সাংস্কৃতিক আধিপত্য (Cultural Hegemony) বলতে বোঝায় আদর্শগত বা সাংস্কৃতিক উপায়ে বজায় রাখা আধিপত্য বা শাসন। সাধারণত এটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অর্জিত হয়, যা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীকে সমাজের বাকি অংশের মূল্যবোধ, নিয়ম, ধারণা, প্রত্যাশা, বিশ্বদৃষ্টি এবং আচরণের উপর শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ দেয়।
সাংস্কৃতিক আধিপত্য এমনভাবে কাজ করে যে শাসক শ্রেণির বিশ্বদৃষ্টি এবং তা প্রতিফলিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে ন্যায়সঙ্গত, বৈধ এবং সবার মঙ্গলার্থে তৈরি বলে উপস্থাপন করা হয়; যদিও বাস্তবে এই কাঠামোগুলি মূলত শাসক শ্রেণিরই উপকারে আসে। এই ধরণের ক্ষমতা সামরিক একনায়কত্বের মতো বলপ্রয়োগের শাসন থেকে আলাদা, কারণ এটি আদর্শ ও সংস্কৃতির “শান্তিপূর্ণ” উপায়ে শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
অ্যান্টোনিও গ্রামসির মতে সাংস্কৃতিক আধিপত্য
ইতালীয় দার্শনিক অ্যান্টোনিও গ্রামসি কার্ল মার্কসের তত্ত্বের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণা বিকাশ করেন। মার্কস বলেছিলেন যে সমাজের প্রভাবশালী আদর্শ সর্বদা শাসক শ্রেণির বিশ্বাস ও স্বার্থকে প্রতিফলিত করে।
গ্রামসি যুক্তি দেন যে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর শাসনের প্রতি জনগণের সম্মতি আদর্শের; অর্থাৎ বিশ্বাস, অনুমান, ও মূল্যবোধের প্রসারের মাধ্যমে অর্জিত হয়, যা সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আদালত, ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব প্রতিষ্ঠান মানুষকে শাসক শ্রেণির নির্ধারিত মূল্যবোধ, বিশ্বাস, ও আচরণে অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে যে গোষ্ঠী এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, সে-ই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে।
সাংস্কৃতিক আধিপত্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় যখন শাসিত জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা “প্রাকৃতিক” ও “অনিবার্য”; মানুষের তৈরি নয়, বরং প্রকৃতির নিয়মের মতো স্থির।
গ্রামসি এই ধারণাটি বিকাশ করেন ব্যাখ্যা করতে যে কেন মার্কসের পূর্বাভাস অনুযায়ী শ্রমিক-নেতৃত্বাধীন বিপ্লব ঘটেনি। মার্কসের মতে, পুঁজিবাদ ব্যবস্থার মধ্যে এমন এক আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা ছিল, যা শেষ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণির শোষণের কারণে ব্যবস্থাটির পতন ডেকে আনবে। কিন্তু প্রত্যাশিত সেই বৃহৎ পরিসরের বিপ্লব ঘটেনি।
আদর্শের সাংস্কৃতিক শক্তি
গ্রামসি উপলব্ধি করেন যে পুঁজিবাদের আধিপত্য শুধু শ্রেণি কাঠামো ও শ্রমিক শোষণের ওপর নির্ভর করে না, এতে আদর্শের (ideology) শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মার্কস যদিও এই বিষয়টি আংশিকভাবে স্বীকার করেছিলেন, গ্রামসি মনে করেন তিনি আদর্শের শক্তিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি।
তার “The Intellectuals” (১৯২৯–১৯৩৫) প্রবন্ধে গ্রামসি ব্যাখ্যা করেন যে, ধর্ম ও শিক্ষা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কীভাবে আদর্শ সমাজ কাঠামো পুনরুৎপাদন করে। তিনি বলেন, সমাজের বুদ্ধিজীবীরা, যাদের প্রায়ই নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক মনে করা হয়, আসলে বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির অংশ এবং সম্মান ও প্রভাব ভোগ করেন। ফলে তারা শাসক শ্রেণির প্রতিনিধি বা “উপ-শাসক” হিসেবে কাজ করেন, যারা সমাজে সেই শ্রেণির নির্ধারিত নিয়ম ও মূল্যবোধ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন।
তার আরেক প্রবন্ধ “On Education”-এ গ্রামসি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন যে শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে মানুষের সম্মতির মাধ্যমে শাসন বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাধারণ জ্ঞানের রাজনৈতিক ক্ষমতা
গ্রামসির “The Study of Philosophy” প্রবন্ধে “সাধারণ জ্ঞান (common sense)” অর্থাৎ সমাজ ও তাতে আমাদের অবস্থান সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণার ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, ‘নিজের বুটের ফিতে ধরে নিজেকে টেনে তোলা’ (pulling oneself up by the bootstraps) এই ধারণা, যে কেউ কঠোর পরিশ্রম করলেই অর্থনৈতিকভাবে সফল হতে পারে; পুঁজিবাদী সমাজে প্রচলিত এক ‘সাধারণ জ্ঞান’। এই ধারণাটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ন্যায্য বলে প্রমাণ করতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ, যদি কেউ বিশ্বাস করে যে সফলতা কেবল ব্যক্তিগত পরিশ্রমের ফল, তাহলে সে স্বভাবতই ধরে নেবে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও তার সামাজিক কাঠামো ন্যায্য ও বৈধ। একইভাবে, যারা ধনী, তারা ন্যায়সঙ্গতভাবে ধনী হয়েছে, আর যারা দরিদ্র, তারা তাদের অবস্থার জন্য নিজেরাই দায়ী। এই ‘সাধারণ জ্ঞান’ ব্যক্তিগত দায়িত্বের ধারণাকে অতিমাত্রায় জোর দেয় এবং এর ফলে পুঁজিবাদে নিহিত বাস্তব শ্রেণি, বর্ণ, ও লিঙ্গ বৈষম্য আড়াল হয়ে যায়।
সংক্ষেপে বলা যায়, সাংস্কৃতিক আধিপত্য অথবা বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি আমাদের যে নীরব সম্মতি, তা মূলত সামাজিকীকরণ, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আমাদের অভিজ্ঞতা এবং সাংস্কৃতিক আখ্যান ও রূপকের সংস্পর্শে আসারই একটি ফলাফল; আর এই বিষয়গুলোর প্রতিটিই শাসক শ্রেণীর বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে।
সূত্র:
Cole, Nicki Lisa, Ph.D. “What Is Cultural Hegemony?” ThoughtCo, May 18, 2025.
https://thoughtco.com/cultural-hegemony-3026121
লেখক পরিচিতি:
নিকি লিসা কোল, পিএইচ.ডি. একজন মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক, যিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (সান্তা বারবারা) থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি পোমোনা কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও শিক্ষাদানে যুক্ত আছেন। তার গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে জাতি ও বর্ণবৈষম্য, লিঙ্গ ও যৌনতা, অর্থনীতি ও শ্রম, ভোক্তা সংস্কৃতি এবং পরিবেশবিজ্ঞান। কোল ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও পোমোনা কলেজে সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন কোর্স পড়িয়েছেন।
তিনি ThoughtCo-র নিয়মিত লেখক ছিলেন, যেখানে জাতি, শ্রেণি, লিঙ্গ ও ভোক্তা আচরণ নিয়ে প্রায় ১৭০টিরও বেশি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি ইংল্যান্ডের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজনীতি ও সমাজকর্ম বিভাগে যোগ দেন এবং এর আগে অস্ট্রিয়ার গ্রাজ শহরে Institute for Advanced Studies on Science, Technology and Society-তে গবেষণা ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন।
তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে Race, Gender & Class, Contexts, এবং সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ—Consumer Culture, Modernity and Identity ও Media Education for a Digital Generation-এ। এছাড়া তার প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে Sociological Images, The Sociological Cinema, Work in Progress, Social Science Space, Pacific Standard, Truthout, ও CounterPunch-এ।
About the Author
Md. Belal Hosain Bidda
Lawyer
“জীবন যেখানে দ্রোহের প্রতিশব্দ, মৃত্যুই সেখানে শেষ কথা নয়।”
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন