মানুষ জন্মগতভাবে কোনো ধর্ম নিয়ে জন্মায় না,সে জন্মায় মানুষ হিসেবে। পরে পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সে একটি ধর্মীয় পরিচয় লাভ করে। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে মৌলিক পরিচয় কি তার ধর্ম, নাকি তার মনুষ্যত্ব? এই প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষত এমন সময়ে যখন ধর্মীয় পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে মানবিক সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে।
ধর্ম মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মই সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার এবং পরোপকারের শিক্ষা দেয়। কিন্তু ইতিহাস আমাদের দেখায়, যখন ধর্মকে মানবতার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়, তখন বিভাজন, বিদ্বেষ এবং সংঘাতের জন্ম হয়। অন্যদিকে, মনুষ্যত্ব এমন একটি মূল্যবোধ যা কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাস, জাতি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা ও সম্মানের ভিত্তি।
একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার সময় তার ধর্ম জিজ্ঞাসা করা হয় না। দুর্ঘটনায় আহত কাউকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে তার বিশ্বাসের পরিচয় জানা জরুরি নয়। দুর্যোগের সময় মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায় মূলত মানবিক বোধ থেকেই। এই সহজ সত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মনুষ্যত্বই সামাজিক সহাবস্থানের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মবিরোধী নয়; বরং এটি বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্র, সমাজ ও জনজীবনে সকল মানুষের সমান মর্যাদা নিশ্চিত হওয়া উচিত, তাদের ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক না কেন। একজন ব্যক্তি ধর্ম পালন করতে পারেন, আবার নাও করতে পারেন; কিন্তু তার নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা সমান থাকবে। এই ধারণাই বহুত্ববাদী ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের অন্যতম শর্ত।
আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি ও যোগাযোগের বিস্তারের ফলে মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত। অথচ একই সঙ্গে ধর্মীয়, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিভাজনও স্পষ্ট। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন এমন এক সামাজিক চেতনা, যেখানে মানুষের মূল্যায়ন হবে তার চরিত্র, কর্ম ও মানবিকতার ভিত্তিতে; তার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
মনুষ্যত্ব ও ধর্মের মধ্যে বিরোধ থাকা বাধ্যতামূলক নয়। বরং ধর্ম যদি মানুষকে আরও মানবিক করে তোলে, তবে তা মনুষ্যত্বেরই সহায়ক শক্তি। কিন্তু যখন ধর্ম মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তখন মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়াই সভ্যতার দাবি।
সবশেষে বলা যায়, ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়, কিন্তু মনুষ্যত্ব আমাদের সবার অভিন্ন পরিচয়। যে সমাজে মানুষ আগে মানুষ হিসেবে সম্মান পায়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও মানবিক সমাজ। তাই ধর্ম যার যার, কিন্তু মনুষ্যত্ব সবার।
About the Author
shimur Rahman sheum
লেখক, সাংবাদিক,ইন্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট (ইইই),হাবিপ্রবি, দিনাজপুর।
সুশৃঙ্খল চেতনার প্রকাশ হতে চাই।
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন (1)
প্রিয় লেখক আপনি কি বলতে চান যে ধর্ম মানুষকে মনূষত্ববোধ শেখায় না। আপনার কথা আকাশ কুশুম এর মতো।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন