কারণ চিন্তাশীল মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ভগৎ সিং আমাদের শিখিয়ে গেছেন, বুর্জোয়া রাষ্ট্রকাঠামোকে কাঁপিয়ে দিতে পিস্তলের গুলির চেয়ে মেহনতি মানুষের শাণিত রাজনৈতিক চেতনাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
About the Author
আতিকুর রহমান অন্তর
লেখক এবং ডিজিটাল মার্কেটিং প্রফেশনাল
আমি আতিকুর রহমান অন্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী। রাষ্ট্র, সমাজ, লোকসংস্কৃতি, ধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে মুক্তালাপ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করাই আমার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য।
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন