পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক নির্বাচন ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলের প্রতি গভীর আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে তার প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর এই নির্বাচনের কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে অনেক নিবন্ধে নানা জল্পনা-কল্পনা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন বাংলাদেশে আগ্রহ তৈরি করেছে, কারণ ১৯৪৭ সালের দেশভাগের স্মৃতি এখনও এই রাজ্যের রাজনীতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। অন্যদিকে, তামিলনাড়ুতে Tamilaga Vettri Kazhagam (TVK) নামে একটি নতুন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নির্বাচিত হয়েছে এবং তাদের ইশতেহারে শ্রীলঙ্কার তামিলদের প্রতি দলের দৃষ্টিভঙ্গি রূপরেখা আকারে তুলে ধরা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে জয়ী বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অনুপ্রবেশের প্রতি 'শূন্য সহনশীলতা' (জিরো টলারেন্স) এবং যারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে তাদের 'শনাক্ত, বাতিল ও বহিষ্কার' (ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট) করার কথা ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসন আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমান্ত রাজ্যগুলোর রাজনীতিতে একটি স্থায়ী বিষয়। যদিও বিজেপি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় রাজ্যেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছে, তবুও মিডিয়া জুড়ে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় পক্ষেই বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাবের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসন নিয়ে যে আসাম সবসময়ই সোচ্চার ছিল, দুই বাংলার সম্পর্কের সমীকরণে মনে হচ্ছে সেটি যেন কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ
প্রশ্ন হলো, ভারতের রাজ্যগুলো বৈদেশিক নীতিতে ঠিক কতখানি প্রভাব বিস্তার করে। প্রকৃতপক্ষে বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন করে নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার। রাজ্যগুলোর মতামত প্রতিফলিত হয় সেখানকার আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে, যাদের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত সেই রাজ্যের জনগণেরই মতামতের বহিঃপ্রকাশ। দেশজুড়ে উপস্থিতি থাকা প্রধান জাতীয় দলগুলোও এই নির্বাচনী রাজনীতিকে প্রভাবিত করা রাজনৈতিক মনোভাবের বিষয়ে সতর্ক থাকে। ভারতে কেন্দ্রে কোয়ালিশন বা জোট সরকারের আমলগুলোতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো বৈদেশিক নীতির ওপর তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একমত না হওয়ায় তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি ভেস্তে গিয়েছিল। তা ছাড়া, বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে গঠিত ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) জোট সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। ২০২৪ সালেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তা ও গঙ্গা নদীর চুক্তির ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন।
তামিলনাড়ু ও শ্রীলঙ্কা
তামিলনাড়ুতে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে—উভয় দলই শ্রীলঙ্কার প্রতি ভারতের নীতিতে ব্যাপক প্রভাব খাটিয়েছে এবং কেন্দ্রে থাকা জোট সরকারগুলো থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের হুমকিও দিয়েছে। এই দুই দলই শ্রীলঙ্কার তামিলদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে সময়ে সময়ে শ্রীলঙ্কান তামিলদের সমস্যা, কাচ্চাথিভু দ্বীপ ফেরত আনা এবং ভারতীয় জেলেদের সমস্যার মতো বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। অতীতে, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী করুণানিধি রাজ্যে এলটিটিই (LTTE)-র কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা মানেননি। ২০১৪ সালে এমডিএমকে-র নেতা ভাইকো শ্রীলঙ্কায় তামিলদের স্বার্থ রক্ষা না করার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
জোট সরকারের বাধ্যবাধকতা
আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থনে পরিচালিত জোট সরকারের আমলে, কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের তামিল রাজনৈতিক দলগুলোর দাবিগুলো মাথায় রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিল। ইলম যুদ্ধের (Eelam War) শেষ পর্যায়ে শ্রীলঙ্কার প্রতি ভারতের নীতি মূলত তামিলনাড়ু দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধ জয়ের শেষ পর্বে গুরুত্বপূর্ণ ও নন-লেথাল সহায়তা প্রদান করলেও, ভারত শ্রীলঙ্কার সঙ্গে কোনো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে শ্রীলঙ্কাও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মহিন্দ রাজাপক্ষর তিন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে ভারতের পক্ষে থাকা তিন সদস্যের একটি দলের সাথে আলোচনার জন্য নিযুক্ত করেছিল, যা ‘ট্রোইকা’ (troika) নামে পরিচিত ছিল। রাজ্যের এমন চাপের মুখেই ২০০৯ সালে ভারতীয় সংসদের তামিল সদস্যদের একটি প্রতিনিধি দল যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য শ্রীলঙ্কায় অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের শিবিরগুলো পরিদর্শনে গিয়েছিল।
আগের সময়ের মতো যখন তামিলনাড়ু ইউএনএইচসিআর (UNHCR)-এ শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল, তখন ভারত পরবর্তী্তে ভোটদান থেকে বিরত থাকে। এসব ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষুব্ধ ছিল কারণ রাজাপক্ষ শ্রীলঙ্কার জাতিগত সমস্যার সমাধান খোঁজার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি এবং উত্তর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন আয়োজনে অনিচ্ছুক ছিলেন। তা সত্ত্বেও, শ্রীলঙ্কান তামিলরা রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য তামিলনাড়ুর দিকেই তাকিয়ে থেকেছে। উদাহরণস্বরূপ, তামিলনাড়ুর নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বিজয়কে যখন শ্রীলঙ্কার তামিল দলগুলো অভিনন্দন জানায়, তখন তিনি তাদের স্বার্থে কাজ করার আশাবাদও ব্যক্ত করেন।
কেন্দ্রেরই প্রাধান্য, তবে রাজ্যের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে নয়
বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এর অর্থ এই নয় যে রাজ্যগুলোর স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়। এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে বিভিন্ন ইস্যুতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে মতবিরোধ দেখা গেছে। যেমন—শ্রীলঙ্কায় বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুকে গণহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা এবং শ্রীলঙ্কার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য তামিলনাড়ুর দাবি কেন্দ্র মেনে নেয়নি। কাচ্চাথিভু ইস্যুতেও কেন্দ্র ভিন্ন মত পোষণ করে বলেছিল যে এই দ্বীপটি কখনোই ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ ছিল না। ধীরে ধীরে ভারত শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একটি উন্নয়ন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে, অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করে এবং তামিল সমস্যার ওপর একক মনোযোগ দেওয়ার নীতি থেকে তার বৈদেশিক নীতিকে সরিয়ে আনে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে এনডিএ সরকার এবং সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বৈদেশিক নীতিতে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
তামিলনাড়ুর মতো নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গসহ বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত থাকা অন্য তিনটি রাজ্যেই এখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি শাসিত। এই রাজ্যগুলোর পক্ষে কি কেন্দ্রের নেওয়া বৃহত্তর বৈদেশিক নীতি থেকে বিচ্যুত হওয়া সম্ভব? যদিও অবৈধ অভিবাসন এবং সীমান্ত লঙ্ঘনের মতো কিছু বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ই সোচ্চার এবং এ নিয়ে তাদের মধ্যে একটি ঐকমত্য রয়েছে। তবে পানি বণ্টনের ইস্যুতে ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, পশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাবেই। উত্তরবঙ্গ, যা তীব্র পানির সংকটের মুখোমুখি এবং তিস্তা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল, সেটিও বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি। জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানির প্রাপ্যতা বিবেচনায় গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন করাও সমভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে, যদিও বাংলাদেশ তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে গঙ্গার নতুন চুক্তির সাথে যুক্ত করেছে।
ভারতের প্রতিবেশী নীতিতে রাজ্যগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে বজায় থাকবে।নয়াদিল্লি (ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার) দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল রূপরেখা নির্ধারণ করে এবং এই সম্পর্কের মধ্যে কোনো রাজ্য—বিশেষ করে তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলো—যে আবেগঘন অস্থিরতা তৈরি করে, তাকে এড়িয়ে বা উপেক্ষা করেই চলে। তবে নয়াদিল্লি বা রাজ্যে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রাজ্যগুলোর স্বার্থ কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ক্ষুণ্ণ করা যাবে না।
মূল লেখক:
Smruti S Pattanaik
Pattanaik is a research fellow at the Manohar Parrikar Institute for Defense Studies and Analyses, New Delhi, India.
প্রবন্ধটি Kathmandu Post এ ২০ মে, ২০২৬ তারিখে প্রকাশ করা হয়।
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন