Searching…

সুস্বাদু অতীত ও বিস্বাদ ইউটোপিয়া!

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্ক শুনলে কখনো কখনো মনে হয় আমরা যেন ভ...

Talha Mohammad Chowdhury
165 6 মিনিট লাগতে পারে পড়তে
সুস্বাদু অতীত ও বিস্বাদ ইউটোপিয়া!

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্ক শুনলে কখনো কখনো মনে হয় আমরা যেন ভবিষ্যৎহীন এক দেশে বাস করছি।

এখানে সবাই অতীত নিয়ে কথা বলে। কেউ ফিরে যায় ১৯৪৭ সালে, কেউ ১৯৭১-এ, কেউ কোনো হারানো স্বর্ণযুগের গল্প বলে, কেউ বা কোনো অসমাপ্ত বিপ্লবের স্মৃতি খোঁজে। আমাদের টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক বক্তৃতা, সবখানেই ইতিহাসের উপস্থিতি প্রবল। কিন্তু খুব কম মানুষকে প্রশ্ন করতে দেখা যায়, "২০৫০ সালের বাংলাদেশ কেমন হবে?"

আমরা একটি জাতি, যারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু পেছনটাই দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি! হয়তো এ কারণেই আমাদের কাছে অতীত এত সুস্বাদু, আর ইউটোপিয়া এত বিস্বাদ। কারণ অতীতের কোনো দায়িত্ব নেই, অতীতকে শুধু স্মরণ করতে হয়। কিন্তু ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করতে হয়।

সাহিত্য ও দর্শনের ভাষায়, ইউটোপিয়া বলতে এমন একটি কল্পিত সমাজকে বোঝায়, যেখানে মানুষ বর্তমানের তুলনায় আরও ন্যায়সঙ্গত, আরও মুক্ত এবং আরও মানবিকভাবে বাঁচতে পারে। এখানে নিখুঁত কোনো স্বর্গরাজ্যের নকশা করা হয়না, বরং পৃথিবীকে আরও ভালো করার কল্পনা করা হয়।

ইউটোপিয়ার বিপরীতে আছে ডিস্টোপিয়া। ডিস্টোপিয়া হলো এমন এক ভবিষ্যতের ছবি, যেখানে বৈষম্য, যুদ্ধ, নজরদারি, নিপীড়ন বা পরিবেশ বিপর্যয় মানুষের জীবনকে সংকুচিত করে ফেলে।

সহজভাবে বললে, ইউটোপিয়া জিজ্ঞেস করে, “পৃথিবী আরও ভালো হতে পারে কি?” আর ডিস্টোপিয়া জিজ্ঞেস করে, “যদি সবকিছু আরও খারাপ হয়ে যায়?”

মজার ব্যাপার হলো, আমরা ডিস্টোপিয়াকে বাস্তববাদ বলে গ্রহণ করি, কিন্তু ইউটোপিয়াকে কল্পনাবিলাস বলে উড়িয়ে দিই।

যদি কেউ বলে যুদ্ধ চলতেই থাকবে, বৈষম্য থাকবেই, দুর্নীতি কখনো যাবে না। আমরা বলি, “বাস্তব কথা বলছে।” কিন্তু কেউ যদি বলে পৃথিবী আরও ন্যায়সঙ্গত হতে পারে, শ্রমিকের জীবন আরও মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে, মানুষ আরও সমানভাবে বাঁচতে পারে, তখন আমরা বলি, “এগুলো অবাস্তব।”

যেন খারাপ ভবিষ্যৎ বিশ্বাস করা পরিণত বুদ্ধির লক্ষণ, আর ভালো ভবিষ্যৎ বিশ্বাস করা শিশুসুলভ সরলতা।

আজকের পৃথিবীতে ডিস্টোপিয়ার অভাব নেই। চলচ্চিত্র, উপন্যাস, সংবাদমাধ্যম, এমনকি আমাদের প্রতিদিনের আলাপেও ভবিষ্যৎকে প্রায়শই এক অন্ধকার জায়গা হিসেবে কল্পনা করা হয়। জলবায়ু বিপর্যয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ যেন আশার চেয়ে আতঙ্কের আরেক নাম।

বাংলাদেশও এই প্রবণতার বাইরে নয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গভীর। আমরা শুধু ভবিষ্যৎকে ভয় পাই না; আমরা ভবিষ্যৎকে কল্পনাই করি না।

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ভবিষ্যতের চেয়ে অতীত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি কোন নেতা ইতিহাসের নায়ক ছিলেন, কিন্তু জানি না ত্রিশ বছর পর বাংলাদেশের শ্রমিক কী ধরনের কর্মপরিবেশে কাজ করবে। আমরা জানি স্বাধীনতার গল্প, কিন্তু জানি না জলবায়ু সংকটে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের রূপ কেমন হবে। আমরা জানি কে একসময় ক্ষমতায় ছিল, কিন্তু খুব কমই আলোচনা করি ভবিষ্যতের সমাজে ক্ষমতা কীভাবে বণ্টিত হওয়া উচিত।

এ যেন এমন এক রাজনীতি, যার স্মৃতি আছে, কিন্তু কল্পনা নেই।

এই কল্পনাহীনতার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। প্রথমত, দৈনন্দিন সংগ্রাম মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যখন মানুষ বাসাভাড়া, খাদ্যদ্রব্যের দাম বা চাকরির অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে, তখন পঞ্চাশ বছর পরের পৃথিবী নিয়ে ভাবা অনেক সময় বিলাসিতা মনে হয়।

দ্বিতীয়ত, আমাদের কল্পনাশক্তির একটি বড় অংশ ক্রমশ বাজারের হাতে চলে গেছে। একসময় মানুষ সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখত। এখন তাকে শেখানো হয় নতুন একটি ফোন, একটি গাড়ি বা একটি অ্যাপের কথা। সমষ্টিগত ভবিষ্যতের জায়গা দখল করে নিয়েছে ব্যক্তিগত ভোগের আকাঙ্ক্ষা।

আমরা আর প্রশ্ন করি না সমাজ কেমন হবে?

আমরা শুধু প্রশ্ন করি আমি কী পাবো?

রাজনীতি আমাদের অতীত বিক্রি করে। জাতীয়তাবাদ অতীত বিক্রি করে। ধর্মীয় আন্দোলন অতীত বিক্রি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অতীত বিক্রি করে। সবাই কোনো না কোনো হারানো স্বর্ণযুগের গল্প শোনায়।

কিন্তু খুব কম মানুষ ভবিষ্যতের গল্প বলে। খুব কম মানুষ জিজ্ঞেস করে যে পৃথিবী এখনও আসেনি, সেটি কেমন হতে পারে?

সাহিত্যেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। একসময় ভবিষ্যৎ ছিল সাহসী কল্পনার ক্ষেত্র। কবি, ঔপন্যাসিক ও চিন্তকেরা নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী ভবিষ্যতের কথা লিখেছেন। সুকান্ত ভট্টাচার্য এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে ক্ষুধা ও বঞ্চনার অবসান ঘটবে। সাহিত্য শুধু বর্তমানকে বর্ণনা করত না; ভবিষ্যতের দরজাও খুলে দিত।

আজ আমরা প্রায়শই তার উল্টো দৃশ্য দেখি। পৃথিবী ধ্বংস হচ্ছে, সভ্যতা ভেঙে পড়ছে, মানুষ নজরদারির যন্ত্রে বন্দি হয়ে যাচ্ছে, এই ধরনের কাহিনি অনেক বেশি জনপ্রিয়। যেন আমরা পৃথিবীর শেষ কল্পনা করতে পারি, কিন্তু পৃথিবীকে বদলে ফেলার কল্পনা করতে পারি না।

অথচ ইতিহাস অন্য কথা বলে।

আট ঘণ্টার কর্মদিবস একসময় অসম্ভব কল্পনা ছিল। নারীর ভোটাধিকার একসময় অবাস্তব স্বপ্ন বলে মনে করা হতো। উপনিবেশমুক্ত পৃথিবীও একসময় অনেকের কাছে ইউটোপিয়া ছিল।

মানুষ প্রথমে অসম্ভবকে কল্পনা করেছে, তারপর তার জন্য সংগ্রাম করেছে, এবং শেষ পর্যন্ত তাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

এই কারণেই ইউটোপিয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ইউটোপিয়া কোনো প্রস্তুত নকশা নয়। এটি এমন একটি প্রশ্ন, যা বর্তমানকে অস্বস্তিতে ফেলে। এটি আমাদের জিজ্ঞেস করে, বর্তমান ব্যবস্থাকে কি অনিবার্য ধরে নিতে হবে? সমাজ কি অন্যভাবে সংগঠিত হতে পারে না? মানুষ কি আরও ন্যায়সঙ্গতভাবে বাঁচতে পারে না?

বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু নতুন নীতি বা নতুন সরকার নয়; প্রয়োজন নতুন কল্পনাও! কারণ যে সমাজ ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে না, সে ভবিষ্যৎ নির্মাণও করতে পারে না।

হয়তো আমাদের সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক কাজগুলোর একটি হলো আবার সেই পুরোনো প্রশ্নটি করা,

আমরা আসলে কেমন বাংলাদেশ চাই?

কারণ প্রতিটি ভবিষ্যৎ প্রথমে জন্ম নেয় কল্পনায়, তারপর সংগ্রামে, তারপর ইতিহাসে।

আর হয়তো কোনো জাতির পতন তখনই শুরু হয়, যখন সে ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন হারিয়ে ফেলে এবং অতীতের স্মৃতিকেই তার শেষ আশ্রয় বানিয়ে নেয়।

Talha Mohammad Chowdhury

About the Author

Talha Mohammad Chowdhury

Reader, writer, and observer. Interested in politics, history, economics, satire, and the contradictions of modern society. Here to learn, question, and contribute to meaningful discussions.

প্রোফাইল দেখুন

আলোচনায় অংশ নিন

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

সাইন ইন করুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast