ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদ বন্ধ করতে এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি অবসান ঘটাতে আইন প্রণয়ন করা — অপরাধীদের ব্রাসেলসে আমন্ত্রণ জানানো নয়। আফগান নারী ও মেয়েদের জন্য এটি এখন বেঁচে থাকার লড়াই।
তালেবান সম্প্রতি আফগানিস্তানে আমার পরিবারের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে, তাদের বন্দি রেখেছে, একজনকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং আমার বাড়ি বাজেয়াপ্ত করেছে। এটি ছিল মূলত আমার মুখ বন্ধ করার চেষ্টা। আমি যখন আমার নিরপরাধ পরিবারের মুক্তির জন্য সমর্থন চেয়ে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের কাছে চিঠি লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছি, ঠিক তখনই এই স্তম্ভিত করার মতো খবরটি শুনলাম যে—ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) তালেবান কর্মকর্তাদের ব্রাসেলসে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
গত প্রায় পাঁচ বছরে আফগানিস্তানের নারী ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কী এমন পরিবর্তন এসেছে? পাঁচ বছর ধরে ষষ্ঠ শ্রেণীর পর নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয় নেই, অথচ আফগানিস্তানজুড়ে হাজার হাজার ধর্মীয় বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে মেয়েরা কোনো বাধা ছাড়াই যেতে পারছে। পাঁচ বছর ধরে নারীদের ডাক্তার হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে, যার ফলে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার আকাশচুম্বী হয়েছে। শ্রমবাজার থেকে নারীদের পাঁচ বছরের বর্জন তাদের আজ রাস্তায় ভিক্ষা করতে বাধ্য করছে।
এদিকে, তালেবান একের পর এক নিয়ম ও আইন জারি করে জীবনকে দিন দিন আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। তাদের সাম্প্রতিক দণ্ডবিধি সংক্রান্ত প্রবিধানে তারা দাসত্বকে বৈধতা দিয়েছে, যা পুরুষদের নারীদের দাস বানানোর ও শাস্তি দেওয়ার অনুমতি দেয়। "স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ" সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রবিধানে তারা বেশ কয়েকটি ধারায় বাল্যবিয়েকে বৈধতা দিয়েছে এবং কোনো রকম জবাবদিহিতা ছাড়াই এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

তালেবান ক্ষমতা দখলের আগে, আফগানিস্তানের সংসদের প্রথম নারী ডেপুটি স্পিকার হিসেবে আমি সারা দেশের নারীদের সমস্যাগুলো শোনার জন্য তাদের সাথে পরামর্শ সভা করতাম। সম্প্রতি, এক নারী উল্লেখ করেছিলেন:
আমরা দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং আমাদের জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি নিয়ন্ত্রণের জন্য তালেবানের ক্রমবর্ধমান চাপের কথা বলি। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদের মূল হোতাদের দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান না ঘটলে নারী ও মেয়েদের প্রতি এই নিপীড়নমূলক নীতিগুলোর কোনোটিই শেষ হবে না। তাহলে আমরা সবাই মিলে কেন এই বর্ণবাদের অবসান ঘটানোর বিষয়ে সম্মিলিতভাবে আলোচনা করছি না, যার মধ্যে আমরা সবাই বাস করছি?
আফগানিস্তান হলো লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ। এর সংজ্ঞা হলো: "একটি লিঙ্গ গোষ্ঠীর দ্বারা অন্য কোনো লিঙ্গ গোষ্ঠী বা গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিয়মতান্ত্রিক নিপীড়ন ও আধিপত্যের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অধীনে সংঘটিত অমানবিক কর্মকাণ্ড, যা মূলত সেই শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে করা হয়।" আন্তর্জাতিক আইনে লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে, তা কেবল আফগানিস্তানেই নয়, যেখানেই এটি ঘটুক না কেন—নারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলা নিয়মতান্ত্রিক দমন-পীড়ন মোকাবিলার জন্য একটি স্পষ্ট আইনি মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করবে। একে কোনো সাংস্কৃতিক ব্যতিক্রম হিসেবে না দেখে একটি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদ স্রেফ কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা কারণ নয়। আফগানিস্তানে আমাদের যে বোনেরা আছেন, তারা প্রতিদিন এই বর্ণবাদ টের পান। তারা এর মধ্যে বেঁচে আছেন এবং এর যন্ত্রণা বহন করছেন।
ডিফেন্স লইয়ার, নারী বিচারক, প্রসিকিউটর এবং নারীদের সুরক্ষাকারী আইনের অনুপস্থিতিতে, আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার কাছে আমাদের পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই। ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি তালেবান নেতার স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক ফৌজদারি আদালতের কার্যবিধি সংক্রান্ত প্রবিধানটি নারীদের স্বাধীনতার কফিনে আরেকটি শেষ পেরেক।
এই কার্যবিধিটি সমাজকে চার ভাগে বিভক্ত করেছে: ধর্মীয় পণ্ডিত ও প্রথম শ্রেণীর মানুষ, অভিজাত শ্রেণী (যেমন উপজাতীয় প্রবীণ ও ব্যবসায়ী), মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণী।
স্ববিবেচিত শাস্তি বা 'তাজির' এই শ্রেণীগুলো অনুযায়ী ভিন্ন হয়। ধারা ৪, অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী শাস্তিমূলক কর্তৃত্ব ব্যক্তিদের (যার মধ্যে স্বামী বা মালিক অন্তর্ভুক্ত) ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে, যা একজন মানুষের মর্যাদাকে পণ্যের স্তরে নামিয়ে আনে এবং এমন এক জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় যা দাসত্ব, নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধকারী আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
তালেবানের দণ্ডবিধি প্রবিধানের ৩২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে এমনভাবে মারধর করে যার ফলে হাড় ভেঙে যায়, ক্ষত সৃষ্টি হয় বা কালশিটে পড়ে এবং স্ত্রী যদি বিচারকের সামনে তার দাবি প্রমাণ করতে পারেন, তবে স্বামীর ১৫ দিনের কারাদণ্ড হবে।
অথচ, এই প্রবিধানেরই ৭০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোনো পাখি বা প্রাণীর ক্ষতি করবে তার পাঁচ মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
এই আইনি বৈষম্য নারীদের প্রতি তালেবানের আসল উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে তোলে: একটি নারী অপেক্ষা একটি পাখিও সেখানে বেশি সুরক্ষিত।
আফগানিস্তানের পরিস্থিতি আইনের একটি বড় ঘাটতিকে উন্মোচন করে। এই ধরনের সামগ্রিক নির্যাতনকে বিচারের আওতায় আনার জন্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো নেই; যদি তা থাকত, তবে অন্য কোথাও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের অনুরূপ ধরণগুলোকেও সমশক্তির সাথে মোকাবিলা করা যেত।
বৈষম্য ও বর্ণবাদ দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে আপাতত শিক্ষা "সম্ভব নয়" এবং স্কুল নিয়ে প্রশ্ন করাও নিষিদ্ধ।
এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হ্রাস পাচ্ছে, আমি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাই: লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করুন, দায়মুক্তির অবসান ঘটান এবং আফগান নারী ও মেয়েদের পাশে দাঁড়ান। একটি জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে, দেশগুলোর উচিত সার্বজনীন এখতিয়ারের (universal jurisdiction) ওপর ভিত্তি করে আইন তৈরি করা এবং আফগানিস্তানের লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদ মোকাবিলায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এই আইনি শূন্যতা পূরণ করা হলে তা বিশ্বব্যাপী অনুরূপ নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করবে। ইউরোপীয় সংসদের মানবাধিকার উপ-কমিটি এবং আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্ক বিষয়ক প্রতিনিধি দলের সামনে সাবেক এমপি ও সমাজকর্মীদের সাথে বক্তব্য রাখার পর, আমি কিছুটা আশা নিয়ে ফিরেছিলাম। আমি আশা করেছিলাম যে নীতি-নির্ধারকরা আফগানিস্তানের মানবাধিকার বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এবং তালেবানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জরুরি প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছেন।
আফগানিস্তানের নারী ও মেয়েদের জন্য জবাবদিহিতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ স্রেফ বেঁচে থাকার লড়াই। প্রতিদিন তাদের জনজীবন থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে, নীরব করে দেওয়া হচ্ছে, তাদের নিজেদের দেশের ভেতরেই বন্দি করা হচ্ছে এবং তাদের সবচেয়ে মৌলিক মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
ঠিক এই কারণেই, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পৃষ্ঠপোষকতায় আফগানিস্তানের জন্য স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা (Independent Investigative Mechanism) গ্রহণের মাত্র এক বছর পর, ইউরোপের মাটিতে তালেবানদের স্বাগত জানানো একটি বিধ্বংসী বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে হয়। এটি প্রতিটি আফগান নারী ও মেয়ের মুখে একটি চপেটাঘাত, যারা তালেবান নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, কষ্ট পেয়েছে এবং প্রতিরোধ করেছে।
জবাবদিহিতা ছাড়া এই ধরনের সম্পৃক্ততা নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এটি একটি বিপজ্জনক বার্তা পাঠায়: রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আফগান নারীদের দেওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতিগুলো সহজেই ত্যাগ করা হতে পারে।
আমাদের কোনো প্রতীকী সংহতি বা ফাঁকা বিবৃতির প্রয়োজন নেই। যারা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর দাবি করেন, তাদের কাছ থেকে আমাদের সাহস ও প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।
আফগানিস্তানের এই মানবাধিকার বিপর্যয় আজ হোক বা কাল, এই অঞ্চলের এবং এর বাইরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবেই—এটি কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
নারীদের অধিকার লঙ্ঘনকারীদের দায়মুক্তির অবসান ঘটানো কোনো রাজনৈতিক কাজ নয়; এটি একটি মানবিক আবশ্যকতা।
মূল লেখাটি লিখেছেন আফগানিস্তানের পার্লামেন্টের প্রথম নারী ডেপুটি স্পিকার ফাওজিয়া কুফি, যিনি 'উইমেন ফর আফগানিস্তান'-এর পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি। লেখাটি theguardian.com এ ৩ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে।
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন